kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

শতভাগ দেশে বিপণনকারী হয়ে গেল রপ্তানিকারক!

জিয়াদুল ইসলাম   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:১৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শতভাগ দেশে বিপণনকারী হয়ে গেল রপ্তানিকারক!

নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে এক পণ্যের। ট্রেড লাইসেন্সও ওই পণ্যের জন্যই নেওয়া। উৎপাদিত পণ্যের শতভাগ দেশেই বাজারজাত করার কথা। কিন্তু ডেইরি, প্লাস্টিক, কৃষি ও পাটপণ্য খাতের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ওই নির্ধারিত পণ্যের বাইরে অন্য পণ্য উৎপাদন এবং তা রপ্তানি করে সরকারের নগদ সহায়তার প্রায় ৩৮২ কোটি টাকা ঘরে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালাও মানা হয়নি।

kalerkanthoনগদ সহায়তার ওপর সিভিল অডিট অধিদপ্তরের ২০২১ সালের অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত হ্যামকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান হ্যামকো ইন্ডাস্ট্রিজ, সনিক প্রাইম গ্রুপের প্রাইম পুষ্টি, হাসান গ্রুপের হাসান জুটমিলস, রানু অ্যাগ্রোা ইন্ডাস্ট্রিজ ও ডেইরি খাতের একটি প্রতিষ্ঠান মিলে এই অনিয়ম করেছে। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ অর্থ আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, এক পণ্যের নিবন্ধন নিয়ে আরেক পণ্য উৎপাদন এবং তা রপ্তানি ব্যবসার নীতি-নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। আবার নিবন্ধনপত্র সংশোধন ছাড়াই শতভাগ স্থানীয় বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান কিভাবে পণ্য রপ্তানি করতে পারে, তা-ও বোধগম্য নয়। আইন ও বিধি-বিধানের ফাঁকফোকরে প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুযোগ নিয়ে থাকতে পারে। 

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৬-এর ধারা ১৫(১) এবং ১৫(১৮) অনুযায়ী, দেশের সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন ও বিপণনের জন্য বিডার নিবন্ধন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলকভাবে বিডার পূর্বানুমোদন নিতে হবে। কিন্তু এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন পরিবর্তন হলেও বিডার নিবন্ধন সংশোধন বা বিডার পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়নি। যোগাযোগ করা হলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শতভাগ স্থানীয় বিপণনকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে পণ্য রপ্তানি করতে হলে বিডা থেকে পূর্বানুমোদন বা নিবন্ধনপত্র সংশোধন করে নিতে হবে। এটা কেউ না করলেও আমাদের করার কিছু থাকে না। কারণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তেমন কিছুই বলা নেই।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিডা থেকে ২০০৮ সালের ১০ মার্চ হ্যামকো ইন্ডাস্ট্রিজ প্লাস্টিক পণ্য, বিশেষ করে ব্যাটারি কনটেইনার উৎপাদনের অনুমোদন নেয়। নিবন্ধনপত্রে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের শতভাগ দেশে বিক্রয়ের অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু বিডার নিবন্ধন ভেঙে প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদনহীন প্লাস্টিক গৃহস্থালি পণ্য যেমন—বালতি, মগ, চেয়ার ও টেবিল প্রভৃতি পণ্য উৎপাদন এবং সেগুলো বিদেশে রপ্তানি করেছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিলের সার্কুলার অনুযায়ী, নগদ সহায়তার আবেদনপত্রের সঙ্গে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিসিএমএ) সনদপত্র দাখিল করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তার পণ্য রপ্তানিকাল তথা ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যই ছিল না। বিপিসিএমএতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হ্যামকো ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের সদস্য পদ লাভ করে ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর। এভাবে বিডার নিবন্ধন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ভেঙে অনুমোদনহীন পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিসংশ্লিষ্ট্র অ্যাসোসিয়েশনের সনদ ছাড়াই হ্যামকো প্রায় চার লাখ টাকার নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছে।

এ বিষয়ে হ্যামকো ইন্ডাস্ট্রিজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব ধরনের নিয়ম মেনে পণ্য রপ্তানি করেছি। বিডার নিবন্ধনও সংশোধন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিপিসিএমএর সদস্য পদ নেওয়া হয়েছে।’

শতভাগ স্থানীয় বাজারে বিপণনের শর্তে বিডা থেকে ২০১২ সালে নিবন্ধন নেয় সনিক প্রাইম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রাইম পুষ্টি। নিবন্ধনপত্রে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের ধরন হিসেবে উল্লেখ আছে বেকারি পণ্য তথা চানাচুর, ডাল ভাজা, ক্যান্ডি, মিনি বিস্কুট, এনার্জি ড্রিংক, টেস্টি স্যালাইন ইত্যাদি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনপত্র সংশোধন না করেই ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি ও তার বিপরীতে নগদ সহায়তা নিয়েছে। অন্যদিকে প্রাইম পুষ্টি বাপার সদস্য পদ নিয়েছে উৎপাদনকারী রপ্তানিকারক হিসেবে। সেখানে পণ্যের ধরন হিসেবে উল্লেখ করেছে—ঝালমুড়ি, চানাচুর, ড্রিংকস ও বিস্কুট। 

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, বিডার নিবন্ধনপত্র ও বাপার সদস্য পদে উল্লেখিত পণ্যের বাইরে অন্য পণ্য রপ্তানি করেও নগদ সহায়তা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি যেসব পণ্য নিজে উৎপাদন করে না, সেই পণ্যের জন্যও নগদ সহায়তা নিয়েছে। সনিক প্রাইম গ্রুপের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম, ওমান, দুবাই ও কাতারে পণ্য রপ্তানি করে। 

যোগাযোগ করা হলে সনিক প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রাইম পুষ্টির এমডি মো. আক্কাস আলী সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব পণ্যে সরকারের বিধি-নিষেধ থাকে, ওই পণ্য ছাড়া রপ্তানিযোগ্য অন্য সব পণ্য রপ্তানি করতে অনুমতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার পরও বিডা থেকে আমাদের অনুমোদন নেওয়া আছে। ‘কিন্তু প্রাইম পুষ্টি বিডা থেকে রপ্তানির অনুমোদন নিয়েছে ২০১৯ সালের পরে’—এমন প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অডিট আপত্তির পরই আমরা বিডা থেকে নিবন্ধন সংশোধন করেছি। তাতে তো সমস্যা নেই। এর জন্য তো আমাদের জরিমানা গুনতে হবে না।’ তিনি দাবি করেন, ‘কারো যদি বিডা থেকে এই অনুমোদন নেওয়া নাও থাকে, সেও কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রপ্তানি করতে পারে। কারণ সরকারও চায় রপ্তানি বাড়ুক। কারণ দেশে রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি। ফলে আমরা বাণিজ্য ঘাটতিতে আছি।’

বিডার নিবন্ধনের শর্ত ভেঙে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় কোটি টাকার নগদ সহায়তা তুলেছে হাসান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান হাসান জুটমিলস। অনুসন্ধানে জানা যায়, শতভাগ স্থানীয় বাজারে বিপণনের শর্তে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে হাসান জুটমিলস নিবন্ধন নেয় ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর। কিন্তু বিডার নিবন্ধন সংশোধন না করেই পণ্য রপ্তানি করে আসছিল তারা। রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি), রপ্তানি লাইসেন্স, পাট অধিদপ্তরের লাইসেন্স ও ভ্যাটের নিবন্ধন এগুলো দিয়েই রপ্তানি করে নগদ সহায়তা নিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।

হাসান জুটমিলসের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছানাউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে সময়টাতে আমাদের রপ্তানি হয়েছিল, সে সময়ে রপ্তানি করার জন্য যেসব দলিলের দরকার ছিল, সেগুলো সম্পন্ন করেই রপ্তানি করেছিলাম। এরপর অডিটের কারণে আমরা যখন জানতে পারলাম ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করতে হলে বিডা থেকে পূর্বানুমোদন বা নিবন্ধন সংশোধন করতে হবে, তখনই নিবন্ধন সংশোধন করেছি। আমরা আশা করছি এই অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।’

পাট খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজও পাটজাত পণ্য উৎপাদন এবং তার শতভাগ স্থানীয় বাজারের বিপণনের শর্তে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে নিবন্ধন নেয় ২০১১ সালে। এ প্রতিষ্ঠানও নিরীক্ষার সময়ে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে নিবন্ধনপত্র সংশোধন না করেই পণ্য রপ্তানি করে নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছে। যোগাযোগ করা হলে রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকাশ চন্দ্র দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উৎপাদন করার জন্য বিডার নিবন্ধনের দরকার হলেও রপ্তানি করার জন্য বিডার কোনো অনুমতির প্রয়োজন নাই—এটা বিডাই আমাদের জানিয়েছে। বিডার সেই লিখিত কপি আমাদের অফিসেও আছে। আপনি চাইলে দেখতে পারেন।’ এরপর ওই কপি চাইলে তিনি বলেন, ‘ওটা আমাদের ব্যাংকের কাছে আছে, অনুলিপি আমাদের দেয়নি। ওখানে যোগাযোগ করে সংগ্রহ করতে পারেন।’ এ ছাড়া অডিট আপত্তি এরই মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। প্রকাশ চন্দ্র আরো বলেন, ‘যখন এক্সপোর্ট করেছি, তখন বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এরপর যখন বিডার আইন আসছে, তখনই আমরা নিবন্ধন সংশোধন করে নিয়েছি।’

এ ছাড়া বিডার নিবন্ধন, সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ভেঙে অনুমোদনহীন পণ্য উৎপাদন ও তা রপ্তানি করে ডেইরি খাতের একটি প্রতিষ্ঠান ৩৫৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, প্রাইম পুষ্টি, রানু অ্যাগ্রো, হাসান জুটমিলসসহ চারটি প্রতিষ্ঠানের নগদ সহায়তার ওপর উত্থাপিত অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি নিয়ে চলতি বছরের ৭ মার্চ অনলাইন জুম প্ল্যাটফর্মে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিডার নির্বাহী সদস্য মোহসিনা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিভিল অডিট অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রয়ক দপ্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিষ্পত্তির জন্য সিভিল অধিদপ্তরকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। সিভিল অডিট অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম গুরুতর হওয়ায় সিভিল অধিদপ্তর থেকে এ অনুরোধ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। তার পরও আপত্তি নিষ্পত্তির তদবির এখনো চলমান রয়েছে।

ওই সভায় এ সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়, কোনো প্রতিষ্ঠান কোন কোন পণ্য রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা পাবে, প্রয়োজন হলে তা বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরো স্পষ্ট করা যেতে পারে। আর পণ্য উৎপাদন না করে রপ্তানির বিপরীতে কোনো প্রতিষ্ঠান নগদ প্রণোদনা গ্রহণ করে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।



সাতদিনের সেরা