kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

আফগানিস্তানে সম্প্রদায়গত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই

গাজীউল হাসান খান   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:০৮ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আফগানিস্তানে সম্প্রদায়গত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই

চরম চড়াই-উতরাইয়ে ভরা লড়াকু আফগানিস্তানের দীর্ঘ ইতিহাস। মূলত এ দেশের পশতুভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই পশতুন বা আফগান নামে পরিচিত। প্রায় আড়াই শ থেকে পৌনে তিন শ বছর আগে এ অঞ্চলের পাঠান বা পশতুন শাসক আহমদ শাহ আবদালি বা দুররানি আফগানিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। দুররানি শাসকদের শেষ বংশধর আবদুর রহমান খানের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্বের দরবারে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে আফগান জনগণ রুশ ও ব্রিটিশ আগ্রাসন থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করে গেছে। কিন্তু তারা কখনোই পরাভব মানেনি। ক্রমাগতভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে গেছে যুগের পর যুগ ধরে। পশতুন বা পাঠান ছাড়াও আফগানিস্তানে রয়েছে তাজিক, হাজারা, উজবেক, তুর্কমেন, আইম্যাক, বেলুচ, নুরিস্তান ও কিজিলবাস সম্প্রদায়। পশতুনরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য অন্য সম্প্রদায়গুলোও বিভিন্ন সময় লড়াই চালিয়ে গেছে। এর একটি অন্যতম নজির হচ্ছে পানশির উপত্যকা। পানশির আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। কিন্তু এখানকার মানুষ অত্যন্ত আপসহীন। তারা একটি ক্ষুদ্র বিষয় নিয়েও একটি বৃহৎ সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। পানশিরের অনেক বাসিন্দা অতীতে (১৯৯৬-২০০১) তালেবান শাসন মেনে নেয়নি। তালেবানের রাজনৈতিক সংগঠনে পশতুন ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অসংখ্য সদস্য রয়েছে। কিন্তু পানশিরের বর্তমান সম্প্রদায়ের প্রধান আহমদ মাসুদ বর্তমান তালেবান প্রশাসনের প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আশরাফ গনির সাবেক আফগান জাতীয় সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ। আহমদ মাসুদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টের (এনআরএফ) যোদ্ধারা তালেবানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েক দিন যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। পানশির দখল ও তার প্রতিরক্ষা নিয়ে দুই বিবদমান অংশের মধ্যে চলছিল বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবি। এ অবস্থায় গত শুক্রবার কাবুলে তালেবানের নতুন সরকার ঘোষণার কর্মসূচি আরো এক সপ্তাহ পিছিয়ে যায়।

পানশিরের সংগ্রামী জনগণের বর্তমান নেতা হচ্ছেন আহমদ মাসুদ। তিনি পানশিরের পরলোকগত লড়াকু নেতা আহমদ শাহ মাসুদের ছেলে। পানশিরের বর্তমান নেতা আহমদ মাসুদ ব্রিটেনের একটি সামরিক কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পানশিরবাসী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রদেশের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছে। কিন্তু আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি পার্বত্য প্রদেশকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল না অতীতের কোনো সরকার। কিন্তু আসল কথা হলো, পশতুনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আফগানিস্তানে রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায় বা উপজাতি। পানশিরের স্বায়ত্তশাসন দিলে তাজিক, হাজারা, উজবেক, বেলুচ ও অন্যান্য উপজাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষও বিভিন্ন প্রদেশে স্বায়ত্তশাসন দাবি করে বসবে। সে অবস্থায় বর্তমান অনগ্রসর আফগানিস্তান আরো পিছিয়ে পড়বে বলে ওয়াকিফহাল মহলের ধারণা। ইসলামী শাসনতন্ত্র (বিধান) কিংবা শরিয়াহ আইন জারি করতে গেলে একটি প্রদেশে কোনো বিরোধ কিংবা বৈষম্যের অবকাশ থাকার কথা নয়। সেদিক থেকে বিবেচনা করেই বর্তমান তালেবান নেতারা একটি শক্তিশালী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তালেবান নেতারা আফগানিস্তানের সব সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় রাজি হয়েছেন। তাঁরা শরিয়ত মতে নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য রক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত অধিকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া ২০ বছর পর ক্ষমতা পাওয়া তালেবান রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামরিক-অসামরিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ব্যবস্থা নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় পানশিরের মতো একটি দুর্গম প্রদেশে যেকোনো প্রতিরোধ আন্দোলন তালেবানের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সূচনায়ই বাধাগ্রস্ত করছে বলে তাদের ধারণা। তালেবান পানশিরের বর্তমান সংগ্রামী নেতা আহমদ মাসুদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানা গেছে।

পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রায় চার লাখ আফগান শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। এ অবস্থা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। আগের তালেবান সরকার (১৯৯৬-২০০১) ক্ষমতাসীন হওয়ার অনেক আগে দিনে দিনে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর পরও নতুনভাবে আবার খাইবার গিরিপথ দিয়ে আফগান শরণার্থীরা পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া শুরু করেছে। আফগানিস্তানে গত দুই সপ্তাহে অর্থাৎ ১৫ আগস্টে তালেবানের কাবুল দখলের পর থেকে দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকট অত্যন্ত ত্বরিতগতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রদেশে খাদ্যাভাব অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠছে। কাতার কিংবা আমিরাত থেকে আফগানিস্তানে কিছু সাহায্য আসা শুরু হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। কাবুল বিমানবন্দর থেকে বিমান চলাচল শুরু হলেও তা অত্যন্ত অগোছালো। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো জোরদার করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংক কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে অর্থছাড় কিংবা জরুরিভাবে কোনো ঋণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আফগানিস্তানে এ পর্যন্ত কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করতে না পারা। কারণ সারা বিশ্ব এখন তাকিয়ে রয়েছে আফগনিস্তানের নতুন সরকার গঠনের দিকে। এ ক্ষেত্রে শুধু একটি সরকার গঠন করলেই চলবে না, সে সরকারটি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এতে ঘটতে হবে সব সম্প্রদায়, বিশেষ করে নারী ও বিভিন্ন পেশাজীবীর স্বার্থের প্রতিফলন। নতুবা নতুন সরকারের প্রতি দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে কোনো আস্থার সৃষ্টি হবে না। চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক আফগানিস্তানে নতুন সরকারকে সমর্থন দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে বলে ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় পানশিরের সশস্ত্র প্রতিরোধ কিংবা অন্য কোনো ছোটখাটো কারণ তালেবান নেতাদের সিদ্ধান্তকে বারবার স্থগিত করে দিতে পারে না। সেগুলো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

হাসপাতাল, বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও নারীদের অন্যান্য বা আগের পেশায় যোগ দিতে কোথায় বাধা রয়েছে, তা নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার করতে হবে। ইসলামী বিধি-বিধান ও শরিয়াহ আইন অনুযায়ী নারীদের কাজ করার ক্ষেত্রগুলো নিশ্চিত করতে বাধা কোথায়? তালেবানের ঘোষিত সাধারণ ক্ষমা এরই মধ্যে দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এর পরও তালেবান মুজাহিদদের কিছু ব্যবহার বা আচরণ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা আবশ্যক। ব্যাংক কিংবা বিভিন্ন ক্যাশ মেশিন থেকে অর্থ উত্তোলন করতে নাগরিকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যাশ মেশিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থও থাকে না। এগুলোর ব্যাপারে সময়োচিত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ এবং সেগুলোর উপযুক্ত মূল্যের দিকে লক্ষ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। নতুবা সব ক্ষেত্রে সৃষ্ট অসন্তোষের কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, যা এ পর্যায়ে কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এর বাইরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে এবং অবকাঠামোগত বিনির্মাণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিতভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে পারাই হবে একটি সরকারের সময়োচিত কিংবা যুগোপযোগী কাজ। দৈনন্দিন বিরোধ জারি রাখতে গেলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রদায়গত কিংবা জাতিগত বিরোধ এবং আধিপত্য বজায় রাখার অপচেষ্টায় লিপ্ত হলে আফগানিস্তানের নাজুক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রচুর বিতর্ক, সংঘর্ষ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত সৃষ্টি হবে। এতে বহির্বিশ্বের বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা ত্বরান্বিত হবে না। নিরাপত্তা সংকট ও আইন-শৃঙ্খলাগত অরাজকতায় ভেঙে পড়বে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। এতে তালেবান শাসনের ব্যর্থতাকে নয়, ইসলামিক বিধি-বিধান ও শরিয়াহ আইনকে দায়ী করবে বিরোধী শিবির। সারা বিশ্ব এখন তাকিয়ে রয়েছে আফগানিস্তানের দিকে। ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ইরান, পাকিস্তান ও আরববিশ্বের কিছু দেশের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে আফগানিস্তানের সামনে। সেগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেই তাকে নিজ দেশে শরিয়াহ আইন প্রয়োগ করতে হবে। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সে দৃষ্টান্তই স্থাপন করে গেছেন। মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো ভুলে গিয়ে বাহ্যিক বিষয়াদি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ধর্মের মূল লক্ষ্য নয়। সে জন্যই কোরআনে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ঘোষণা করে সরকারের যাবতীয় নীতিমালা প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে বহু গুজব ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে। গঠনশীল সব কাজের ক্ষেত্রে সরকার ও জনগণ একটা গতি খুঁজে পাবে। তালেবানের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্ষীয়ান নেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার একটু কৌশলী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি। এ পর্যন্ত তালেবানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন বারাদার। তিনি তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্ব দিয়ে আফগানিস্তানের সব পর্যায়ের মানুষের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন বলে সবার বিশ্বাস জন্মেছে।

বিগত দুই সপ্তাহে তালেবান নেতৃত্ব চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং বিশেষ করে কাতারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে যথাশীঘ্র একটি সরকার ঘোষণার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম গতি লাভ করুক—সেটিই এখন সবার কাম্য। দেশের সব মানুষ আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকায় চলে যেতে পারবে না। আফগানিস্তানের পুনর্গঠন কিংবা উন্নয়নের জন্য দেশের শিক্ষিত ও মেধাসম্পন্ন মানুষগুলো অত্যন্ত দরকার। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে আফগানিস্তান একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশে রয়েছে তামা, রুপা, লিথিয়াম, ল্যানথানাইডসহ প্রচুর খনিজ সম্পদ। এ ছাড়া তেল ও গ্যাসের অফুরন্ত ভাণ্ডার থাকতে পারে আফগানিস্তানে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আফগানিস্তানের এখন প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এখন সাধারণ মানুষের মনে একটি বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে যে তালেবান নেতৃত্বাধীন ভবিষ্যৎ আফগানিস্তান সরকার দেশ গঠনে হবে অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সক্ষম।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
[email protected]



সাতদিনের সেরা