kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

সুযোগ থাকার পরও দেশে করোনা টিকা উৎপাদনে গড়িমসি!

তৌফিক মারুফ   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৭:৩৬ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সুযোগ থাকার পরও দেশে করোনা টিকা উৎপাদনে গড়িমসি!

প্রতীকী ছবি।

আগের তুলনায় করোনার টিকার জোগান অনেকটাই শক্তিশালী করেছে সরকার; অন্ততপক্ষে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে কোথাও ক্রয়চুক্তি, আবার কোথাও বিনা মূল্যে টিকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি আদায়ে সক্ষম হয়েছে। যদিও এর মধ্যে কোনো কোনো দেশ বা সংস্থার সময়মতো প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি না রাখার নজিরও তৈরি হয়েছে। ফলে সরকার টিকার গতি বাড়িয়েও তা ধরে রাখতে পারছে না; গতি একটু বাড়ালেই হোঁচট খেতে হচ্ছে বারবার।

শুরুর দিকে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল টিকা আমদানি ও সরকারকে সরবরাহের জন্য। কিন্তু kalerkanthoবাস্তবে এখন পর্যন্ত বেক্সিমকো আর ইনসেপ্টা ছাড়া দেশের কোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট খাতের সূত্রগুলো জানায়, প্রকাশ্যে না থাকলেও অনেকেই সরাসরি বিদেশের নির্দিষ্ট কম্পানির কাছ থেকে টিকা এনে সরকারকে সরবরাহের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা নানাভাবে ধরনা দিলেও সরকারের সায় মিলছে না।

শুধু আমদানিই নয়, যথেষ্ট সুযোগ থাকার পরও টিকা উৎপাদনে গতি আসছে না বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় মাত্রায় সুযোগ না দেওয়ার কারণে। বরং সরকার একাই এখন টিকা আনছে আবার উৎপাদনেও কাজ করছে। ফলে উদ্যোগ নিয়েও কমপক্ষে পাঁচটি টিকা দেশে উৎপাদনের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার স্পুিনক লাইট, চীনের সিনোভ্যাক ও আইএমবিক্যাম, ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্সিন ও নোভাভ্যাক্স। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত মাত্র একটি চীনা কম্পানিকে দেশীয় বেসরকারি কম্পানি ইনসেপ্টার সঙ্গে উৎপাদনে যুক্ত করতে পেরেছে। এ ছাড়া সরকারি একমাত্র ওষুধ কম্পানি এসেনশিয়াল ড্রাগ লিমিটেডকে (ইডিসিএল) প্রস্তুত করা হচ্ছে টিকা উৎপাদনের জন্য। তবে কোন টিকা উৎপাদন করবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাশিয়ার একটি টিকা উৎপাদনের জন্য চুক্তিপ্রক্রিয়ায় এগিয়ে গিয়েও আবার ঝুলে পড়েছে। সব মিলিয়ে টিকার ইস্যুতে দেশের বেসরকারি ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট মাত্রায় সরকার কাজে লাগাতে পারছে না বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে দেশে এ পর্যন্ত এসেছে তিন কোটি ৮৭ লাখ ডোজ টিকা। এর মধ্যে কোভ্যাক্স থেকে পাওয়া গেছে এক কোটির কিছু বেশি; যার সবটাই বিনা মূল্যে পাওয়া। কোভ্যাক্স থেকে বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা তিন কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ, অর্থাৎ দেশের চাহিদার ২০ শতাংশ। এর মধ্যেই সরকার কোভ্যাক্স থেকে সাড়ে ১০ কোটি ডোজ টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। আর চীনের সিনোফার্ম থেকে উপহারের টিকার পাশাপাশি ছয় কোটি ডোজ টিকা কেনা হয়েছিল প্রথম দফায়। এর মধ্যে প্রতি মাসে দেড় কোটি ডোজ করে টিকা আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ওই কম্পানি থেকে দেড় কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে সরকার নতুন করে সিনোফার্ম থেকে আরো ছয় কোটি ডোজ টিকা কেনার কথা জানিয়েছে।

এ ছাড়া ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকার মধ্যে এখনো দুই কোটি ৩০ লাখ ডোজ বকেয়া পড়ে আছে। রাশিয়া থেকে আসার কথা এক কোটি ডোজ। এর বাইরে চীন ও ভারত সরকার থেকে কয়েক লাখ ডোজ টিকা এসেছে উপহার হিসেবে। এ ছাড়া সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় জনসন অ্যান্ড জনসন থেকে পাওয়ার কথা প্রায় সাত কোটি ডোজ টিকা। এ পর্যন্ত শুধু সেরাম থেকেই টিকা আনা হয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকোর মাধ্যমে। বাকি সব টিকাই আমদানি করছে সরাসরি সরকার। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৪১ কোটি ডোজ টিকা আনার পথ তৈরি করেছে সরকার, যার মধ্যে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

যদিও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক কয়েক দিন ধরে বলে আসছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই আরো ১৬ কোটি ডোজ টিকা দেশে এসে যাবে। মন্ত্রীর কথার বাস্তবায়ন ঘটলে এ পর্যন্ত হাতে পাওয়া প্রায় চার কোটি ডোজ এবং ডিসেম্বরের মধ্যে কোভ্যাক্স ও চীন থেকে ১৬ কোটি ডোজ মিলে প্রাপ্তি ২০ কোটি ডোজ ছাড়িয়ে যাবে। এর সঙ্গেই যুক্ত হবে দেশি প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টার মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত টিকা থেকে আরো এক-দুই কোটি ডোজ। কিন্তু দেশে টিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরো সুযোগ থাকলেও সরকার তা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছে না বলে মনে করছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু দেশীয় সমস্যাই নয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির শিকার হয়েও টিকায় বাংলাদেশ প্রত্যাশিত জায়গা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে বলে অনেকে মনে করেন। এবার কোনো দেশই সরকারের বাইরে টিকা আমদানি-রপ্তানি করতে পারছে না। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রয়োজনমতো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিয়ে টিকা আমদানি করে নিজেদের হাতে রাখছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার নিজের হাতেই নিয়ন্ত্রণ বেশি রেখেছে। তা-ও আবার অনেক দেরি করে ফেলেছে। অন্য দেশগুলো আগেভাগে টিকা কিনে ফেলায় এখন বাংলাদেশ সরকারের হাতে টিকার জন্য পর্যাপ্ত টাকা থাকলেও সময়মতো টিকা পাচ্ছে না। আবার বেসরকারি খাতকেও জড়াচ্ছে না অতিরিক্ত খরচ বা কমিশন দেওয়ার ভয়ে।

ওই বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলেন, ‘এখন সব দেশই সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এবং অন্যান্য বিষয়ে বোঝাপড়ার মাধ্যমে টিকা ছাড় করছে বা চুক্তি করছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কম্পানিগুলোর ভূমিকা রাখার সুযোগ কমে গেছে। এখন সরকার যদি কোনো বেসরকারি কম্পানিকে টিকা আমদানি ও সরবরাহের সুযোগ দেয় তবেই সেটা হতে পারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের একটি বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাশিয়ার স্পুিনক লাইট টিকা দেশে এনে আমরা সরকারকে সরবরাহ করা ও উৎপাদনের জন্য অনেক দিন ধরে কাজ করছিলাম। রাশিয়া থেকে আমাদের বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের অনাপত্তি নিলেই কেবল তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু আমরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও সাড়া পাচ্ছি না। ওই টিকার আমদানি ও উৎপাদন—দুটি সুযোগই ঝুলে আছে। অথচ এটা করতে পারলে আমরা পাঁচ-দশ কোটি ডোজ টিকা এনে সরকারকে দিতে পারি, আবার এখানে উৎপাদনও শুরু করতে পারি।’ এর আগে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার স্পুিনক-ভি টিকা আনতে তারা প্রক্রিয়া শুরু করে সরকারের সাড়া না পেয়ে তা আনতে পারছে না।

আরেকটি কম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল দেশেই তাদের টিকা ফিল ফিনিশ করার জন্য। সেই প্রক্রিয়ায়ও এখন পর্যন্ত সরকার তেমন সায় দিচ্ছে না। এর আগে দেশে টিকা নিয়ে তৎপরতার প্রথমেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল চীনের সিনোভ্যাক কম্পানির টিকা দেশেই ট্রায়াল ও উৎপাদনের উদ্যোগে। সরকারের দীর্ঘসূত্রতার কবলে সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এ ছাড়া চীনেরই আইএমবিক্যাম নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের টিকা দেশে আইসিডিডিআরবির মাধ্যমে ট্রায়ালের প্রাথমিক অনুমতি দেওয়ার দুই মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তা আর এগোয়নি। এমনকি এই টিকা আমদানি ও দেশে উৎপাদনের বিষয়ে কথাবার্তা চলছিল। তা-ও এখন থেমে গেছে।

এই টিকার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, এখন বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে পড়ে আছে। অন্যদিকে নোভাভ্যাক্স টিকা দেশে আমদানি ও উৎপাদনের বিষয়েও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের পর তা আর এগোচ্ছে না। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে ভারত বায়োটেকের কোভ্যাক্সিন দেশে উৎপাদন ও ট্রায়ালের বিষয়ে তৎপরতা সম্পর্কে এখন আর তেমন কোনো অগ্রগতির খবরও জানাতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কেউ।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত দেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে; যাদের কেউ টিকা আমদানি করতে চায়, কেউ উৎপাদন করতে চায়, আবার কেউ কেউ ট্রায়াল করতে চায়। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই সরকারের সায় পাচ্ছে না।

ওই সূত্রগুলো জানায়, টিকা আমদানি ও উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকার নিজেই যোগাযোগ করছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে গতি খুবই ধীর রয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, টিকা নিয়ে যাতে বেসরকারি খাত কোনো বাণিজ্য করতে না পারে কিংবা বেশি টাকা দিতে না হয়।

তবে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, সরকারের নিজের ব্যবস্থাপনায় টিকা আনার পরিকল্পনা ভালোই ছিল, কিন্তু তারা সময়মতো কাজ করতে না পারায় এখন আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে টিকা কিনছে। সেরামের কাছ থেকে বেক্সিমকোর মাধ্যমে টিকা কিনতে গিয়ে কমিশনের টাকা দেওয়া নিয়ে সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে বলে সরকার বেসরকারি মাধ্যমে সায় দিতে চায় না বলেও তিনি মনে করেন।

ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল গ্রুপের (নাইটেগ) সদস্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের টিকা নিয়ে নতুন করে রোডম্যাপ তৈরি করে তা প্রকাশ্যে জানানো উচিত স্বচ্ছতার সঙ্গে। নয়তো এক ধরনের বিভ্রান্তি থেকেই যায়। সরকার কোন মাধ্যমে কতটা টিকা পাবে, সেটা জানানোর পাশাপাশি খরচও জানানো উচিত। কারণ টিকা নিয়ে এখন যে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে, সেখানে যেকোনো সময় যেকোনো মাধ্যমের টিকা আসার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন মানুষ যাতে ভুল না বোঝে কিংবা প্রকৃত পরিস্থিতি মানুষ বুঝতে পারে, সে জন্যই সরকারের অবস্থান আগেভাগেই ক্লিয়ার রাখা দরকার।’



সাতদিনের সেরা