kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

অকৃত্রিম ভালোবাসার মৃত্যু নেই

মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৪:০৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অকৃত্রিম ভালোবাসার মৃত্যু নেই

এই বাংলার এক নিভৃত গ্রামে শেখ মুজিব নামে যে ছেলেটির জন্ম হয়েছিল, তাঁর মা-বাবার আদরের খোকা যে একদিন একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হবেন, তা বোধ হয় খোকার বাল্য বয়সে কেউ অনুমান করেনি। গ্রামের আর দশটি ছেলের মতোই খোকা বেড়ে ওঠে গ্রামের তাল, তমাল আর হিজলের ছায়ায়। গোবিন্দচন্দ্র দাসের ‘বরষার বিল’ যেমন শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ করা, তেমনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র বিষয়বস্তু শেখ মুজিব মধুমতী তীরের মানুষ হিসেবে নিজে ধারণ করেছেন। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ বা ‘অপরাজিতা’র কাহিনির বিষয়বস্তু শেখ মুজিব তাঁর বাল্যকালের গ্রামে নিজের চোখে দেখেছেন। নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’র জ্বালা বিষয়ে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন। কারণ টুঙ্গিপাড়ার একটি বর্ধিষ্ণু পরিবারের সন্তান হলেও গাঁয়ের অন্য ছেলেদের সঙ্গে পুকুরে সাঁতার কেটে, গাছ থেকে লাফ দিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, দাঁড়িয়াবাঁধা, হাডুডু আর ফুটবল খেলে তিনি বাল্যকালে সময় কাটিয়েছেন। তাঁর বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি তাঁদের হাঁড়ির খবর রাখতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দোয়েলের ডাক শোনা, লেজ উঁচু করে ফিঙের এ গাছ থেকে ও গাছে যাওয়া, আর মাছ ধরার জন্য বকের ওত পেতে বসে থাকার দৃশ্যগুলো নিজে উপভোগ করেছেন। পালতোলা নৌকার কুলকুল শব্দ, বিলের মধ্যে কিশোর-কিশোরীদের মাছ ধরা, বাল্য বয়সে শাপলার নিচ থেকে শালুক তোলার দৃশ্য ছিল তাঁর অতিপরিচিত। কোন শেওড়াগাছে ঘুঘু বাসা বেঁধে ডিম দিয়েছে, কোন গাছের কোটরে কাঠঠোকরা বসে আছে, আর কোন উঁচু তালগাছে বাবুই পাখি বাসা বেঁধেছে—এগুলোও তিনি কৈশোরে খোঁজ রেখেছেন। গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ছিল তাঁর নখদর্পণে। সে জন্য পরবর্তী জীবনে শহরে থেকেও তিনি গ্রামকে ভোলেননি। রাজনীতিতে নিমগ্ন থাকলেও ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘আমার হাড় কালা করলাম রে’, ‘আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলা রে’ বা ‘কে যাওরে ভাটির গান গাইয়া’ প্রভৃতি গান তাঁকে আবেগপ্রবণ করত। এ জন্য এই গানগুলোর গীতিকার বা শিল্পীদের তিনি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতেন। জসীমউদ্দীন, আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন ও বেদার উদ্দীন আহমদের প্রতি তাঁর ছিল অন্য রকম ভালোবাসা। আবহমান বাংলার মানুষের অসাম্প্রদায়িকতাকে তুলে ধরার জন্য তিনি লালন সাঁই, হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন দত্ত, রমেশ শীল বা বিজয় সরকারকে আলাদা গুরুত্ব দিতেন। উচ্চাঙ্গসংগীতের কিংবদন্তি ওস্তাদ রবিশংকর ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে তিনি বিশেষ সম্মান করতেন। বাংলার মা, মাটি ও মানুষকে তুলে ধরার জন্য তিনি অতুলপ্রসাদ সেন, ডি এল রায়, রজনীকান্ত সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গানের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্র তাঁকে আবেগপ্রবণ করত। এমনি এক দুর্ভিক্ষের সময়ে তিনি বাল্য বয়সেই পিতার ধানের গোলা গ্রামের গরিব মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কামরুল হাসানের গ্রামবাংলার চিত্র তাঁকে বিশেষভাবে স্পর্শ করত।

গ্রামবাংলার মানুষের আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, হাসি-কান্না প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে তিনি পরিচিত ও একাত্ম ছিলেন। এই বাংলাদেশের মানুষের অভাব-অভিযোগ ও শোক-সন্তাপকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন। গুণ টেনে মাঝির নৌকা চালাবার কষ্ট, ভরদুপুরে কিষানের ঘর্মাক্ত দেহ, ঘানিতে তেল তৈরির দুর্দান্ত প্রচেষ্টা, ঢেঁকিতে চাল বের করার শ্রমসাধ্য কাজ এবং স্টেশনের কুলির বস্তা বহনের দৃশ্য তাঁকে মর্মাহত করত। ফলে এস এম সুলতানের এক পেশিবহুল কৃষক তাঁর কাম্য ছিল। এককথায় বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ সুখে থাকবে—এটাই ছিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা। দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করা এসব শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে তিনি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে তাঁর বাঙালিরা মোটা ভাত মোটা কাপড়ে থাকবে। তিনি এমন এক গ্রামীণ সমাজের কল্পনা করতেন, যেখানে পরিশ্রান্ত মানুষগুলোর গোলায় ধান, গোয়ালে গরু এবং পুকুরে মাছ থাকবে। সারা দিন পরিশ্রমের পর মানুষের অনাবিল আনন্দের জায়গা থাকবে। বিকেলে কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলা করবে, বয়স্করা তাদের সুবিধামতো বিনোদনে অংশ নেবে। গ্রামে যাত্রাপালা হবে, বিচারগানের আসর বসবে, কবিগানের কবিয়ালরা ছন্দে ছন্দে মানুষকে মাতিয়ে রাখবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তাদের নিজ নিজ উপাসনালয়ে যাবে। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে কোনো বাধা-নিষেধ থাকবে না। মুসলমানের ঈদে হিন্দুরা আমন্ত্রিত হবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবে যাবে মুসলমানরা; আবার খ্রিস্টানদের বড়দিনে এবং বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমায় যাবে সব ধর্মের লোক। মানুষ মানুষের রোগ-শোক ও দুঃখে পাশে দাঁড়াবে। দুর্যোগ-দুর্বিপাকের বিরুদ্ধে লড়বে একসঙ্গে। বাংলা ভাষার ভিত্তিতে তারা একতাবদ্ধ থাকবে। মানুষের ঐক্যের বড় সূত্র হবে বাংলা ভাষা। কারণ অন্যান্য কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও ভাষার যেহেতু পার্থক্য নেই, তাই ভাষাই বাঙালির ঐক্যের মূল জায়গা হবে।

গ্রামবাংলার মুজিব তাঁর শৈশব ও কৈশোরকে কখনো ভোলেননি। টুঙ্গিপাড়া, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও কলকাতা হয়ে তিনি ঢাকায় এসে থিতু হন। এরই মধ্যে জীবনের ২৭ বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু তাঁর গ্রাম তাঁর হৃদয়ে থেকে যায়। শহরের উঁচু প্রাসাদ তাঁকে গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তাই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বাংলার গ্রামের মানুষের ভিড় লেগে থাকত। ক্লান্তিহীন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব সব কিছুকে সামাল দিতেন অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে। এ জন্য মুজিব বাংলার শিকড় থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। ফলে তিনি সব সময় বাঙালিকে বলতে পারেন ‘আমার মানুষ’। এর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তিনি সত্যিকারভাবেই বাঙালিকে তাঁর নিজের মনে করেছেন। এ জন্য কর্মীদের ‘তুই’ বলতে তাঁর কোনো দ্বিধা হয় না। পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি পুরোটাই গাঁও-গেরামের বাঙালি রয়ে যান। বাইরে পায়জামা-পাঞ্জাবি আর বাসায় লুঙ্গি-গেঞ্জি তাঁর নিত্যদিনের পোশাক।

বঙ্গবন্ধু খাদ্যাভ্যাসেও পুরোপুরি বাঙালি ছিলেন। মাছের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আকর্ষণ। বিশেষ করে কই মাছ ছিল তাঁর অতিপ্রিয়। বেগম মুজিবের ছিল ভর্তার প্রতি ঝোঁক। বঙ্গবন্ধুর মাছ ও বেগম মুজিবের ভর্তাপ্রিয়তা নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও সাবেক কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর খাবার টেবিল, বাড়ির আসবাব কোনো কিছুতেই আতিশয্য ছিল না। এ জন্য জেলের প্রকোষ্ঠে থেকেও তিনি তাঁর বাঙালিকে মনে রাখেন। পাকিস্তানের কারাগারে থাকাবস্থায় ইয়াহিয়া খান তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার লাশটি বাংলার মাটিতে পৌঁছে দিও।’ আবার ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে যখন কথা বলেছেন, তাঁর অবহেলিত বাঙালির কথাই তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন। এটা ওই নেতার দ্বারাই সম্ভব, যাঁর মাটি বা শিকড়সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা যখন জানতে পারলেন যে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তিনি তখন খুনিদের বলেন, সিদ্ধান্তটি ভুল হয়েছে। শেখ মুজিবের লাশ বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তা না হলে তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে মাজার গড়ে উঠবে। ওই কর্মকর্তা হয়তো বঙ্গবন্ধুর শক্তিকে অনুধাবন করেছিলেন। কারণ যিনি বাঙালিকে সব কিছু উজাড় করে দিয়ে ভালোবেসেছিলেন, তাঁর ভুলত্রুটি থাকতে পারে; কিন্তু তাঁকে হত্যা করে তাঁর অস্তিত্বকে নিঃশেষ করা যায় না। যেসব মানুষ তার জাতিকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে তারা ইতিহাস থেকে মুছে যায় না। বন্দুকের নল দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঠেকানো যেতে পারে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার দেয়ালের ছবি তুলে ফেলা যেতে পারে, কারফিউ দিয়ে মানুষকে ঘরে আটকিয়ে রাখা যেতে পারে, কিন্তু বাংলার মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা মুছে ফেলা যাবে না। কারণ তাঁর গায়ে মাটির গন্ধ ছিল। যে মাটি থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন, সে মাটিতেই আবার ফিরে গেছেন। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো দিন কোনো দুর্বৃত্ত তাঁর কবরের পথে শ্রদ্ধা জানাবার জন্য ধাবমান মানুষের গতিরোধ করতে পারে, কিন্তু এই বাংলার বৃক্ষরাজির পত্রপল্লব, ফুল-পাখি ও অখণ্ড আকাশ তাঁকে পাহারা দেবে। কারণ তিনি যে এই প্রকৃতিকে ভালোবেসেছিলেন। অকৃত্রিম ভালোবাসার মৃত্যু নেই।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা