kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

ভিওআইপি চক্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি

► ভারতে সেনা গোয়েন্দা তথ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান
► কলকাতায় অভিযানে এক বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

বিশেষ প্রতিনিধি   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভিওআইপি চক্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি

ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল বা ভিওআইপির অবৈধ কারবারিরা শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠছেন। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ চোরাকারবারিরা দেশের বাইরেও তাঁদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এঁদের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সংযোগ রয়েছে বলেও সন্দেহ বাড়ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গোপনীয় প্রতিরক্ষা তথ্য জানার চেষ্টা হচ্ছে বলে দেশটির বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে এবং বৃহস্পতিবার কলকাতা বিমানবন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আবু সুফিয়ান মামুন নামের এক বাংলাদেশিও রয়েছেন। মামুন সেখানে গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে ভিওআইপির অবৈধ কারবার সম্পর্কেও তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে, আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এদিকে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে জানান, সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ছাড়াও ভিওআইপির অবৈধ কারবারিরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

দেশে এই চক্রের সঙ্গে সরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির বিভিন্ন অভিযান ও অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া প্রচার রয়েছে যে পিতার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন নামের এক বিতর্কিত ব্যক্তি এই চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

এ বিষয়ে তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের পরও মোবাইল ফোন অপারেটরদের সিম যেভাবে ভিওআইপির অবৈধ কারবারে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ মিলছে, তা উদ্বেগজনক। ভুয়া নিবন্ধনের বা নিবন্ধন ছাড়া সিম কারো হাতে থাকলে তা সরকারের পর্যবেক্ষণের বাইরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

কলকাতায় এই চক্রের তিনজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার বিষয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে গতকাল প্রকাশিত ‘গোপন ফোন এক্সচেঞ্জ চক্র ফাঁস, জালে ৩’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সিম বক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে গোপনে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ চালানো এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে এক বাংলাদেশিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। পুলিশ জানায়, ধৃতদের নাম আবু সুফিয়ান মামুন, রণজিৎ নাহা ও ইরশাদ আলী মল্লিক। ধৃতদের কাছ থেকে ২৩টি সিম বক্স, ১৭টি রাউটার ও সুইচ এবং ৬৫০টিরও বেশি প্রি-অ্যাক্টিভেটেড সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জঙ্গিযোগের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’

ওই তিনজনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া গেছে বিভিন্ন মোবাইল পরিষেবা সংস্থার ওয়াই-ফাই মডেম। ল্যাপটপ, ডাটা কেব?ল এবং মোবাইল যোগাযোগের অন্যান্য যন্ত্রপাতিও বাজেয়াপ্ত করেছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানায়, মামুন বাংলাদেশের নোয়াখালীর বাসিন্দা। রণজিতের বাড়ি জলপাইগুড়ির পানপাড়া এলাকায়। তিনি শিলিগুড়ি আশ্রমপাড়ায় ভাড়া থাকতেন। ইরশাদ নদীয়ার নাকাশিপাড়ার বাসিন্দা। ধৃতদের বিরুদ্ধে কলকাতা এয়ারপোর্ট থানায় ভারতীয় দণ্ডবিধি, ইন্ডিয়ান টেলিগ্রাফ অ্যাক্ট, ইন্ডিয়ান ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ অ্যাক্ট এবং ফরেনার্স অ্যাক্টের বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে।

এসটিএফ সূত্রের বরাতে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দুই বছর ধরে বাংলাদেশে সিম কার্ডের ব্যবসা চালাচ্ছিলেন মামুন। রণজিৎ শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে আত্মীয়দের বাড়িতে মাসিক টাকার বিনিময়ে সিম বক্স রেখে ওই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বানিয়েছিলেন। নতুন প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্দেশে মামুন ও রণজিৎ বুধবার রাতে ইরশাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। সেই সময়ই তাঁদের পাকড়াও করে এসটিএফ।

পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার অভিযান চালিয়ে কলকাতা বিমানবন্দর এলাকা থেকে ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতদের জেরা করে ওই রাতে একই সঙ্গে বিধাননগর, কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে তল্লাশি চালিয়ে অনেক সিম বক্স ও প্রচুর প্রি-অ্যাক্টিভেটেড মোবাইল সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, রাজ্যে সিম বক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ধরনের বেআইনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ চালানোর অভিযোগ আগেও উঠেছে। এই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে বিদেশ থেকে আসা কল স্থানীয় নম্বরের হিসাবে দেখানো যায়। যার ফলে সরকারের প্রচুর টাকা লোকসান হয়। শুধু তা-ই নয়, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির ফাঁক গলে জঙ্গি বা আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছিল—এমন সন্দেহ বা আশঙ্কার কথাও উড়িয়ে দিতে পারছেন না গোয়েন্দারা।

ধৃতদের জেরা করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মূলত পশ্চিম এশিয়া এবং বাংলাদেশ থেকে কলিং কার্ডের মাধ্যমে ওই ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট কল আসত তাঁদের সিম বক্সে। সিম বক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোকে স্থানীয় নম্বরে পরিবর্তন করা যেত। তার ফলে সরকার এবং বিভিন্ন টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার ক্ষতি হচ্ছিল। এসটিএফ সূত্রের খবর, এই নম্বর পরিবর্তনের ফলে সেগুলো আদতে কোন নম্বর থেকে এসেছিল, তারও প্রমাণ থাকে না। এর ফলে এগুলো জঙ্গি এবং অপরাধচক্রের লোকেদের কাছেও জনপ্রিয়। প্রতিটি সিম বক্সে ৭০ থেকে ২৫৬টি প্রি-অ্যাক্টিভেটেড সিম কার্ড থাকে।

মামুন, রণজিৎ ও ইরশাদকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করানো হয়। ভারপ্রাপ্ত এসিজেএম মহম্মদ মেহেতাব আলমের কাছে সরকারি আইনজীবী সুদীপ সরকার ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের আর্জি জানান। বিচারক আট দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২০ আগস্ট প্রকাশিত টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন অনুসারে ওই সময় ভারতের গুজরাট রাজ্যের আনন্দ জেলার একটি বাড়ি থেকে ভিওআইপির অবৈধ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সন্ধান পায় সেখানকার পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় বাবর আলী আনসারী ও মির ফয়সল আনসারী নামের দুই যুবককে। ধৃতরা পুলিশকে জানান, তাঁরা দুবাইয়ে অবস্থানকারী জলিল নামে একজনের হয়ে কাজ করেন। তাঁদের কাছে ভিওআইপির অবৈধ সরঞ্জাম আসে কুরিয়ারের মাধ্যমে এবং ৪০ হাজার রুপি দিয়ে বাড়ি ভাড়া করে তাঁরা সেখানে ওই অবৈধ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ গড়ে তোলেন। গুজরাট পুলিশ বাড়িটি থেকে চারটি সিম বক্স, পশ্চিম বাংলা ও ওড়িশার ৬১টি সিম এবং পাঁচটি ওয়াইফাই রাউডার উদ্ধার করে। গুজরাট পুলিশ বিষয়টিকে শুধু অবৈধ আয়ের পথ হিসেবে নয়, সন্ত্রাসীদের গোপন যোগাযোগের মাধ্যম এবং রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করে।

গত জুন মাসে বেঙ্গালুরুতে ভারতের সামরিক গোয়েন্দা ও বেঙ্গালুরু পুলিশের যৌথ অভিযানে সেখানকার ছয়টি স্থাপনা থেকে ৩২টি সিম বক্স উদ্ধার করা হয়। এসব স্থাপনায় গড়ে ওঠা ভিওআইপির অবৈধ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেল্প লাইনগুলোতে ফোন করে তাদের গতিবিধি জানার চেষ্টা করছিল বলে গত ৯ জুন প্রকাশিত ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে জানানো হয়। গত ৩১ মে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শিবাজীনগর এলাকা থেকে সামীর আলওয়ারি নামের একজনকে তাঁর বাড়ি থেকে পাঁচটি সিম বক্সসহ গ্রেপ্তার করে। এ ক্ষেত্রেও ওই অবৈধ স্থাপনা থেকে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর তথ্য জানার অপচেষ্টা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। গত ১৯ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, পশ্চিম বাংলার কলকাতার হাওড়ায় বেণীমাধব মুখার্জি লেন থেকে তিনটি সিম বক্স ও অন্য যন্ত্র-সরঞ্জামসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ প্রতিবেদনেও বলা হয়, এসব সিম বক্স ও অন্য যন্ত্র-সরঞ্জামের মাধ্যমে গোপনীয় প্রতিরক্ষা তথ্য জানার চেষ্টা হচ্ছিল।



সাতদিনের সেরা