kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

অনলাইনে কিশোর-তরুণ: ‘মগজ ধোলাই’ করছে এবিটি

► নারী ইউনিট গড়ে তুলেছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনটি
► বিয়ের কথাবার্তার মধ্যেই ঘর ছেড়ে জঙ্গিবাদে তরুণী নাবিলা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনলাইনে কিশোর-তরুণ: ‘মগজ ধোলাই’ করছে এবিটি

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) একটি নতুন নারী ইউনিট গঠন করেছে। বর্তমানে তাদের বেশির ভাগ অনলাইনে যুক্ত। জঙ্গি ওই সংগঠনটির সদস্য সন্দেহে কলেজছাত্রী জোবায়ইদা সিদ্দিকা নাবিলাকে (১৯) গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য জানা যাচ্ছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, এই তরুণী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নারী ইউনিটের প্রথম সদস্য।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে অনলাইনে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনটির মগজ ধোলাইয়ের নিশানায় রয়েছে কিশোর-তরুণরা।

গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে নাবিলাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। পাঁচ দিনের হেফাজতে নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার তথ্য পান তদন্তকারীরা। আজ বুধবার নাবিলার রিমান্ড শেষ হচ্ছে।

ভোলার লালমোহনের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান জোবায়দা সিদ্দিকা নাবিলা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা দিতেই বদলে যান। আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ের কথাবার্তা চললেও ছেলে তাঁর মতাদর্শের না হলে বিয়ে করবেন না বলেও শর্ত দেন। এর মধ্যেই দুই মাস আগে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে ঢাকায় চলে আসেন এই তরুণী।

আনসারুল্লাহর জঙ্গিরা নিজেদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের অনুসারী পরিচয় দিয়ে থাকে। সে অনুযায়ী নাবিলাও মূলত আল-কায়েদার মতাদর্শী। তাঁর আয়ত্তে দুটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছাড়াও টেলিগ্রাম চ্যানেলে চারটি অ্যাকাউন্ট ছিল। ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মনামে তিনি এসব অ্যাকাউন্ট চালাতেন। টেলিগ্রামে তাঁর ১৫টি চ্যানেল ছিল। এসব চ্যানেলে তিনি আল-কায়েদার মতাদর্শ প্রচার করতেন জানিয়ে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, গত দুই বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যাদের গ্রেপ্তার করেছে তাদের বড় অংশই অনলাইনে সক্রিয় ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে তারা সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে করোনাকালে তরুণ-তরুণীদের বেশির ভাগ সময় ঘরে থাকতে হচ্ছে। এই লম্বা সময়ে তাদের অনেকেই উগ্র জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আনসারুল্লাহ একে সুযোগ হিসেবে নিয়ে এরই মধ্যে অনেক তরুণ-তরুণীকে দলে ভিড়িয়েছে। এসব তরুণীর কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়েছে কি না তদন্ত চলছে। যেহেতু এখন আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাই এ বিষয়ে তাঁরা সতর্ক বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সিটিটিসির প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, নাবিলা ২০২০ সালের প্রথম দিকে ছদ্মনামে একটি  ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে আনসারুল্লাহর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ‘তিতুমীর মিডিয়া’র খোঁজ পান। এরপর ধীরে ধীরে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে নিজেই আনসারুল্লাহর মতবাদ প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, পরিবার চেষ্টা করেছিল তাঁকে জঙ্গিবাদ থেকে দূরে সরিয়ে আনতে, কিন্তু পারেনি।

এর আগে বিভিন্ন সময় পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা ২০০৮ সাল পর্যন্ত জামিয়াতুল মুসলেমিন নামের একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের হয়ে কাজ করত। বাংলাদেশে ২০০৯ সাল থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে এই গোষ্ঠী নতুন করে সংগঠিত হয়। ২০১৫ সালে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় পুলিশ। এরই মধ্যে কয়েকজন লেখক ও ব্লগার খুনের ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পান তদন্তকারীরা। ২০১৬ সালে সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যাকাণ্ডের মামলায় গতকাল সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াসহ এই সংগঠনের ছয় জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, দেশে এর আগে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের ভাবশিষ্য নব্য জেএমবি (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) ও পুরনো জেএমবির নারী শাখার সন্ধান পেলেও আনসারুল্লাহর এমন শাখার খোঁজ পাননি তাঁরা। বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের নারী সদস্য গ্রেপ্তার হলেও নাবিলার মতো প্রশিক্ষিত ছিল না কেউ। আনসারুল্লাহর হয়ে জঙ্গিবাদ প্রচার করতেন তিনি। একই সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সামরিক শাখার সঙ্গেও তাঁর ‘যোগাযোগ ছিল’। নাবিলাকে গ্রেপ্তারের পর তাঁরা ধারণা করছেন, আল-কায়েদার অনুসারী এই জঙ্গিগোষ্ঠী নারীদেরও তাদের দলে ভেড়াতে শুরু করেছে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, নাবিলার মগজ এমনভাবে ধোলাই করা হয়েছে যে তিনি কথিত জিহাদে গিয়ে ‘শহীদ হওয়ার জন্য’ মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। নাবিলাসহ যারা এরই মধ্যে জঙ্গিবাদে পা দিয়েছে তারা কারো না কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাদের সেসব ‘গুরুদের’ শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

জিজ্ঞাসাবাদে নাবিলা অকপটে জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন জানিয়ে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার সপক্ষে নানা বক্তব্যও তুলে ধরার চেষ্টা করেন এই তরুণী। এ ক্ষেত্রে নাবিলা অনেক কট্টরপন্থী। তিনি কার মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন এবং কার কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে।



সাতদিনের সেরা