kalerkantho

সোমবার । ৫ আশ্বিন ১৪২৮। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১২ সফর ১৪৪৩

১৪ দলীয় জোটে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে

তৈমুর ফারুক তুষার   

২৯ আগস্ট, ২০২১ ০৭:৪৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১৪ দলীয় জোটে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে এখন ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে। জোটে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে বাংলাদেশ জাসদ। আরেক শরিক হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বাহাস চলছে। জোটের শরিক অন্তত তিনটি বাম দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। কিন্তু স্বতন্ত্র অবস্থান নেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় তারা অসন্তোষ নিয়েই জোটে থাকছে। ক্ষমতাসীন জোটটির শরিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ জাসদের দলীয় এক অনুষ্ঠানে দলটির সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া বলেছেন, ‘আমরা ১৪ দলের কোনো কর্মসূচিতে যাই না। তবে এখনো জোট থেকে বের হয়ে যাইনি।’

জোটে দলটির অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে শরিফ নুরুল আম্বিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই যাই না (কর্মসূচিতে)। ১৪ দল তো এখন শুধু দিবসভিত্তিক কিছু কর্মসূচি পালন করে থাকে। অন্য কোনো ইস্যুতে তেমন আলাপ নেই। আওয়ামী লীগ যদি আলাপ না করতে চায়, তাহলে আমরা তো তাদের বাধ্য করতে পারব না। শুরুতে ১৪ দলের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। জোটটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পেরেছে। এখন আর সে অবস্থা নেই।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বর্তমান সময়ের কর্মকাণ্ড জোটের হারমনির (ছন্দ) সঙ্গে যায় না। তাদের অনেকেই দুর্নীতিতে মগ্ন। সেক্যুলার রাজনীতি করার যে কষ্ট তা তারা করতে চায় না। এটা বঙ্গবন্ধু করেছেন। তিনি গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিজেদের মতাদর্শের পক্ষে পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু এখনকার আওয়ামী লীগ তা চায় না। তারা চায় নানা সমীকরণ মিলিয়ে ক্ষমতায় থাকতে। তারা চায় নানা কিছু দখল করতে। কিন্তু মানুষকে পরিবর্তন করে নিজেদের পক্ষে আনার দিকে তারা নেই।’

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছরই ২৩ দফা ঘোষণা দিয়ে ১৪ দলীয় জোটের যাত্রা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ১১ দলীয় জোট মিলে এই জোট গঠিত হয়। কিন্তু জোট গঠনের পরপরই ১১ দল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)সহ কয়েকটি দল বেরিয়ে যায়। কিন্তু জোটটি ১৪ দল নামেই বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় জোটের শরিক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ১৪ দল ছেড়ে না গেলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার প্রায় ১৩ বছরে আর কোনো দল আওয়ামী লীগের জোট ছেড়ে যায়নি। বরং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) ও নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর নেতৃত্বাধীন তরিকত ফেডারেশন জোটে যোগ দেয়। এখন যদি বাংলাদেশ জাসদ বেরিয়ে যায়, তাহলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ে এই প্রথম জোটটিতে ভাঙন দেখা যাবে।

জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের সঙ্গেও বেশ টানাপড়েন চলছে আওয়ামী লীগের। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এক আলোচনাসভায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু ও কর্নেল তাহের বাংলাদেশ বেতারে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে এ হত্যাকাণ্ডে তাঁদেরও দায় আছে মন্তব্য করেন। এর আগে আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাও বঙ্গবন্ধু হত্যায় জাসদের দায় আছে বলে মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে নেতিবাচক সমালোচনা শুনে ক্ষুব্ধ জাসদের কেন্দ্রীয় নেতারা। তাঁরাও পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন। শেখ সেলিমের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দেয় জাসদ। দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জাসদকে যুক্ত করে বক্তব্য প্রদানকারী শেখ সেলিম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর আপন মামা বঙ্গবন্ধু ও আপন ভাই শেখ মনির লাশ ফেলে রেখে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন আমেরিকার দূতাবাসে গিয়ে কী করেছিলেন, তা জাতি জানতে চায়।’

সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ ও জাসদের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য জোটের মধ্যে অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। দিবসভিত্তিক ভার্চুয়াল সভা-সেমিনার আয়োজন ছাড়া কার্যত নিষ্ক্রিয় ১৪ দলের এই দুই শরিকের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি বাড়তে থাকলে তার পরিণতি হতে পারে জোট ভাঙন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাসদের একজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের ভূমিকা নিয়ে আওয়ামী লীগ সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জাসদকে সম্পৃক্ত করতে চাওয়াটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁরা তো আওয়ামী লীগের নেতাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে যান না। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা এগুলো করতে চাইলে তা জোটের জন্য ক্ষতিকর হবে।

সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে ১৪ দলের বেশ কয়েকটি শরিক ক্ষুব্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তির বিকল্প কোনো বড় রাজনৈতিক জোট না থাকায় তারা জোট ছাড়ছে না। আবার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা নেই বলে অনেকটা বাধ্য হয়েই জোটে থাকছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরিক একটি বাম দলের সাধারণ সম্পাদক কালের কণ্ঠকে বলেন, জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এখন আর ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা করছে না। তাঁরা উপেক্ষিত। কিন্তু জোট ছেড়ে কই যাবেন আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে গত ১৭ বছরে তেমন কোনো সাংগঠনিক লাভও হয়নি। সব মিলিয়ে দোটানায় আছেন তাঁরা।

জানতে চাইলে ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের জোট হলো অসম একটি জোট। এখানে কখনোই সবার মতামতের ভিত্তিতে কিছু করার পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। বরাবরই আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য।’ তিনি বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ কিভাবে করবে, কী করবে এটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তারা যদি নির্বাচন সামনে রেখে দক্ষিণপন্থী (ধর্মভিত্তিক) দলগুলোর দিকে ঝোঁকে, তাহলে ১৪ দলের বামদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব বাড়বে।’



সাতদিনের সেরা