kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

ভিওআইপি দুর্নীতি খুঁজতে গিয়ে হুমকিতে বিটিআরসি কর্মকর্তারা

ভিওআইপির পাচারের অর্থে বিদেশে শারুনের সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৬ আগস্ট, ২০২১ ০২:৫৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভিওআইপি দুর্নীতি খুঁজতে গিয়ে হুমকিতে বিটিআরসি কর্মকর্তারা

টেলিটকের ভিওআইপি দুর্নীতি খুঁজতে গিয়ে বিটিআরসির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেটের পরিদর্শকদলের কয়েকজন সদস্য এখন হুমকির মুখে। বেশি এগোতে গেলে তাঁদের প্রমোশন আটকে যাবে—এমন কথা বলা হচ্ছে। কে দিচ্ছে এমন হুমকি—এ প্রশ্নে ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ে এ ধরনের হুমকি আসছে। বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মধ্যে একধরনের দূরত্বও তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশ্লেষণ।

তাঁরা বলছেন, টেলিটকের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র ভিওআইপির চোরাকারবারে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। তাদের নেতৃত্বে আছেন শারুন নামের একজন।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, এই অপকর্মটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের। টেলিটকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এটা করছেন, তা বলা যায় না।

এ বিষয়ে বিটিআরসির তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত কেন আমলে নেওয়া হয়নি—এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিটিআরসিকে বলেছি, মূল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে হবে। বিটিআরসি যে তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের বিভাগে পাঠিয়েছে, এতে অপরাধীদের সেভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।’

প্রসঙ্গত, গত ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি ও র‌্যাব ভিওআইপির অবৈধ কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে রাজধানী থেকে ভিওআইপির অবৈধ কারবারে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ১৯টি সিম বক্স ডিভাইস, ৪১৬টি জিএসএম অ্যান্টেনা, তিন হাজার ৪০০টি টেলিটক সিম ও সাতটি মিনি কম্পিউটারসহ অন্যান্য ভিওআইপি সামগ্রী। এরপর ২৩ ও ২৪ মার্চ টেলিটকের নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) এবং এর প্রধান কার্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন করে বিটিআরসির পরিদর্শকদল ভিওআইপির অবৈধ কারবারের সঙ্গে টেলিটকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়।

এ বিষয়ে মন্ত্রীর আরো বক্তব্য, দেশে একসময় আন্তর্জাতিক কল বলে কিছুই থাকবে না। ওটিটি (ওভার দ্য টপ) বা হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো, স্কাইপ—এসব ইন্টারনেটভিত্তিক যেগাযোগ প্ল্যাটফর্মের কারণে ভয়েস কল দ্রুত কমে যাচ্ছে।

কিন্তু বিটিআরসির তথ্য-উপাত্ত বলছে, ওটিটির কারণে বিদেশ থেকে আসা কলের পরিমাণ কমেনি। গত বছর জানুয়ারিতে বিদেশ থেকে আসা কলের পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ১২৭ মিনিট। ফেব্রুয়ারিতে আসে ৬৪ কোটি আট লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ মিনিট। এরপর দেশে করোনার প্রাদুর্ভব শুরুর মাস মার্চে আসে ৯৩ কোটি ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৫৯৯ মিনিট। এপ্রিলে আসে ৭২ কোটি ৭৫ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৩ মিনিট। মে মাসে আসে ৭৯ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৭ মিনিট। সব মিলিয়ে গত বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ কোটি মিনিট কল আসে।

এ ছাড়া গত ২৭ জুলাই বিটিআরসির ২৫৩তম সভায় মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের সিম বক্স ডিটেকশন সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে যে আলোচনা হয় তাতে অবৈধ টার্মিনেশনের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়। বলা হয়, অবৈধ পন্থায় নিবন্ধিত সিমের অপব্যবহার রোধ করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষায়িত ডিটেকশন ও মনিটরিং সিস্টেম থাকলে বৈদেশিক কল থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। ওই সভায় চলতি অর্থবছরেই সিম বক্স ডিটেকশন, প্রটেকশন, মনিটরিং অথবা অনুরূপ প্রযুক্তি সিস্টেম স্থাপন ও সার্ভিস কেনার প্রস্তাব রাখা হয়।

আইজিডাব্লিউ অপারেটররা বিপাকে : ভিওআইপির অবৈধ কারবারের কারণে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে বা আইজিডাব্লিউ অপারেটররাও এখন চরম বিপাকে। সম্প্রতি বিটিআরসির কাছে আইজিডাব্লিউ অপারেটরদের ফোরাম আইওএফ দাবি জানায়, বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কল কমে যাওয়ায় অপারেটরপ্রতি তাদের বাৎসরিক লাইসেন্স নবায়ন ফি তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকার বদলে এক কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে হবে এবং বিলম্ব মাসুল ছাড়াই এই ফি পরিশোধের সময়সীমা বাড়াতে হবে। রেভিনিউ শেয়ারিং ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করতে হবে। পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ বিদ্যমান সাড়ে সাত কোটি টাকা থেকে এক কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে হবে। সব বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব ফি মওকুফ করতে হবে। ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পরে বার্ষিক নবায়ন ফি এক কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

বিদেশে শারুনের সম্পদের পাহাড় : এদিকে অভিযোগ রয়েছে, ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা থেকে লুটে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম ওরফে শারুন চৌধুরী। পাচারের অর্থে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে গড়েছেন বহু সম্পদ। রয়েছে বাগানবাড়ি, অভিজাত এলাকায় দামি ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দামি গাড়িসহ অনেক কিছু। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে। অনুসন্ধান বলছে, অবৈধ ভিওআইপির পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বাণিজ্যেও সীমাহীন দুর্নীতি চালিয়ে আসছেন শারুন চৌধুরী। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ে ভর করে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের দায়িত্বশীলদের চোখে ধুলো দিয়ে দীর্ঘদিন ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা জোরদারভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন শারুন চৌধুরী। এই অবৈধ ব্যবসায় শারুনের পাশে রয়েছেন টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাহাব উদ্দিনসহ এই প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে কার্যালয় খুলে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এই ব্যবসা। টেলিটকের সিম ব্যবহার করে অবাধে ভিওআইপির চোরাকারবার চালিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

জানা যায়, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ দেশে আনেন না শারুন চৌধুরী। এই অর্থে বিদেশে গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিলাসবহুল এলাকায় বাড়ি নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে শারুন চৌধুরীর। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান তো আছেই। তবে ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা আড়াল করতে অন্যান্য খাতেও ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন তিনি। মূলত এই খাতগুলোও তাঁর অর্থপাচারের অপকৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে দুবাইয়ের পাথরের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যবসাও বিস্তৃত করেছেন শারুন চৌধুরী। দুবাইসহ অন্যান্য দেশ থেকে নিয়মিত পাথর আমদানি চালিয়ে আসছেন তিনি। এই আমদানি বাণিজ্যের আড়ালেও দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছেন তিনি। কখনো ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার, কখনো বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এই ব্যবসার পরিধি ক্রমেই বাড়িয়ে চলছেন। চট্টগ্রাম কাস্টমসে দাখিলকৃত তাঁর কম্পানির ইনভয়েসের সঙ্গে সমসাময়িক অন্যান্য ইনভয়েস পর্যালোচনা করলে এই সূক্ষ্ম কারচুপির বিষয়টি ধরা পড়ে।

এই অর্থ কোথায় পাচার করেন, পাচারের অর্থে কী-ই বা করছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কালের কণ্ঠ আলাপ চালিয়ে যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক সূত্রের সঙ্গে। খোদ শারুনের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তির সঙ্গেও কথা হয়। তাতে বেরিয়ে আসে অনেক ঘটনা। সূত্রের দেওয়া তথ্য বলছে, দুবাইয়ে হুইপ পরিবারের নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। পাচারকৃত টাকা প্রধানত দুবাই শহর এবং রাস-আল-খাইমা (আরএকেইজেড) ফ্রি জোনে বিনিয়োগ করেছেন শারুন চৌধুরী। সেখানে রয়েছে তাঁর একাধিক ব্যবসা। হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি বাংলা অ্যারাবিয়া মার্কেট অথবা অ্যারাবিয়া বাংলা মার্কেট নামে একটি মার্কেটে রয়েছে আটটি দোকান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শারজাহর আল-ফুজাইরাহ এলাকায় প্রায় ৭০-৮০ বিঘা জমির ওপর একটি বাগানবাড়িও রয়েছে শারুন চৌধুরীর। বাড়িটির মালিক হিসেবে হেলাল আকবর বাবর নামে একজনের কথা প্রচার থাকলেও এর প্রকৃত মালিক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে শারুন চৌধুরী। হেলালের দুবাইযাত্রার পেছনেও ছিল হুইপের সরাসরি ভূমিকা।

তথ্য মতে, দুবাইয়ে ‘চট্টগ্রাম রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে শারুনের। এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর এক নিকটাত্মীয়। আছে একটি রোলস-রয়েস গাড়ি, যেটির নম্বর তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইলের শেষ কয়েক ডিজিটের সঙ্গে মেলানো। সোর্স দাবি করেছেন, দুবাইয়ে অবস্থিত চট্টগ্রাম রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের সঙ্গে কৌশলে আলাপ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

শারুন তাঁর ঘনিষ্ঠ একজনের সঙ্গে ?দুবাইয়ে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয়ে আলাপ করেছেন। ভবনটি ১৫ অথবা ২৫ তলাবিশিষ্ট। নির্দিষ্ট লোকেশন এখনো পাওয়া যায়নি, তবে রাকেজের ফ্রি জোনে হতে পারে বলে জোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, পাচারের টাকায় শুধু দুবাইয়ে নয়, সম্পদ গড়েছেন মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও। কুয়ালালামপুরের অভিজাত এলাকা মুনকিয়ারাতে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। মালয়েশিয়ায় আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জানান, ওই ফ্ল্যাটটি প্রথমে শারুনের একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির নামে নিবন্ধন করা হয়। পরে সেটি নিজের নামে দলিল করে নেন শারুন।

শুধু বিদেশে নয়, দেশেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন শারুন চৌধুরী। জানা গেছে, রাজধানীর গুলশান থানার অদূরে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি কিনেছেন। গত ১০ বছরে হুইপের সম্পদ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য দিয়েছিল খোদ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুই বছর আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেশের ২২ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এই তালিকার অন্যতম ছিলেন হুইপ সামশুল হক চৌধুরী। ওই সময় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে সামশুল হকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অনুরোধ জানায় দুদক।



সাতদিনের সেরা