kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

করোনায় হাসপাতাল

প্রণোদনা পেলেও ছাড় পাচ্ছে না রোগীরা

ফারজানা লাবনী   

২৫ আগস্ট, ২০২১ ০২:৪৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রণোদনা পেলেও ছাড় পাচ্ছে না রোগীরা

করোনাকালে বাড়তি সুবিধা হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ওয়ার্কিং মূলধনের ৩০ শতাংশ প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। যন্ত্রপাতি ও ওষুধ আমদানিতে আগেই রাজস্ব ছাড় ছিল। করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগী বেড়েছে কয়েক গুণ। বাড়তি রোগী এবং এত সব সুবিধা পেয়েও অনেক হাসপাতাল আয় বাড়াতে সেবা ও ওষুধের দাম নিচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। রোগীকে অকারণে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেও বাধ্য করেছে। আইসিইউতে থাকা একজন করোনা রোগীর কাছ থেকে দৈনিক লাখ টাকাও আদায় করেছে। এর বাইরেও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আকাশছোঁয়া বিল নিচ্ছে। করোনা চিকিৎসার খরচ জোগাড়ে অনেকে শেষ সম্বলটুকু ভেঙে ধারকর্জও করেছেন। এখন সংসারের নিয়মিত খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ এ বছর ভ্যাট-কর পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই বলে জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, চলতি বাজেটে করোনা আক্রান্তদের কর পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত ছিল।

রাজধানীর প্রথম সারির একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ২ জানুয়ারি ৭০ বছরের হাসান আহমেদ ভর্তি হন করোনা আক্রান্ত হয়ে। তাঁর বড় ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সোহেল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আব্বাকে ২৪ দিন আইসিইউতে রেখে ১৮ লাখ টাকা বিল দিয়েও বাঁচানো যায়নি। আমার জমানো কিছু ছিল, আর ধার করে হাসপাতালের বিল দিয়েছি। আব্বা মারা যাওয়ার চার দিন পরেই আমার আম্মা, স্ত্রী ও দুই বাচ্চার করোনা পজিটিভ হয়। আম্মাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেও সিট পাইনি। আম্মার শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে নিতে হয়। উনার জন্য ১১ দিনে আট লাখ টাকা বিলের সবটা ধার করে দিয়েছি।’

সোহেল আহমেদ বলেন, আম্মাকে অ্যাকটেমরা নামের একটি ইনজেকশন দিতে হয়। বাইরে এই ইনজেকশনটির দাম ৭০ হাজার টাকা হলেও বিল করার সময় দেখি হাসপাতাল দুই লাখ টাকা ধরেছে। আমার স্ত্রী ও দুই বাচ্চাকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দিলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবারের জন্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। ধারদেনায় ঢুবে আছি। এমন পরিস্থিতিতে ঘরভাড়া, বাচ্চাদের পড়ার খরচ জোগাড় করতেই কষ্ট হচ্ছে। প্রতিবছর নিয়মিত কর দিলেও এবার দেওয়া সম্ভব হবে না।’

সরেজমিনে রাজধানীর মহাখালী কভিড ডেডিকেটেড সরকারি হাসপাতাল, পপুলার, স্কয়ার, ইউনাইটেড, এভারকেয়ারসহ বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, করোনা আক্রান্ত হয়েছে কি না পরীক্ষা করতে ১০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। বাসায় গিয়ে রোগীর স্যাম্পল নিলে এর সঙ্গে আরো ১০০০ টাকা যোগ হয়। সাধারণত অক্সিজেন লেভেল ৯০-এর কম হলে বা শ্বাসকষ্ট হলে রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন। অক্সিজেন লেভেল কমতে থাকলে আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে। করোনা চিকিৎসায় প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ, বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, কাশির ওষুধ, রোগ প্রতিরোগকারী বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন দেওয়া হয়। অবস্থা কিছুটা জটিল হলে কার্ডিনেক্স, রেমডিসিভির জাতীয় ও অ্যাকটেমরার মতো ইনজেকশন দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে এসব ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহের কথা থাকলেও বেশির ভাগ হাসপাতাল নেই জানিয়ে বাইরে থেকে কিনতে বলে। বেসরকারি হাসপাতাল এসব ওষুধের দাম যার কাছ থেকে যা নিতে পারে। কার্ডিনেক্সের দাম ৪০০ থেকে দুই হাজার টাকা, রেমডিসিভির জাতীয় ওষুধের দাম ১৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং অ্যাকটেমরা ৭০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম ধরা হচ্ছে। এ ছাড়া সিটি স্ক্যান ও বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষায়ও বিভিন্ন হাসপাতালে বিভিন্ন দাম ধরা হয়। সিটি স্ক্যান করতে আড়াই হাজার থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক রোকেয়া বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও কার্ডিনেক্স ও রেমডিসিভির জাতীয় ওষুধের সরবরাহ নেই বলে হাসপাতাল থেকে জানানোর পর রেমডিসিভির বাইরে থেকে প্রথমে দুইটা কিনেছি ১৭০০ টাকা করে। পরে দোকানি জানিয়েছেন সরবরাহ কম। বাধ্য হয়ে একেকটি তিন হাজার টাকা করে কিনেছি। এতে মোট সাতটি ১৮ হাজার ৪০০ টাকা এবং কার্ডিনেক্স একটি ৫২৪ টাকা করে ৩০টি ১৫৭২০ টাকা দিয়ে কিনেছি। অন্যান্য ওষুধের খরচ তো আছেই।’ তিনি অসহায় কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছে। একমাত্র ছেলে পড়ালেখার ফাঁকে একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করে। গত দুই দিন থেকে ছেলেটারও করোনা হয়েছে। অবস্থা ভালো না। এখানে ভর্তি। ওর জন্যও একই রকম খরচ হচ্ছে। এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব? প্রতিবছর নিয়মিত কর দিয়ে থাকি। এবার করোনা চিকিৎসায় নিঃস্ব। কর দিব কোথা থেকে?’

‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’—এই মন্তব্য করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা আক্রান্তদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কিছু হাসপাতাল বিভিন্ন কৌশলে অর্থ আদায় করছে। সংক্রমিত রোগ হওয়ায় একই পরিবারের অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণ আয়ের মানুষ করোনা চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। চলতি বাজেটে করোনা আক্রান্তদের কর পরিশোধ থেকে মাফ করা উচিত ছিল। আইন তো মানুষের জন্য!’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, পিআরআই, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়ও করোনা চিকিৎসায় আকাশছোঁয়া খরচের প্রমাণ মিলেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালে ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা করালেও ওষুধ, সিটভাড়া, বিশেষজ্ঞ ফি, স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা খরচ গড়ে দৈনিক সাত হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। কেবিনে এই খরচ দ্বিগুণের বেশি। আইসিইউ খরচ দৈনিক ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। গত বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই প্রথম সারির দুইটি বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যায় ৫০০ জন এবং আইসিইউতে ২০০ জন রোগী  ৫০ কোটি টাকার বেশি বিল দিয়েছে। বিভিন্ন সেবা ও বিশেষজ্ঞদের ফির নাম করে বাড়তি বিল আদায় করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালেও ভর্তি রোগীর ওষুধ কেনা, খাবার জোগাড়সহ অন্যান্য কিছু মিলিয়ে একজন রোগীর জন্য দৈনিক গড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়।

ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক প্রীতি চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার মতো মারণব্যাধি নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে নিজেদের পকেট ভারী করছে। এর মানে এই না যে, সব হাসপাতাল একই কাজ করছে। সরকারের নজরদারি বাড়িয়ে এসব অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’ তিনি এ-ও বলেন, করোনাকালীন প্রণোদনার পরিমাণ ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ৩০ শতাংশ থেকে বাড়াতে হবে। এতে হাসপাতালের সেবার মান বাড়বে।’



সাতদিনের সেরা