kalerkantho

সোমবার । ৫ আশ্বিন ১৪২৮। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১২ সফর ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

একসঙ্গে ভবিষ্যৎ পথরেখা রচনা করতে হবে

জয়ন্ত ঘোষাল   

২৩ আগস্ট, ২০২১ ০৪:৩৮ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



একসঙ্গে ভবিষ্যৎ পথরেখা রচনা করতে হবে

আরবি ভাষায় ‘তালেবান’ শব্দটির অর্থ হলো ‘ছাত্র’ কিন্তু গোয়েন্দা বাহিনীর সরকারি রিপোর্টে ‘তালেবান’ শব্দটির মানে হয়ে দাঁড়াল জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদী। সিআইএ এবং কেজিবির ফাইলে শব্দটার প্রবেশ হলো। এরপর আফগানিস্তানের মাটিতে তালেবানের বিদ্রোহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরূপে দেখা গেছে। আজ ইসলামিক ইমিরেটের প্রত্যাবর্তন হচ্ছে আফগানিস্তানে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে যে তালেবান ২.০ অর্থাৎ এই দ্বিতীয় দফার তালেবান কি প্রথম দফার তালেবান অর্থাৎ ১.০ তালেবানের চেয়ে বেশি শান্তির পথে যাবে? চাইবে একটা সাংবিধানিক আফগানিস্তান গড়ে তুলতে? নাকি আঞ্চলিক অস্থিরতা আরো বাড়বে? অনেকে বলছেন, ‘তালেবান’ ও ‘শান্তি’—এই দুটি হলো সোনার পাথরবাটি। এটা কখনোই হতে পারে না। ভবিষ্যৎই বলবে আফগানিস্তানে তালেবানের ভবিষ্যৎ কী।

কিন্তু এখন আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কী করব? ভারত সরকার জানিয়েছে, আমাদের নীতি ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’। সত্যি কথা বলতে কী, ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ নীতি ছাড়া অন্য নীতি নেওয়ার কি কোনো উপায় আছে? কিন্তু আমেরিকা কেন এমন করল? এর সবটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অপ্রত্যাশিত। আজ যা হচ্ছে আমেরিকার কাছেও কি সেটা সম্পূর্ণ তাদের স্ক্রিপ্টের বাইরে? চীন, রাশিয়া, সর্বোপরি পাকিস্তান যেভাবে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান সরকার গঠনের জন্য উদ্বাহু নৃত্য শুরু করেছিল, এই মুহূর্তে তারাও কি একইভাবে উৎসাহিত? নাকি পাকিস্তান তালেবানকে সম্পূর্ণ মদদ দেওয়ার পরও ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে যে তালেবান সরকারটাই আসল ইসলামিক রাষ্ট্র হয়ে গোটা পৃথিবীর কাছে এই মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি হয়ে উঠবে। আর তখন পাকিস্তানের ওপরই তাদের আঘাত না আসে। অতীতেও কিন্তু তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানি সরকার বা প্রতিষ্ঠানের কখনো প্রেমও হয়েছে আবার কখনো আমেরিকা তথা আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করেছে বলে বহু তালেবান জঙ্গিকে পাকিস্তান জেলে পুরেছে। সুতরাং ‘আফগানিস্তান’ নামের বিষয়টা কিন্তু একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক এবং বেশ জটিল। তালেবান জঙ্গিগোষ্ঠী, তারা তো কোনো জাতি নয়। সুতরাং আফগান জাতীয়তাবাদী যে শক্তি তার মধ্যেও নানা স্তর আছে, নানা জাতপাত আছে এবং তালেবান হলো আফগান জঙ্গি; কিন্তু সব আফগানই তালেবান নয়। আবার আফগান জাতির মধ্যেও পশতুন যেমন আছে, কাজাখ যেমন আছে, সে রকম আরো বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠী আছে। সবাই আবার তালেবানের পক্ষে নয়। যেমন—মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হাজারো অ্যাক্টিভিস্ট ভীষণভাবে তালেবানের বিরুদ্ধে এবং তারা আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে রাস্তায় নেমে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। যেভাবে হিন্দু, শিখ ও অমুসলিম সম্প্রদায়কে ভারতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রশ্ন উঠেছে, হাজারো মুসলিম অ্যাক্টিভিস্ট, যারা তালেবানবিরোধী এবং আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসতে চাইছে, তাদের ক্ষেত্রে তাহলে ভারত কী ভিসা নীতি নেবে?

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি, যিনি আফগানিস্তানে ভারপ্রাপ্ত ছিলেন, তিনি তালেবানের ডেপুটি লিডার মাওলানা আবদুল গনি বারাদারের সঙ্গে দোহায় যখন একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তখন ঠিক হয়েছিল যে আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে এবং জালমে খালিলজাত আমেরিকার পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কথা বলা হয়েছিল। সেই কথাই জো বাইডেন বললেন ২০২১-এর ১৪ এপ্রিল যে আমেরিকা ৯/১১ যে বার্ষিকী হবে তার আগেই নিঃশর্তে সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। আসলে আমেরিকা যেটা ভেবেছিল, এই সময়ে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া ভালো। তার কারণ যে সরকার আফিগানিস্তানে আছে তারা চুরি, দুর্নীতি, নানা কারণে ভয়ংকরভাবে আফগানিস্তানের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। আর অন্যদিকে আমেরিকার মধ্যেও আর্থিক নানা রকমের সমস্যায় সেখানকার মানুষ কিন্তু চাইছে আমেরিকার ইরাক, আফগানিস্তানের মতো বিষয়ে নাক গলানোর দরকারটা কী। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, কাবুলের প্রশাসন যে রকম জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, অন্যদিকে তালেবান শক্তিও আস্তে আস্তে মানুষের সমর্থন পাচ্ছে এবং বিজয় লাভের দিকে আসছে। আমেরিকা ভেবেছিল একটা শান্তিপূর্ণভাবে তালেবান সরকারের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত হবে এবং তারা চলে আসবে। কিন্তু বাইডেনের সরকারের মিস ক্যালকুলেশন হলো, তালেবান ক্ষমতার স্বাদ পেয়েই আমেরিকা সেনার চলে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে এমন একটা ইনডিসেন্টভাবে (Indecent) রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য বিস্ফোরণ ঘটাবে, সেটা আমেরিকার প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। আমেরিকার অনেক ভুল হয়েছে এবং সেই ভুলগুলোর মধ্যে একটা তো বটেই, আমেরিকা কিন্তু আফগানিস্তানে গিয়েছিল কাউন্টার টেররিজমের মিশন (Counter Terrorism Mission) নিয়ে, যুদ্ধ করার জন্য নয়, ২০০১ সালে। তারপর যখন দেখা গেল তালেবান তাদের দমন করতে গিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে এবং ২০০৩ সালের ইরাকের ইস্যুটা এসে যাওয়ায়ও কিছুটা দৃষ্টি ওদিকে চলে গিয়েছিল এবং এই রকম একটা পরিস্থিতিতে কাউন্টার ইনসারজেন্সি যখন সফল হয়নি তখন আমেরিকা আরো বড়ভাবে বড় যুদ্ধের দিকে চলে যায়। কিন্তু আমেরিকা এই যে ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে তা নয়, মূলত এক বছরই তারা কমব্যাট অপারেশন (Combat Operations) চালায় এবং তাতে দেখা যায় যে ২০০১ থেকে ২০১৪—এই সময় দুই হাজার ৩৫২ মার্কিন সেনা মারা গেছে এবং তার পরবর্তী ছয় বছরে মারা গেছে মাত্র ৯৬ জন। বার্ষিক যে খরচ আমেরিকা আফগানিস্তানের জন্য করত, সেটা আমেরিকা অনেক দিন আগেই কমিয়ে দিয়েছিল। তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট যদি ৭০০ বিলিয়ন ডলার হয়, তাহলে সেখানে আফগানিস্তানের জন্য তাদের খরচ ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং আসল কথা কিন্তু আর্থিক লোকসান নয়। আসল কথা হলো, পাকিস্তানে গিয়ে তালেবান যে আশ্রয় পাচ্ছিল বা মদদ পাচ্ছিল সেটা। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, আফগানিস্তানে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা আমেরিকার ওপর চাপ ফেলছিল। তারা চেষ্টা করছিল আফগানিস্তানে তালেবানকে মদদ দিয়ে আমেরিকাকে প্যাঁচে ফেলতে। সেখানে তালেবানের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পথে কিন্তু আমেরিকা যেতে চেয়েছিল এবং সেই কারণেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও তালেবানের সঙ্গে একটি যোগসূত্র তৈরি করেছিলেন। যদিও মতাদর্শগতভাবে মোদির সরকার ভয়ংকরভাবে তালেবান জঙ্গির বিরোধী, ঠিক যেভাবে কাশ্মীরেও জঙ্গিবিরোধী অবস্থান তারা নেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এই তালেবান, যারা এখন ক্ষমতায় এলো, আগামী দিনে তারা কিভাবে এগোবে? একটা কথা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আরো বেশি রক্তক্ষয়ের আশঙ্কা কম, তার কারণ যদি রক্তক্ষয় হতো, তাহলে এর মধ্যেই আরো বেশি হয়ে যেত। আজকের তালেবান সেই অতীতের তালেবান নয় এবং তালেবানের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোল্লা বারাদার এবং তাঁর আত্মীয় মোল্লা মহম্মদ ওমর, তাঁদের একটা সময়ে ২০১০-এ পাকিস্তানের আইএসআই প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে এই অভিযোগে জেলে পুরে দিয়েছিল। আট বছর তাঁরা আইএসআইয়ের জেলখানায় ছিলেন। তারপর তাঁরা সেখান থেকে যে খুব সুখস্মৃতি নিয়ে বেড়িয়েছেন তা নয় এবং দোহায় চুক্তির ফলে আজকে মানুষের কাছে তাঁরা পরিচিত মুখ। কিন্তু এই রকম একটা পরিস্থিতিতে তাঁরা অনেক মারামারি, দাঙ্গা করার পর ক্ষমতায় এসে চেষ্টা করবেন, যাতে জাতিসংঘ তাঁদের অনুমোদন দেয় এবং পৃথিবীর অন্য দেশগুলো তাঁদের সমর্থন জানায়, বৈধতা পায়। সেই কারণে তালেবান মুখপাত্র এরই মধ্যে বলেছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁরা ভালো সম্পর্ক রাখবেন। ভারতের সঙ্গে তাঁরা সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান না। ভারত যে বিনিয়োগ করে আফগানিস্তানে তা যেন চলে না যায়। আড়াই হাজার আফগান ছাত্র-ছাত্রী এই মুহূর্তে ভারতে পড়াশোনা করছে, ভারত তাদের ফেরত পাঠাচ্ছে না, যারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে আসতে চাইছে খ্রিস্টান, শিখ ও হিন্দু—তাদের ভারত আশ্রয় দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যেসব মুসলমান আফগান, যারা তালেবানের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ভারতে আসতে চাইছে তাদের ভিসা দেওয়া হবে কি হবে না? বহু মানুষ এরই মধ্যে ভারতের কাছে ভিসার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই, ভারতের পক্ষে তাড়াহুড়া করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে বলে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। সেটা হচ্ছে যে কাবুলে যে ভারতীয় দূতাবাস রয়েছে সেখানকার প্রত্যেক কর্মীকে ভারতে নিয়ে আসায় এই মুহূর্তে সেখানে আর কোনো দূতাবাস নেই। কিন্তু ভারতীয় অনেকে আটকা পড়েছে। তাদের আনতে গেলে ভারতীয় দূতাবাস না থাকায় আমেরিকার সাহায্য নিয়েই আনতে হচ্ছে। আমেরিকার ভিসা অফিস কারজাই বিমানবন্দরে প্রতিষ্ঠিত এবং মজার ব্যাপার, তালেবান সেই ভিসা অফিসের ওপর কোনো আক্রমণ করছে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতেরও কি উচিত নয় যদি তালেবান সরকার বৈধতা পায়, তাহলে সেই তালেবানের সঙ্গেও একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা? কেননা আজকে তালেবানের সব কিছু ভালো না লাগলেও তাদের সঙ্গে তড়িঘড়ি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললে তারা কি আরো বেশি করে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তানের অক্ষে শামিল হয়ে যাবে না? তাতে কি আমাদের বিপদ বাড়বে, না কমবে? যে ভারত কাবুলের সংসদ বানিয়ে দিয়েছে, যে ভারত কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, সেই ভারত তালেবানের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে যদি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে সেটা কি উচিত কাজ হবে? নাকি জয়শঙ্কর যেভাবে জাতিসংঘে গিয়েও পাকিস্তানের হাক্কানি গোষ্ঠীর সঙ্গে তালেবানের যোগসাজশের কথা উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছেন, সেটাই সঠিক পথ?

তালেবানে যোগ দিতে কিছু বাংলাদেশির আফগানিস্তান যাওয়ার খবর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে উদ্বেগের মনে হলেও পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রধান তেমন ভাবনার কিছু দেখছেন না। আফগান তালেবান অন্য কোনো দেশে তার সংগঠন বিস্তৃত করছে না, তাদের এই বক্তব্যে আস্থা রেখে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে কেউ তাদের দলে যোগ দিতে পেরেছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। গত শতকের সত্তর-আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ করতে যেসব বাংলাদেশি গিয়েছিল, তাদের হাত দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন গড়ে উঠেছিল। হরকাতুল জিহাদসহ জেএমবির নেতাদের সবার আফগান যোগের বিষয়টি পরে প্রকাশ পায়।

সোভিয়েত সেনাদের আফগানিস্তান ছাড়ার পর গৃহযুদ্ধের মধ্যে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখল করে নেয় সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবান। গোঁড়া এই ইসলামী দলটি পাঁচ বছর পর সে দেশে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর অভিযানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়।

২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর আল-কায়েদার শীর্ষনেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েই নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছিল তালেবান। তবে ২০ বছর বাদে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের আফগানিস্তান ছাড়ার শেষ পর্যায়ে এসে আবার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নিল এই গোষ্ঠী।

আসলে এখন তালেবানের সরকারটা কী চরিত্রের হবে, সেটা নিয়েও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। একটা হচ্ছে, প্রচণ্ড কট্টরবাদী তালেবান শক্তির সরকার, যেটা শুধু পাকিস্তান নয়, চীন ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণেও থাকবে, আর একটা হচ্ছে হামিদ কারজাই বা আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর মতো ব্যক্তিত্ব যদি সেই সরকারের মধ্যে থাকে এবং তাদের মিলিয়ে মিশিয়ে একটা সরকার হয়, তাহলে সেখানে ভারতের নিয়ন্ত্রণও কিন্তু অসম্ভব নয়। সুতরাং খুব সাবধানে এখন পা ফেলতে হবে। কেননা এই প্রশ্নটা হিন্দু-মুসলমান নয়, প্রশ্ন কোনো নাগরিকত্ব আইনের ডমেস্টিক ইস্যু নয়, এটা বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা ইস্যু, যেখানে তালেবান এমন একটা শক্তি, যারা একদা ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে লড়াই করেছে, তাদের বিতাড়িত করেছে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে পেরেছে ১৮৪২ সালে। ১৬ হাজার ব্রিটিশ সেনার মধ্যে ১৫ হাজার ৯৯৯ জনকে তারা মেরে দিয়েছিল। সেই তালেবানই কিন্তু আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে রাশিয়ান সেনাদের সঙ্গেও লড়াই করেছে। এখন আমেরিকার যে সেনাবাহিনী তারাও কিন্তু কার্যত পরাস্ত হয়ে ফিরে গেছে। তাহলে এখন শুধু শুধু পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ফৌজের সঙ্গে তালেবান সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করবে এমনটাও নয়। সেই কারণে পাকিস্তানের সেনা ও নেতারা এটা মনে করেন না যে তালেবান একেবারে ‘কাঠপুতলি’র মতো হয়ে থাকবে। অতীতেও তারা সেটা করেনি এবং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছে। তালেবান আন্দোলনের মধ্যে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, এটা তো পাকিস্তানের ভেতরে থেকে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করে। ১৯৮৩ সালে পেশোয়ারের জঙ্গলে মুজাহিদীনের যে নেতারা ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন, তাঁরা বলেছিলেন যে পেশোয়ারের তাঁরা পাঠান এবং তাঁরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী, তাদের কবজা করে রেখেছে বলে তাদের অনেক ক্ষোভ রয়েছে।

সুতরাং ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ যে ডুরান্ড সীমা তৈরি করেছিল, সেই সীমারেখাটাকেই তারা মানেনি এবং আফগান সরকার এখন পর্যন্ত সেটার মান্যতা দেয় না। পাক-আফিগানিস্তান যুদ্ধ তিন-তিনবার হয়েছে এবং সেই ইতিহাসটাও ভারতের ভুলে গেলে চলবে না। সেই জন্য খুব ধীরে, সাবধানে পা ফেলাটা ভারতের প্রয়োজন। তালেবানের শত খারাপ দিক থাকলেও যদি নয়া প্রতিশ্রুতি, নয়া কর্মসূচি নিয়ে সরকার গঠন করে, তাহলে ভারতকে ভাবতে হবে যে যেভাবে কারগিল যুদ্ধের পরও পারভেজ  মোশাররফের সঙ্গে করমর্দন করার কূটনৈতিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল, মিয়ানমারে সেনা সরকার হওয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হয়েছিল, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কৌশলে কি তালেবানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন? আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে অনেক দূরে; কিন্তু ভারতের কাছ থেকে দূরে নয়। সুতরাং আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী হবে সেটা আবেগ দিয়ে নয়, মতাদর্শের চেয়েও বেশি কূটনীতি দিয়ে সমাধান করতে হবে।

সব সমস্যা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। ভারত-বাংলাদেশকে একসঙ্গেই ভবিষ্যৎ পথরেখা রচনা করতে হবে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা