kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

কংগ্রেস নিযুক্ত ‘সিগার’-এর প্রতিবেদন

তালেবানের উত্থান আকস্মিক ছিল না

মেহেদী হাসান    

২৩ আগস্ট, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তালেবানের উত্থান আকস্মিক ছিল না

তালেবানের কাছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল তথা পুরো দেশের পতন মোটেই আকস্মিক ছিল না। বরং বিগত বছরগুলোতে এই পরিণতির দিকেই এগোচ্ছিল আফগানিস্তান। গত সপ্তাহে ‘স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল অন আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশন (সিগার)’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। সিগার যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস নিযুক্ত একটি নজরদারি প্রতিষ্ঠান, যার দায়িত্ব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আফগানিস্তানে পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা। সিগার গত সপ্তাহে তার ১১তম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও জটিলতাগুলো প্রকাশ পেয়েছে।

ওয়াশিংটন ডিসিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রগ্রামের উপপরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমস্যা এবং আফগানিস্তান রাষ্ট্রে চরম অকার্যকর অবস্থার কথা সিগার বহুবছর ধরেই তুলে আনছে।

সিগারের এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান পুনর্গঠনে কত সময় প্রয়োজন ছিল তা কখনো যুক্তরাষ্ট্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত সময়সীমা ও ব্যয়ের জন্য অগ্রাধিকারগুলোর প্রত্যাশাগুলো ছিল অবাস্তব।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার আফগানিস্তান মিশনে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় সঠিক সময়ে কাজে লাগাতে পারেনি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। এটি সামাল দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্যতম কঠিন কাজ ছিল।

সিগারের এবারের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, অব্যাহত নিরাপত্তাহীনতা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আফগানিস্তানে যা করতে চেয়েছিলেন তার সব কিছুর পূর্বশর্ত ছিল সহিংসতার অবসান হওয়া। এর পরও যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছিল। কিন্তু তা হচ্ছিল বিচ্ছিন্নভাবে। আফগানিস্তানে গত দুই দশকের বিভিন্ন সময়ে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার কারণে পোশাকধারী নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অনেক ‘সমস্যাপূর্ণ’ ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।

গত ২০ বছরে আফগানিস্তান পুনর্গঠন চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে কিছু সাফল্যও দেখছে সিগার। এগুলো মূলত মানুষের আয়ু বৃদ্ধি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার হ্রাস, সাক্ষরতা বৃদ্ধি। তবে ২০ বছর সময় ও আফগানিস্তান পুনর্গঠনে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর যা ঘটেছে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শিক্ষা নেওয়ার আছে।

সিগার আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে একদিকে দুর্নীতি দমনের কথা বলেছে। আবার একই সময়ে আফগান অর্থনীতিতে কয়েক শ বিলিয়ন ডলার প্রবেশ করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শাসনব্যবস্থা চালু ও দায়মুক্তির অবসানের চেষ্টার পাশাপাশি নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে দুর্নীতিবাজ বা লুটপাটকারী ক্রীড়ানকদের রক্ষাকবচ হয়েছে।

দোহায় তালেবানের অফিস খোলার নেপথ্যেও ছিল যুক্তরাষ্ট্র : তালেবান আফগানিস্তানের বাইরে কাতারের দোহায় অফিস খোলে ২০১৩ সালে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই তালেবানকে অফিস খোলার অনুমতি দেয় দোহা। এমনকি শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আফগান সরকারও এ বিষয়টি জানত না। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল তালেবানকে উগ্রবাদী বা কট্টরপন্থা থেকে সরিয়ে এনে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এ জন্য আফগানিস্তানে অন্য রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনারও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল দোহায়।

নিজের ও মিত্রদের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি যে শান্তিচুক্তি করেছে তাতে মূলত নিজের ও মিত্রদের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত সেই চুক্তির সারমর্ম অনুযায়ী, সেই চুক্তিতে তালেবান ‘আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাতের’ কথাও উল্লেখ রেখেছে। চুক্তিতে বেশ কবার বলা হয়েছে, “‘আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাত’—যাকে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয় না। তারা তালেবান নামে পরিচিত।’’ ওই চুক্তিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছিল, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বিদেশি সেনা প্রত্যাহার। চুক্তিতে স্পষ্ট বলা ছিল, আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতায় যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না। অন্যদিকে তালেবান ও এর সদস্যরা আল-কায়েদা ও অন্যান্য গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আফগান মাটি ব্যবহার হতে দেবে না। তালেবান ওই গোষ্ঠীকে আফগানিস্তানের পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র ও ভিসা দেবে না।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের আমলে তালেবানের সঙ্গে ওই চুক্তিই তালেবানকে আজকের এই অবস্থানে আসতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিদেশি শক্তি বিদায় নিয়েছে। রাজনৈতিক অনৈক্য, অনিশ্চয়তার সুযোগে ক্ষমতা নিয়েছে তালেবান।

রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে তালেবান : বাংলাদেশসহ বেশির ভাগ দেশ তালেবান সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। সংশ্লিষ্ট সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অন্য দেশগুলো কী করছে, কারা স্বীকৃতি দিচ্ছে, কারা দিচ্ছে না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া এই সুযোগে তালেবান সরকার তথা আফগানিস্তানের কাছে বিভিন্ন প্রত্যাশার কথাও জানানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন, যেদিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছে সেদিনই কার্যত তাদের স্বীকার করে নিয়েছে। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ হচ্ছে। সবাই এক রকম স্বীকার করে নিচ্ছে যে তালেবান আফগানিস্তানের একটি গোষ্ঠী। এ ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন। নিক কার্টার তালেবানদের ওই আফগানিস্তানেরই এক দল ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই তালেবান এখন অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র চায়।



সাতদিনের সেরা