kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি

আওয়ামী লীগের অভিযোগ নিয়ে অস্বস্তি ‘তিন’ জাসদে

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৯ আগস্ট, ২০২১ ০৩:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আওয়ামী লীগের অভিযোগ নিয়ে অস্বস্তি ‘তিন’ জাসদে

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করার পেছনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) দায়ী করে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন। এতে অস্বস্তিতে পড়েছেন বিভক্ত জাসদের নেতারা। ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হিসেবে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছে জাসদের দুটি অংশ। অন্য অংশটি সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয়। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের ওই সমালোচনাকে ভালোভাবে দেখছেন না জাসদের তিনটি অংশের নেতারাই। তাঁরা এই সমালোচনার পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি বুঝে শিগগিরই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

জাসদের তিনটি ধারার সূত্রগুলো কালের কণ্ঠকে জানায়, এত দিন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জাসদের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা জোটসঙ্গী জাসদকে নিয়ে তেমন কোনো সমালোচনামূলক বক্তব্য দেননি। এবার তিনিও জাসদের নাম ধরে সমালোচনা করায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন জাসদ নেতারা। এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই তাঁরা মনে করছেন।

বর্তমানে হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের নেতৃত্বাধীন জাসদ, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ আওয়ামী জোট ১৪ দলের শরিক। আ স ম আব্দুর রব ও আব্দুল মালেক রতনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বর্তমান সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাসদের একজন কেন্দ্রীয় নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বরাবরই নিজের দুর্বলতা, দায়ভার ঢাকার জন্য প্রতিপক্ষের দিকে তীর ছুড়েছে। অতীতেও তারা তা-ই করেছে, এখনো তা-ই করছে।’

গত সোমবার এক আলোচনাসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সেই ৭২ সাল থেকেই কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভক্তি হলো। জাসদ সৃষ্টি হলো। যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর, যারা বড় বড় নেতা ছিল তারা তো অনেকেই পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে পালিয়ে গেছে। যারা এ দেশে ছিল তারা কোথায় গেল? তারা যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। তারা সব গিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির সঙ্গে মিশে গেল। আপনারা আজকে পেছনে (বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড) কে আছে না আছে খুঁজে বেড়াচ্ছেন? বেশি খোঁজার তো দরকার নেই। আপনারা তখনকার পত্রপত্রিকার খবরাখবর একটু খুঁজে বের করেন। অনেক কিছুই আপনাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, যারা পাশে ছিল, যারা এভাবে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছে, সবাই কিন্তু সমানভাবে দোষী। আমি অনেক ঘটনা জানি। আগে শুধু হত্যার বিচার জরুরি ছিল আমি কিন্তু সেটা করেছি। ধীরে ধীরে কারা এর পেছনে জড়িত ছিল সেটাও একদিন বের হবে। সেদিনও বেশি দূরে না।’

এর আগের দিন ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির প্রসঙ্গে এক আলোচনাসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত শক্তির ভেতরে বিভাজন তৈরি করেছিল ওই সিরাজুল আলম খান দাদা ভাইয়েরা। মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ভেতর বিভাজন তৈরি করে জাসদ সৃষ্টি করেছেন, সশস্ত্র গণবাহিনী সৃষ্টি করে সারা দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। একদিকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তখনই বোঝা গেছে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে দেশে।’

আওয়ামী লীগ নেতাদের এই অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেসব মামলা হয়েছে ও বিচারকাজ চলেছে অথবা যাদের ফাঁসি হয়েছে তাদের বক্তব্যে কোথাও কোনো পর্যায়েই কেউ জাসদের নাম নিতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন সময় বক্তব্যে নিজ দলের মোনাফেক, বেইমানদের কথা উল্লেখ করে থাকেন। ফলে এখান থেকে চোখ ভিন্ন দিকে নেওয়ার অবকাশ নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছি নতুন রাষ্ট্র, নীতি ও কৌশলের বিষয়ে। জাসদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও সে সময় দুর্নীতির কথা বলেছেন। আমরা কখনো কোনো ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করিনি।’

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগের অনেকে যুক্ত ছিল। তাদের নেতৃত্বেই ওই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা মূল ধারায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই তাজউদ্দীন আহমদ বা সিরাজুল আলম খানদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যাঁরা পাকিস্তানি ধারায় ছিল তাদের কাছে টেনে নিয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন। আরো অনেকে যাওয়ার জন্য লাইনে ছিলেন। তাঁদেরকে মন্ত্রিসভায় দেখে জনগণ বিভ্রান্ত হয়েছে। এখন এসব দায় জাসদের ওপর কেন চাপানো হচ্ছে আমি জানি না।’

দলটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৭ বছর ক্ষমতায় আছে। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে এ জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ। বঙ্গবন্ধুকে শুধু হত্যা নয়, এ দেশের স্বাধীনতাকেও হত্যা করা হয়েছিল। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরে এসেছি। কিন্তু আজকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডকে যেভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে তার পরিণতি কখনো ভালো হবে না। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডকে রাজনীতিতে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। এটা ঠিক না।’ তিনি মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে কারা দায়ী তা বের করার জন্য একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন হোক। তার আগেই একটা মিডিয়া ট্রায়াল করে ফেলা কাম্য নয়।

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাসদ যদি নেপথ্যে থাকত তাহলে মন্ত্রিসভায় দলের অন্তত একজনকে তো দেখা যেত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রেসিডেন্ট হলেন আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী হলেন সব আওয়ামী লীগের নেতা, আর এখন দায় চাপাচ্ছে জাসদের ওপর। আসলে আওয়ামী লীগের যাঁরা এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা চাইছেন জাসদের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেরা বাঁচতে।’



সাতদিনের সেরা