kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

দিল্লির চিঠি

নতুন বিশ্ব সমীকরণে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশা

জয়ন্ত ঘোষাল   

১৬ আগস্ট, ২০২১ ০৪:৩৮ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নতুন বিশ্ব সমীকরণে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশা

আজিম ইব্রাহিমের ‘দ্য রোহিঙ্গাস ইনসাইড মিয়ানমার’স হিডেন জেনোসাইড’ বইটা পড়ছিলাম। আজিম ইব্রাহিম একজন সুলেখক শুধু নন, তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একজন রিসার্চ ফেলো, যেটি হার্ভার্ডের ‘কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট’ পরিচালনা করে। তিনি মিয়ানমারে গিয়ে, বাংলাদেশে গিয়ে এবং ভারতেও রোহিঙ্গাদের সমস্যা—এই পুরো বিষয়টা নিয়ে একটা বিশ্লেষণধর্মী বই লিখেছেন।

আজিম ইব্রাহিম এই বইয়ে দেখিয়েছেন, ১৯৪৮ সালে কী রকম ‘রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি’ হয়েছিল, যখন মিয়ানমার, স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। গবেষণার ভিত্তিতে তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে যে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর একটি সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে রোহিঙ্গারা কখনো সেভাবে সমর্থন পায়নি, বরং তারা সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। রোহিঙ্গা নামের একটি ক্ষুদ্র মুসলিম গোষ্ঠী, যারা পশ্চিম মিয়ানমারে রাখাইনে বসবাস করে এসেছে।

যেহেতু মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বৌদ্ধ, সেহেতু এই রোহিঙ্গারা বৌদ্ধ রাখাইন গোষ্ঠীর হাতে নানাভাবে নির্যাতিত হয়। মানবাধিকার সংগঠন মিয়ানমার সরকারের কাছে বারবার এ ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছে। ২০১২ সালে পরিস্থিতি যখন চরমে ওঠে, তখন প্রবল হিংসা শুরু হয় এবং বৌদ্ধ রাখাইন গোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসতে শুরু করে।

সুতরাং রোহিঙ্গারা হলো অন্যতম ‘ন্যাশনাল রেস’, যারা মিয়ানমারের জনসংখ্যার মধ্যেই বিকশিত হয়েছে, তারা সেখানে বড় হয়েছে, তাদের সন্তানরা অনেকে জীবিকা ধারণ করেছে। কিন্তু নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাদের প্রতি অবহেলা হয়েছে। যে দেশে তারা জন্মেছে, সেই দেশ কিন্তু তাদের প্রতি অবহেলা জাগিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, চাকরি, আইনি সুরক্ষা—কার্যত তারা কিছুই পায়নি। উপরন্তু নানাভাবে তারা সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হয়েছে।

এই বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, এই রোহিঙ্গা সমস্যা আজ বাংলাদেশের কাছে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে ঢুকতে চাইলেও ভারত সরকারিভাবে একটা নীতি নিয়েছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ভেতরে ঢুকতে দেবে না। দরকার হলে তাদের পুশব্যাক করা হবে। তাদের কোনোভাবেই ভারতে থাকতে দেবে না।

এমনিতেই বাংলাদেশ নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। তার ওপর আবার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে গিয়ে নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। রোহিঙ্গাদের সমস্যা কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে আরো অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। যে সময় বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, আর্থিক বিকাশের চেষ্টা করছে এবং গোটা দুনিয়ার নজর কেড়েছে, সেই সময় এ ধরনের সমস্যা। এই করোনাকালে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, ভারত যেমন নষ্ট করতে চায় না, তেমনি বাংলাদেশকেও যে ভারতের অনেক বেশি প্রয়োজন, সে কথাও এই বই থেকেই জানা যাচ্ছে।

কাজেই ভারত মনেপ্রাণে চায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার একটা সমাধান সম্ভব হয়!

এই বইয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আর একটা গুরুত্বপূর্ণ খবরে আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেমন—নিরাপত্তা পরিষদে ভারত এখন দুই বছরের জন্য প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমুদ্রপথে যে সমস্যাগুলো আসছে, সেগুলো নিয়ে এই নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি হিসেবে একটা জরুরি বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকের পর নানা স্তরে রীতিমতো আলোচনাও শুরু হয়েছে যে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি হিসেবে এই অস্থায়ী দায়িত্বটা পেয়ে ভারত ঠিক কী ভূমিকা পালন করবে? হঠাৎ কী শুধু সমুদ্রপথে সন্ত্রাস মোকাবেলা ও সমুদ্রপথে যে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকবে, নাকি এই অঞ্চলের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন কাণ্ডারি হিসেবে ভারত এগিয়ে আসবে?

ভারত যদি এই অঞ্চলের কাণ্ডারি হয়, তাহলে বাংলাদেশের কূটনীতিতে তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়। সেই প্রভাবের মধ্যে যেমন সন্ত্রাস দমন এবং করোনা পরিস্থিতিতে একটা ঐক্য গড়ে তোলা, সেগুলো যেমন একটা দিক, তার পাশাপাশি এই রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে ভারত এত দিন শুধু ভারতের ভূমিকায় ছিল, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তাদের ভাবতে হয়েছে। আবার মিয়ানমারের সঙ্গেও ভারত সম্পর্ক খারাপ করতে চায়নি। তার কারণ, মিয়ানমারও কিন্তু ভারতের উঠোন।

সুতরাং প্রতিবেশী রাষ্ট্র সম্পর্কেও ভারতের একটি ঘোষিত নীতি আছে। ভারত এবার যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন কিন্তু শুধু নিজের সার্বভৌম স্বার্থ নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে যাতে শান্তিপূর্ণভাবে জটিলতা দূর করা সম্ভব হয় এবং আলোচনার পরিস্থিতি গড়ে তোলা যায়, সেই ব্যাপারে ভারত বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। আমিও মনে করি, ভারতের উৎসাহ আছে। কাজেই ভারত যদি চারদিক দিয়ে তার সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পায়, তাহলে ভারত এ ব্যাপারে আরো অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।

প্রাথমিকভাবে মিয়ানমার কতটা রাজি হবে, তা আমি জানি না। কিন্তু মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা ছাড়া অন্য কোনো পথে এ সমস্যার সমাধান হওয়া খুব কঠিন। ভারতই সেখানে একটা অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।

প্রথমবারের মতো কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার আলোচ্যসূচির আওতায় এই প্রথমবারের মতো সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলো। নিরাপত্তা পরিষদ অতীতে জলদস্যুতা এবং সমুদ্রে সশস্ত্র ডাকাতি সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেও এ ধরনের সামগ্রিক আলোচনা এটিই প্রথম।

পরিশেষে ভারতের আহ্বানে আয়োজিত এই আলোচনা উপলক্ষে নিরাপত্তা পরিষদ সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত একটি সভাপতির বিবৃতি গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত সভাপতির বিবৃতি এটিই প্রথম। পরিষদের সদস্য ১৫টি রাষ্ট্রের সবাই সর্বসম্মতভাবে তা অনুমোদন করে। ওই বিবৃতি ২৬/১১ মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার মতো সন্ত্রাসীদের সমুদ্র ব্যবহারের বিষয়টি নজরে এনেছে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর অনুশীলন ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। উপরন্তু এটি সমুদ্রে আন্তর্দেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্রমাগত সমস্যা আমলে নিয়েছে। ওই বিবৃতিতে মহাসাগরের বৈধ ব্যবহার, সমুদ্রযাত্রী ও উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ওই আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর উচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ ছিল। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান পর্যায়ের চারজন এবং মন্ত্রী পর্যায়ের ১০ জনের উপস্থিতি ছিল। এটি ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থানের পাশাপাশি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বৈশ্বিক মর্যাদাকে প্রতিফলিত করে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর মন্তব্যে সমুদ্র নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে পাঁচটি নীতি প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে ছিল বৈধ সামুদ্রিক বাণিজ্যের বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তা; সমুদ্রসীমা বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমাধান করা; যৌথভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সমুদ্রে অরাষ্ট্রীয় ক্রীড়নকদের হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করা; সামুদ্রিক পরিবেশ ও সম্পদ সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল সামুদ্রিক কানেকটিভিটিকে উৎসাহিত করা।

এই পাঁচটি নীতি হলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে ভারত ঘোষিত অবস্থানের একটি স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী প্রথম সাগর বা ‘এ অঞ্চলে সবার জন্য নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি’ ধারণাটি প্রকাশ করেছিলেন। এরপর ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরের সাংগ্রি-লা সংলাপে তিনি তাঁর বক্তৃতায় ভারতের ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রূপকল্পের রূপরেখা দিয়েছেন। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ব্যাংককে ইস্ট এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগরীয় উদ্যোগ’ চালু করেন। সেখানে তিনি সমুদ্র অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সাতটি ভিত্তি প্রস্তাব দেন।

সব শেষে একটা কথা বলা দরকার যে ইরাকে যখন আমেরিকা অভিযান শুরু করেছিল, সেই ইরাক অভিযানের প্রতি যে ভারতের পূর্ণ সমর্থন ছিল তা নয়। ইরাকের সঙ্গে ওই রকম দুশমনি চায়নি ভারত, যেটা আমেরিকা করেছিল। ভারত আমেরিকাকে নিষেধ করেছিল, আমেরিকার সঙ্গে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল এবং যথেষ্ট সবাক হয়েছিল। এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পেশ করেছিল এবং ইরাকের সঙ্গে কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করেনি!

সেই একই যুক্তি দিয়ে এখন বলা যায়, মিয়ানমার যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে ভারত খুশি না-ও হতে পারে; কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়াটাও কূটনৈতিক বুদ্ধির পরিচয় বলে ভারত মনে করে না। সে কারণে সমস্যার সমাধান করার জন্য ভারত নানাভাবে চেষ্টা করেছে। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবং তাঁর পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা, তাঁরা কিন্তু বাংলাদেশে গিয়েও একবার বলেছিলেন একটা সেফ প্যাসেজ গড়ে তোলার কথা, যাতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। মিয়ানমার এখন পর্যন্ত তাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেয়নি।

এবার কিন্তু ভারতের নেতৃত্বাধীন নতুন বিশ্ব সমীকরণে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে, যখন চীন ও পাকিস্তানে একটা শক্তিশালী অক্ষ তৈরি হচ্ছে। আফগানিস্তানে সেনা প্রত্যাহারের পর যেভাবে তালেবান সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়ছে; যেভাবে রাশিয়া চীন ও পাকিস্তানের অক্ষে, পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে, যেভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে শুধু কভিড প্রতিষেধকের জন্য নয়, নানা কূটনৈতিকভাবেও চীন বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করছে, তখন এই টানাপড়েনের মধ্যে ভারতের এই নতুন নেতৃত্ব দেওয়া পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে অন্তত একটা চেষ্টার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে বলে আশা করা যায়।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা