kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ১৫ আগস্ট

‘একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো’

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৫ আগস্ট, ২০২১ ০৩:২৬ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো’

আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার শোকাবহ খবরটি বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রগুলো তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গুরুত্বের সঙ্গে পরিবেশন করে। অসম্পূর্ণ ও ভুল তথ্যও প্রকাশিত হয়। এতে তথ্যপ্রাপ্তির ঘাটতিও লক্ষ করা যায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আর কারা নিহত হয়েছেন—এ তথ্য ঘটনার দুই দিন পরও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশর নাম পরিবর্তিত হয়ে ইসলামিক রিপাবলিক হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।  অবশ্য ১৮ আগস্টের পর তথ্য বিভ্রান্তি কিছুটা দূর হয়।

যেহেতু ১৫ আগস্ট ভোররাতে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটে, সেহেতু ১৫ আগস্টের পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশের সুযোগ ছিল না। প্রতিবেশী ভারতের স্বাধীনতা দিবস ছিল ১৫ আগস্ট, সে কারণে ১৬ আগস্ট দেশটির সংবাদপত্রগুলো প্রকাশিত হয়নি। ১৭ আগস্ট সর্বপ্রথম দেশটির প্রভাবশালী সংবাদপত্রগুলোতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড উঠে আসে হতাশার সংবাদ হিসেবে। তবে এর আগে ভারতীয় বেতার ‘আকাশ বাণী’ ১৬ আগস্ট তাদের সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বলে, ‘যিশু মারা গেছেন। এখন লাখ লাখ লোক ক্রুশ ধারণ করে তাঁকে স্মরণ করছেন। মূলত একদিন মুজিবই হবেন যিশুর মতো।’

১৭ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধান সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘পূর্ণ মর্যাদায় মুজিব স্বগ্রামে সমাহিত/নতুন বাংলাদেশ সরকারের নীতি সম্প্রীতি : রাষ্ট্রপতি খন্দকার/বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে ভারত শোকাহত’। এতে উল্লেখ ছিল, ‘সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃতদেহ শনিবার স্বগ্রাম ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পূর্ণ মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।’

আনন্দবাজার ‘প্রথম খবর দিল কে?’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রথম বিশ্ববাসীকে জানায় ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। এরপর সকাল ৮টায় প্রথম খবর দেয় রেডিও বাংলাদেশ। এরপর পিটিআইয়ের ঢাকা ব্যুরো রেডিও বাংলাদেশের উদ্ধৃতি দিয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার করে।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে ভারত শোকাহত—এ তথ্য ১৭ আগস্ট ভারতের বেশির ভাগ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। ভারতের বিদেশ দপ্তরের একজন মুখপাত্রের বরাতে তথ্যটি প্রকাশিত হয়।

আনন্দবাজারে ‘বেগম মুজিব নিহত’ শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক মহলের অসমর্থিত খবর হিসেবে রয়টার্সের বরাতে। এতে  বলা হয়,  বেগম মুজিব ছাড়াও তাঁর পরিবারের অনেকে এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন। পাক বেতারের বরাতে আরেকটি সংবাদে বলা হয়, মনসুর আলী নিহত এবং শেখ মুজিবের দুই ভাগ্নে শেখ মনি ও শেখ শহীদুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া কামাল হোসেন ও নজরুল ইসলামকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সংবাদ জানানো হয়। ‘শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে ভাসানী খুশি’—এমন সংবাদ প্রথম পাতায় প্রকাশ করা হয়।

১৭ আগস্ট টাইমস অব ইন্ডিয়ার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিবরণ, সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিস্থিতি, নতুন মন্ত্রিসভা, বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া—এসবসহ  প্রায় ১৬টি পৃথক প্রতিবেদন। একটি প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) বরাতে বলা হয়, গ্রণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশর নাম পরিবর্তিত হয়ে ইসলামিক রিপাবলিক হয়েছে। 

টাইমস অব ইন্ডিয়ার ১৭ আগস্টের সংখ্যায় বড় অংশ জুড়ে ছিল বৃহৎ শক্তিগুলো ঘটনাটিকে কিভাবে দেখছে তার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা। এতে ‘ইউএস ওয়াচিং ইভেন্টস’, ‘সোভিয়েত মিডিয়া রিপোর্ট ক্যু উইদাউট কমেন্ট’ শিরোনামে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার চেষ্টা হয়। ‘রি-অ্যাকশন অব ভেরিয়াস কান্ট্রিস’ শিরোনামে  জাপান, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এ ছাড়া ‘ফরেন রি-অ্যাকশন’ শিরোনামে জানানো হয় মিসর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া। 

পত্রিকাটিতে ‘ফাদার অব সোনার বাংলা’ শিরোনামে করা সম্পাদকীয়তে বঙ্গবন্ধুর জীবন, রাজনীতিতে উত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা তুলে ধরা হয়।

১৭ আগস্ট ইকোনমিক টাইমস শিরোনাম করে ‘ইন্ডিয়া শকড অ্যাট মুজিবস ডেথ’।  এই সংবাদপত্রেও বাংলাদেশের ইসলামিক রিপাবলিকে পরিণত হওয়ার কথা বলা হয়। অন্য ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর মতো ইকোনমিক টাইমসও দিতে পারেনি ১৫ আগস্ট কাদের হত্যা করা হয়েছে সেই তালিকা। উল্টো ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সপরিবারে নিহত হওয়ার ভুল তথ্য জানানো হয়।

স্টেটসম্যান এদিন তাদের মূল শিরোনাম করে ‘ইন্ডিয়া কিপিং ওয়াচ অন ইভেন্ট ইন বাংলাদেশ গ্রিফ ওভার মুজিব ট্র্যাজিক ডেথ’। স্টেটসম্যান বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে তাঁর জীবনী ছাপে।

১৭ আগস্ট ভারতের দৈনিক যুগান্তর শিরোনাম করে ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থান : মুজিব ও মনসুর আলী নিহত, সামরিক আইন জারি’। অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর দুই ভাগ্নেও নিহত হন জানিয়ে এতে বলা হয়, প্রাথমিক অবস্থায় যেসব টুকরো খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে জানা যায় যে পশ্চিমা সমর্থক রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর লোকেরা এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। শেখ মুজিবের ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার যাঁরা ঘোরবিরোধী ছিলেন, খন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁদেরই একজন। একটি আলাদা বক্স করে ‘ভারত মর্মাহত’ সংবাদটি ছাপানো হয়। যুগান্তর ১৮ আগস্ট ছাপে ‘মনসুর আলী জীবিত’।

যুগান্তরে ঢাকা ডেটলাইনে আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল : ‘চিলির আসল খলনায়ক এখন ঢাকায়’। এতে  বলা হয়, চিলিতে আয়েন্দের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর পটভূমি তৈরির সময় (১৯৭৩) বোস্টার ছিলেন সেখানকার মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স। পরে এর প্রতিবাদও ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শোকবার্তাটি সে দেশের সংবাদপত্রে ছাপা হয় ১৯ আগস্ট।

বঙ্গবন্ধু হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কে ১৬ আগস্ট লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রফে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’

১৫ আগস্ট মার্কিন সংবাদ চ্যানেল এবিসি নিউজে ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থান’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে সংঘটিত ক্যুতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাড়িতে নিহত হয়েছেন। সেই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন এবং তিনি দেশের নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে পাল্টে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রেখেছেন।

মার্কিন আরেক সংবাদ চ্যানেল এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতির পিতা ও স্বাধীনতা লাভের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক মিলিটারি ক্যুতে তাঁর দেহরক্ষীদের দ্বারা নিহত হয়েছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি হয়েছেন খন্দকার মোশতাক আহমদ, যিনি ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে মুজিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কট্টর বিরোধী ছিলেন। তিনি দেশের নাম পাল্টে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রেখেছেন।

কানাডার সিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়, এক আকস্মিক ক্যুতে বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছেন। তাঁর অন্তত ২০০ অনুসারীও নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। দেশে সেনা শাসন ও কারফিউ জারি করা হয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিহত হলেন তাঁর নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে। অথচ তাঁকে হত্যা করতে পাকিস্তানিরা পর্যন্ত সংকোচ বোধ করেছে।

১৬ আগস্ট ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সেনা সমর্থিত সরকার মধ্যরাতে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেছে। মনে করা হচ্ছে, সরকারটি ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষের। ক্ষমতাচ্যুতির ওই বিদ্রোহ দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের জনক বামপন্থী রাষ্ট্রপতি মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পত্রিকা ইজভেস্তিয়া ভেতরের পাতায় বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর ছাপে। তবে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদার খবরে বলা হয়, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিকূল শক্তি হয়তো দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপর প্রভাব ফেলবে। ২২ আগস্ট প্রাভদার এক নিবন্ধে ১৫ আগস্টের ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়। প্রাভদায় ‘পর্যবেক্ষক’ ছদ্মনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যাকারী ‘কসাইদের’ বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ‘বৈধ আক্রোশ’ ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর বিয়োগান্ত ঘটনায় সোভিয়েত জনগণ তীব্র শোক প্রকাশ করছে।

করাচি ও লাহোরের পত্রপত্রিকাগুলো বিশেষ বুলেটিন বের করে। রেডিও পাকিস্তানের সকাল ৮টার খবরে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ ৫০ হাজার টন চাল এবং ১০ মিলিয়ন গজ সুতা উপহার দেয়। পাশাপাশি ওআইসি এবং অন্য মুসলিম দেশগুলোকে পাকিস্তান আহবান জানায়, যেন তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

১৮ আগস্ট পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক ‘জং’-এর সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো হয়। সেখানে মোশতাক সরকারকে বঙ্গবন্ধুর আমলে সম্পর্কের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে দ্রুত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়।

শ্রীলঙ্কার সংবাদপত্র ‘আথাথা’র সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের ঘটনাবলিকে ‘নিষ্ঠুর ও অমানবিক হত্যাযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়—‘মুজিব উত্খাতের ঘটনায় মার্কিন পিএল ৪৮০ তহবিল অর্থায়ন করে’। এ ছাড়া বলা হয়, ‘বাংলাদেশের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করা এবং এখানকার সরকার উত্খাতের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’



সাতদিনের সেরা