kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

মৃত্যুহীন অমরত্ব লাভের দিন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী   

১৫ আগস্ট, ২০২১ ০২:৩২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মৃত্যুহীন অমরত্ব লাভের দিন

ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা থাকাকালে ক্লিমেন্ট এটনি তাঁর বিপক্ষ দল কনজারভেটিভ পার্টির তৎকালীন নেতা উইনস্টন চার্চিলের এক জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে এসে বলেছিলেন, ‘আমি সিজারকে হত্যা করতে আসিনি। তাঁকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে এসেছি।’ চার্চিল ছিলেন ঝানু সাম্রাজ্যবাদী নেতা। তাঁর রাজনীতির কঠোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রী এটনি তাঁকে জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে তুলনা করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

ভারতে হিন্দু মহাসভায় নাথুরাম গডসে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। এই হিন্দু মহাসভা থেকে বিজেপির উৎপত্তি। এই বিজেপি এখন ভারতে ক্ষমতায়। অনেকের আশঙ্কা ছিল, হিন্দুত্ববাদী সাভারকরকে এনে তারা মহাত্মা গান্ধীর বদলে জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠাদানের চেষ্টা করবে। তারা তা করেনি। বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি—কেউ তা করেননি। বরং তাঁরা মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতার সম্মান প্রদর্শন করেছেন। মোদি তো সরকারিভাবে গান্ধীর জন্মদিন সাড়ম্বরে পালন করেছেন এবং কংগ্রেস নেতা প্রয়াত সর্দার প্যাটেলের বিশাল উঁচু এক ভাস্কর্য স্থাপন করেছেন  আহমেদাবাদে।

ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশের বিশ্বস্বীকৃত স্থপতি, বিশ শতকে ইতিহাস সৃষ্টিকারী নেতা এবং জাতির পিতার জনকের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে শেখেনি। বরং এই মহানায়কের আসনে এক খুনি খলনায়ককে বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। আজ ১৫ই আগস্ট। আজ দেশ-বিদেশের মানুষ টুঙ্গিপাড়ায় জড়ো হয়েছে বাংলাদেশের বাঙালির পিতা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু বিএনপির কোনো নেতা-উপনেতাকে তাঁর সমাধিতে ফুল দিতে দেখা যাবে না। জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো দূরের কথা, এই দিনটিকে অবমাননা করার জন্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাঁর জন্মদিন ঘোষণা করে এই মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠার জন্য ঘটা করে উৎসব করতেন। জনগণের ঘৃণা ও প্রতিবাদের মুখে খালেদা জিয়া এখন আর এই দিনে উৎসব করেন না। শুধু একটা কেক কেটে ভুয়া জন্মদিন পালন করেন। অন্যদিকে বিশ্বময় এবার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মুজিববর্ষ পালিত হয়েছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের নায়করা বিশ শতকের ইতিহাসের এক মহান নায়কের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘ইতিহাসের যারা বিরোধিতা করে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; কিন্তু ইতিহাস থাকে।’ কথাটা প্রমাণিত সত্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছিল এবং সেই যুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতে চেয়েছিল তারা আজ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার ইতিহাস আজ সত্যের আভায় উদ্ভাসিত। এই ইতিহাসে মুজিব মানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে মুজিব।

ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ মার্কিন চক্রান্তে নিহত ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বঙ্গবন্ধুকে একটি সোনার হরফে লেখা কোরান শরিফ উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম নিলে তিনি সারা আরব বিশ্বের নেতা হতেন।’ কলকাতার বিখ্যাত বামপন্থী সাপ্তাহিক কম্পাসের সম্পাদক বলেছেন, ‘শেখ মুজিবের মধ্যে আমরা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা এবং সুভাষ চন্দ্রের সংগ্রামী নেতৃত্বের সমন্বয় দেখেছি।’ ইতিহাসের এই মহানায়ককে নানাজন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। সব বিচারেরই এক কথা—‘মুজিব ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, ইতিহাস মুজিবকে সৃষ্টি করেছে।’

গান্ধীবাদ, মাওবাদ ও মুজিববাদ—এই তিনটি মতাদর্শ বিশ শতকের এশিয়াকে প্রভাবিত করেছে। গান্ধীর ‘রামরাজ’ গরিব ও অচ্ছুত শ্রেণির মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি। তিনি অচ্ছুত ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের পিঠে হরিজন ছাপ মেরে সমাজের নিচুতলায় তাদের অবস্থান স্থায়ী করে দিয়েছেন। মাও জেদংয়ের মাওবাদকে মার্ক্সবাদের এশীয় ভার্সন বলা হতো। এই মতবাদ মাও বেঁচে থাকতেই দেশে দেশে, বিশেষ করে উপমহাদেশে টেররিজম হিসেবে দেখা দিয়েছে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই মাওবাদীরা ভারতে ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর যে দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তার নাম শোষিতের গণতন্ত্র। তিনি বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও বুর্জোয়া অর্থনীতি অনুসরণ করতে চাননি। চেয়েছিলেন এমন দেশ গড়তে, যেখানে নব্য ধনীদের উত্থান ও শোষণ সম্ভব হবে না। কলোনিয়াল আমলে জন্ম এবং কলোনিয়াল মনোভাব দ্বারা চালিত আমলা শাসন থাকবে না। সেই ক্ষমতা থাকবে জনপ্রতিনিধিদের হাতে। জনজীবনে অর্থনীতির ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য প্রাথমিকভাবে মিশ্র অর্থনীতি অনুসরণ করা হলেও তার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল সমাজতন্ত্র। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের দুটি মূল শক্ত খুঁটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তা ও অর্থনৈতিক সমতা।

বঙ্গবন্ধু পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলতেন, পুঁজিবাদী পথে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এই উন্নয়নের বারো আনা যায় আমলা ও ঠিকাদারদের পকেটে। বাকি চার আনা দিয়ে যে উন্নয়ন হয় তা টেকসই হয় না। আইয়ুবের আমলে কোটি কোটি টাকা উন্নয়নের জন্য ঢালা হয়েছে। সেই উন্নয়ন কোথায় গেছে? সেই টাকা গেছে সিও-ডেভ এবং মৌলিক গণতন্ত্রীদের পকেটে। অর্থনৈতিক সমতা না থাকলে উন্নয়ন অর্থহীন।

বঙ্গবন্ধুর শোষিতের গণতন্ত্রের দর্শন যদি সারা এশিয়ায় প্রচারিত হতে পারত তাহলে আজ এক নতুন এশিয়া জেগে উঠত। তা হয়নি। তাঁকে হত্যা করে তাঁর দর্শন ও আদর্শকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তা সম্ভব হয়নি। মৃত মুজিব আজ জীবিত মুজিবের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে জেগে উঠেছেন। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা আজ তাঁর পিতার দর্শন ও আদর্শ রক্ষার পাহারাদার। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পথেই তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে আছেন। আমার বিশ্বাস, এই গণতন্ত্রকে দশানন শত্রুদের হামলা থেকে বাঁচাতে পারলে নিশ্চিতভাবেই বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শ তিনি বুকে লালন করছেন তা বাস্তবায়নের জন্য অগ্রসর হবেন। জাতির পিতার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত হবে তাঁর কণ্ঠে। সারা বিশ্বে আজ অস্থিরতা বিরাজ করছে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ আজ ভয়ানকভাবে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যেও জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে তার জনককে। তাঁর সাহস ও প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ হানাদার কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুই যেন নেতৃত্ব দিচ্ছেন এ লড়াইয়ে সমাধি থেকে উঠে এসে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি,  তুমি মৃত্যুহীন। ঘাতকের গুলি তোমাকে হত্যা করতে পারেনি।

লন্ডন, বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট ২০২১



সাতদিনের সেরা