kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

আমাদের সবার কাছেই এখন অনেক মৃত্যুসংবাদ

মোস্তফা মামুন   

১২ আগস্ট, ২০২১ ০৪:২৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমাদের সবার কাছেই এখন অনেক মৃত্যুসংবাদ

মৃত্যু বিষয়টা আসলে কী? এ এমন একটা প্রশ্ন, যার উত্তর পৃথিবীর মানুষ সবচেয়ে বেশি করে জানতে চায় এবং জানতে পারে না।

এ নিয়ে বইয়ে-বিজ্ঞানে-দর্শনে বহু কথা লেখা হয়েছে। বহু গবেষণা। নিজের একটা ব্যক্তিগত ভাবনার কথা বলি। আমাদের এক সিনিয়র সাংবাদিক একবার বললেন, ‘মৃত্যু আসলে ফানি একটা বিষয়।’

এ রকম রসিকতা বন্ধুদের আড্ডায় অনেকে বলে; কিন্তু তিনি কোনো আড্ডায় নয়, বলছিলেন মাইকের সামনে। তা-ও কী, একটা স্মরণসভায়। একজন সতীর্থ মারা গেছেন, সে উপলক্ষে এক দিন পরই সংবাদকক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি কথাটা ঘোষণার স্বরে বললেন।

সবাই চমকিত। তবে কোনো পাল্টা কথা নয়, কারণ একে তিনি পদে অনেক ওপরে, তার ওপর বিজ্ঞ মানুষ বলে গণ্য। কিন্তু তিনি কোনো সিরিয়াস দার্শনিকতায় না গিয়ে বললেন, ‘দেখুন, কিছুদিন আগে আমার বড় রকমের স্ট্রোক হলো, সিভিয়ার স্ট্রোক। আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম, শেষ। আমার ঘনিষ্ঠদেরও তাই মনে হয়েছিল। অথচ আমি এখন দিব্যি অফিস করছি। আর যে মানুষটা সেই সময় আমাকে দেখতে গিয়েছিল, হয়তো ভেবেছিল, আমি মরে যাচ্ছি, সে আজ মারা গেল। এটা ফান না!’

তাঁর স্ট্রোকের খবর ঠিক, মারা যাওয়ার সম্ভাবনা এত বাস্তবসম্মত ছিল এবং সেই তুলনায় যিনি মারা গেছেন তাঁরটা এমন দূরের ভাবনা ছিল আমাদের কাছে মনে হলো, এভাবে দেখলে তো মৃত্যু আসলে ফানি বিষয়ই। সহজভাবে মেনে নেওয়ারই ব্যাপার।

তখন সহজভাবে নেওয়া ছিল দার্শনিক বোধ থেকে। অন্যদের সান্ত্বনা দিতে। আর এখন সহজভাবে নিতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। উপায় তো নেই। এই শুনছি একজন মারা গেছে, একটু পর আরেকজন প্রিয় কেউ। দেখে দেখে নিজের জন্য ভয় হওয়ার কথা। কিন্তু আসলে সেই সময়টাও খুব মিলছে না। কাতর হওয়ার বদলে পাথর হওয়ার দশা।

সেদিন দুঃখভরে লিখেছিলাম, আজ যে অন্যের মৃত্যু সংবাদ দিচ্ছে, কাল সে নিজেই চলে যাচ্ছে। নিজের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়ের ক্ষেত্রেই ঘটনাটা ঘটল। আগের দিন আরেকজনের মারা যাওয়ার খবর দিয়েছিল, এক দিন পেরোতে নিজেই নেই। আরেক পরিচিত, হাসপাতালে গিয়ে মজা করে লিখল—‘বেড়াতে এসেছি, ভাবলাম অক্সিজেনও খেয়ে যাই।’ ‘অক্সিজেন খাওয়া’ আর শেষ হলো না। মারা গেল তিন-চার দিন পর। আগে এ রকম ঘটনা বছরে-দুই বছরে একবার ঘটত। সেটা মুখে মুখে ফিরত বেদনার ছবি হয়ে; কিন্তু এখন এত বেদনার ছবি নিজের কাছেই যে অন্যের খবর আর খুব বেশি বহনের শক্তি নেই।

ভয়ংকর একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে নিজেকেই। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমার শ্বশুর মারা গেলেন। সেই সময়ে শাশুড়িও পজিটিভ। বাবাকে দেখতে তাঁদের বড় মেয়ে সুদূর আমেরিকা থেকে চলে এসেছে; কিন্তু দেখার সুযোগ নেই। পিপিই-মাস্ক পরে, আইসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে একনজর দেখাই সান্ত্বনা এবং সেখানেই নিষ্ঠুরতার শেষ নয়। শ্বশুর মারা গেলেন, তাঁর মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হলো; কিন্তু মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নারও সুযোগ নেই সন্তানের। দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল এটাই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার নৃশংসতম ছবি। এক বছরের ব্যবধানে আর সেটা মনে হয় না। এখানে তবু সবাই একসঙ্গে দেখতে পেরেছে। অনেক ক্ষেত্রে তা-ও হচ্ছে না। আমাদের এক সাংবাদিক পরিবারেই গল্প এমন যে মা-বাবা দুজনই দুই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে। ছেলে-মেয়েরা পালা করে দুই হাসপাতালে ঘুরছে। একজন মারা গেলেন। তাঁর দাফনে সবাই যেতে পারল না। অন্যজনকে দেখতে হবে যে! একজনের শেষ শয্যা হচ্ছে, তাঁর চিরসঙ্গী সেটা জানেনই না। পরে অন্যজনও মারা গেলেন। দুটো মানুষ তারুণ্যে একাকার হয়েছে, পুরো জীবন কাটিয়েছে, কত স্বপ্ন দেখেছে মিলিতভাবে, সন্তানদের জন্ম দিয়ে পৃথিবীতে ছাপ রেখেছে; কিন্তু বিদায়ের সময় কী বিচ্ছিন্নতা। কেমন বীভৎসতা! করোনা দুঃখের অতল দেখিয়ে আমাদের বোধ আর সহ্যক্ষমতাকেই অন্য জায়গায় নিয়ে গেল। করোনা না এলে জানতামই না, আমাদের পৃথিবী এত দুঃখের জায়গা। বুঝতামই না, এত কষ্ট একজন মানুষের পক্ষে পাওয়া সম্ভব। করোনা-উত্তর পৃথিবী অনেকভাবেই বদলাবে। সবচেয়ে বেশি সম্ভবত বদলাবে মানুষের জীবনবোধ। মৃত্যুচিন্তা। জীবনের শক্তিকে এর আগে এমন তুচ্ছ করতে পারেনি কোনো শক্তি।

মৃত্যু আসলে একভাবে দেখলে জীবনের সবচেয়ে বড় ভারসাম্যও। বয়স হলে পৃথিবী ভ্রমণ শেষে মানুষ বিদায় নেবে, ছোটরা বড় হবে, তাদের জায়গা নেবে—এই চক্র তো আছেই। এর বাইরেও মৃত্যুতে জীবনের অনেক হিসাবেরও মীমাংসা হয়। যেমন—দরিদ্র মানুষ সাধারণত এই ভেবে সান্ত্বনা পায় যে পৃথিবীতে যত কষ্টই হোক, পরপারে আর এসব অবিচার থাকবে না। সৎ মানুষ এ জন্যই কষ্ট করে চলে যে ওপারে গিয়ে তৃপ্তি আর প্রাপ্তি। অসৎ মানুষও মাঝেমধ্যে লাইনে আসে অথবা সীমানার মধ্যে থাকে একমাত্র মৃত্যুচিন্তার কারণে। বহু খারাপ মানুষকে দেখেছি, দুরারোগ্য অসুখে পড়ে সৎ-সত্য-সততার কথা বলতে শুরু করেছে। এবার বেঁচে গেলে আর খারাপ কাজ করব না—এমন প্রতিজ্ঞা করা মানুষকে আপনিও দেখেছেন নিশ্চয়। সবাই কথা রাখে না। তবু মৃত্যুভয় কিছু মানুষকে তো বদলায়।

এর বাইরে আরেকটা দৃষ্টিভঙ্গিও আছে। একদল জ্ঞানীর আড্ডায় একবার কথা হচ্ছিল মৃত্যু নিয়ে। একজন বললেন, মৃত্যু কিভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে দেখো।

কিভাবে?

হুট করে কেউ কেউ মারা যায়, সেই ধাক্কাটা এটা স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবী আসলে সাময়িক। সাবধান থাকতে হবে।

একজন রসিকতার স্বরে বলল, ‘তাহলে অনেক লোক হুট করে মারা গেলে তো আরো ভালো। আরো বেশি করে মানুষ বুঝত...’

তিনি হেসে বললেন, ‘না, সেই ঘটনা যদি খুব নিয়মিত ঘটে, মানে সকালে-বিকালে কোনো রকম অসুখবিসুখ বা ইশারা ছাড়াই মানুষ মারা যেতে থাকে, তাহলে তখন আবার দেখা দেবে অন্য সমস্যা। পৃথিবীর গতিশীলতাই থেমে যাবে। সবাই ভয় পাবে, এবার বোধ হয় আমি...। দেখা গেল সব স্তব্ধ।’

পৃথিবীর স্তব্ধ হওয়ার সময় চলে এলো নাকি!

আমাদের আরেক বড় ভাই শ্রেণির মানুষ যেকোনো দুঃসংবাদ শুনলেই বলতেন, ‘সমস্যা কী, কেউ তো আর মারা যায়নি।’

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে হেরে গেল, সমর্থকদের মন খারাপ, তিনি দার্শনিকের মতো বললেন, ‘কেউ তো আর মরেনি। আবার খেলবে।’

নিজের বিয়ে ভেঙে গেল, সবাই হতাশ, তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘আরে কেউ তো আর মরেনি।’

পরে জেনেছিলাম, এটা ঠিক নিজের কথা নয়, এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক মতবাদ। সে যা-ই হোক, মানুষটি আমাদের কাছে হয়ে গেলেন একটা কৌতুকের বিষয়। একবার কেউ একজন ভরা বাজারে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে বলল, ‘কেউ তো আর মরেনি।’

তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘কেউ মরেনি কিন্তু আমি তো পড়েছি।’

গল্পটা রটে গেল। মরে যাওয়াই যে একমাত্র খারাপ ব্যাপার নয়, পড়ে গেলেও যে কিছু সমস্যা হয়, সেটা তিনি নিজে মেনেছেন। তাঁকে এই নিয়ে খেপানোও হলো বিস্তর।

আজ চরম দুঃখের দিনেও এই হাসির গল্পটা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। আর মনে হয়, সেই কথাটাই সবচেয়ে বড় সত্য। কেউ তো মরেনি। পড়ে যাক, কষ্ট পাক, টাকা-পয়সায় ফতুর হোক, তবু বেঁচে থাক। বেঁচে থাকার মানেও এতটা আগে বোধ হয় বোঝেনি মানুষ।

এটা ব্যক্তিগত রসিকতার গল্প নয়। বইয়ের গল্প। এক ভদ্রলোক আরেকজনকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আচ্ছা কিছুদিন আগে যিনি মারা গেলেন তিনি কি আপনি, না আপনার ভাই?’

উত্তরদাতা হতভম্ব হয়ে বললেন, ‘আমার ভাই।’

প্রশ্নকর্তা, ‘তাই তো বলি, ওনাকে আর দেখি না কেন?’

এরপর আর কী উত্তর হয়। ভাই মরে যাওয়া এবং নিজে বেঁচে থাকা ভদ্রলোক পাথর হয়ে গেলেন।

গল্প এখানেই শেষ। কিন্তু আমাদের এখনকার গল্প এখানে শেষ হয় না। ভাই মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় ভাইকেও আর খুব সহজে রাস্তায় পাওয়া যায় না। হয়তো তিনিও আরেক হাসপাতালে। জীবনের লড়াইয়ে...

না, মৃত্যু ফানি নয়। বড় কুৎসিত। বীভৎস।

লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক



সাতদিনের সেরা