kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

ভারতীয় জাল মুদ্রা কারখানার মালিক মিশু সিন্ডিকেট!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০৩:৩০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতীয় জাল মুদ্রা কারখানার মালিক মিশু সিন্ডিকেট!

চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে ঢাকার লুত্ফুল হাসান বুঝতে পারেন সঙ্গে নেওয়া ভারতীয় মুদ্রার বেশির ভাগই জাল। ফলে চিকিৎসা ছাড়াই দেশে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। লুত্ফুলের মতো অনেক বাংলাদেশিকেই ভারতে গিয়ে জাল মুদ্রা নিয়ে বিপদে পড়তে হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি আলোচনায় এলেও রহস্যের কিনারা হচ্ছিল না। সেই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে রাজধানীর ভাটারা থেকে গ্রেপ্তার শারফুল হাসান ওরফে মিশু হাসানের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় জাল মুদ্রার সূত্রে।

গোয়েন্দা তথ্য মতে, অস্ত্র ও মাদক কারবার, দেশে-বিদেশে ডিজে পার্টির নামে অশ্লীল অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম হোতা মিশু হাসান ভারতীয় জাল রুপি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছিলেন। নিজস্ব এজেন্ট ও পরিচিত মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এসব জাল মুদ্রা বেশি ছড়াতেন তিনি। তাঁর চক্রের সদস্যরা সেসব জাল রুপি পাচার করতেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও।

গত ৩ আগস্ট রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১-এর অভিযানে ভাটারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মিশু। অভিযানে অংশ নেওয়া এক র‌্যাব সদস্য বলেন, টাঁকশালের মালিক হয়ে থাকে যেকোনো দেশের সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নানা হিসাব-নিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি করে মুদ্রা। কিন্তু এত সব হিসাব-নিকাশের তোয়াক্কা যাকে ছুঁতে পারেনি তিনি হচ্ছেন মিশু হাসান। নিজেই বনে গেছেন টাঁকশালের মালিক।

যাচ্ছেতাই পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রা উৎপাদন করেছেন। তিনি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা তৈরির কারখানা বসিয়েছেন দেশের ভারতীয় অংশের বেশ কিছু সীমান্ত এলাকায়ও। মানি এক্সচেঞ্জ কম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্ধেক মূল্যে তাদের কাছে পৌঁছে দেন ভারতীয় মুদ্রা।

র‌্যাব জানিয়েছে, প্রতারক মিশু সব সময় নিজেকে ‘ঢাকাইয়া’ পরিচয় দিলেও তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর মাইজদীতে। বাবার নাম নেয়ামত উল্লা। মিশুকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিপুল ইয়াবা, দামি গাড়ি, সিসার সরঞ্জাম, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই ও এটিএম কার্ড, পাসপোর্টসহ উদ্ধার করা হয় সাড়ে ৪৯ হাজার ভারতীয় মুদ্রা। পরে মিশুর দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর অন্যতম সহযোগী মো. মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানকে (৩৯)।

রিমান্ডে : মিশু ও জিসানকে পৃথক মামলায় মোট ১৬ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর মধ্যে জিসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন মামলায় সাত দিন এবং মিশুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন মামলায় ৯ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুজনকে ৪০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল পুলিশ। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই দুই আসামিকে হাজির করে ভাটারা থানা-পুলিশ এই রিমান্ড আবেদন করে। আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলাগুলো করা হয়েছে বিশেষ ক্ষমতা আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতীয় জাল রুপি নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে দেওয়াসহ মাদক, অস্ত্র ও দেহ ব্যবসা, নারীপাচার, চোরাচালান কার্যক্রম চালাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন মিশু। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করত। মাদক ও সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের প্রলুব্ধ করত। এরই ফাঁকে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করত। সব শেষে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিত কোটি কোটি টাকা।

মিশুর সিন্ডিকেটে ১০ থেকে ১২ জন : মিশুর এই সিন্ডিকেটে ১০ থেকে ১২ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তাঁরা রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বিশেষ করে গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করে থাকেন। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও মিশু বিভিন্ন জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। বিলাসবহুল নামি-দামি গাড়ি আমদানির পাশাপাশি মিশু নিজেও দামি গাড়ি ব্যবহার করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত দুটি রেঞ্চ রোভার, অ্যাকুয়া, ফোকসভাগেন, ফেরারিসহ পাঁচটি গাড়ির সন্ধান মিলেছে। এর আগে বিভিন্ন অভিযোগে তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মিশু। তাঁর নামে রয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা।

কারা সেই সিন্ডিকেটের সদস্য : মিশুর এই চক্রের অন্যতম সদস্য সম্প্রতি গ্রেপ্তার মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা। পেশায় একজন মডেল হিসেবে পরিচয় দিলেও শোবিজ জগতে তিনি অতটা পরিচিত নন। গত ১ আগস্ট রাত ১০টায় বারিধারার নিজ বাসা থেকে ডিবির হাতে আটক হন। ওই সময় তাঁর বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, ইয়াবা ও সিসা উদ্ধার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে এনে মদ ও ইয়াবা খাইয়ে তাঁদের আপত্তিকর ছবি তুলতেন। এরপর ওই ছবি দেখিয়ে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো।

একই দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মরিয়ম আক্তার মৌ নামের আরেক মডেলকে। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যেই গ্রেপ্তার হন মিশু ও তাঁর সহযোগী জিসান। মিশুদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে এই চক্রের অন্য সদস্যদের নাম। এরপরই র‌্যাব অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনি ও রাজ নামে এক প্রযোজককে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জামিল ও নাতাশা চক্রের সঙ্গে মিলে গুলশান পিংক সিটির বিপরীতে মিশু গড়ে তুলেছিলেন সিসা বার। আর মোহাম্মদপুরের সাবেক কাউন্সিলর রাজীবের (বর্তমানে বরখাস্ত ও জেলবন্দি) সঙ্গে এক হয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকার ফুওয়াং ক্লাবের ক্যাসিনো ব্যবসা। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর এসব ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে শুরু করেন এয়ারপোর্টে লাগেজ ব্যবসা। অল্প কয়েক দিনেই লাগেজ ব্যবসার বিষয়টি চাউর হয়ে গেলে নামেন চোরাই গাড়ির ব্যবসায়।

সূত্রে জানা যায়, অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন মিশু হাসান। এই অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কম হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। বাড়ি আছে গুলশানেও। বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি তো আছেই, যেগুলোর মূল্য শতকোটি টাকার বেশি।

জিসান অস্ত্রের কাঁচামাল আমদানির দায়িত্বে : মিশু হাসানের আরেক সহযোগী মাহমুদুল হাসান জিসানকে মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। জিসান মিশুর অস্ত্র, গোলাবারুদ, ইয়াবাসহ অবৈধ এটিএম কার্ড তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। জিসান মিশুর ভারতীয় জাল মুদ্রা তৈরির কারখানা থেকে এসব জাল মুদ্রা সরবরাহ করতেন বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ কেন্দ্রগুলোতে। এমনকি তাঁরা বেশ কিছু ব্যাংকের বিপত্গামী কর্মকর্তাদের এ কাজে লাগিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। ব্যাংকের এসব কর্মকর্তাকে হাত করে তাঁদের মাধ্যমেও মানি এক্সচেঞ্জ কম্পানিগুলোতে ভারতীয় জাল মুদ্রা সরবরাহ করতেন জিসান। ভারতীয় জাল মুদ্রা পাচারের পাশাপাশি বিদেশ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির কাঁচামাল আমদানি করতেন জিসান। আর এসব কাঁচামাল থেকে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জেলাগুলোতে কারখানা স্থাপন করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন করত তাঁদের এ সংঘবদ্ধ চক্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কাছে সরবরাহ করতেন জিসান। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের অস্ত্র বিক্রয়ের বড় সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন মিশু ও জিসান। প্রতারক মিশুর আরেক সহযোগীর নাম হাবিবুল্লাহ ডন।  বারভিডার সাবেক সভাপতি এই ডন যুক্ত হন মিশুর অবৈধ গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে। সম্প্রতি তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় মিশুর এফ-৪৩০ সিরিয়ালের ছয় হাজার সিসির গাড়ি।

গুলশানের ১১১ নম্বর রোডে অবস্থিত অটো মিউজিয়ামে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। এ ধরনের উচ্চ সিসির গাড়ি বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ। এ কারণে বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নেই। তবে এ ধরনের গাড়ি রাজধানীর রাস্তায় চলছে ভূরি ভূরি। মঙ্গলবার অটো মিউজিয়াম থেকে উদ্ধার গাড়িটিতেও একটি নাম্বার প্লেট লাগানো ছিল। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী জানিয়েছে নম্বরটি জাল।



সাতদিনের সেরা