kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপালগিরি কর, যা

নূরে আলম সিদ্দিকী   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০৬:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপালগিরি কর, যা

১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি হই। এর পর থেকে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় থাকলে তাঁর সঙ্গে অবশ্যই দেখা করতে যেতাম। দেখা হলে বঙ্গবন্ধু প্রায়ই তাঁর পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির অনেক কিছুই সস্নেহে আলোচনা করতে পছন্দ করতেন। আমি নীরবে তাঁর বক্তব্য শুনতাম। অবশ্য কখনো কখনো ছাত্রলীগের অভিমত তুলে ধরে মন্তব্য করতাম। আজকের ছাত্রনেতারা সেটা কল্পনাও করতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও মতাদর্শের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা রেখেও অনেক সময় আমাদের যুক্তিতর্ক ও মতামত তুলে ধরেছি। তিনি গভীর মনোযোগে আমাদের বক্তব্য শুনেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তও পরিবর্তন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনৈতিক ভিন্নমতও প্রকাশ করতাম।

সংসদে বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে বাকশালের বিরোধিতা করে দেওয়া বক্তব্যের কথাই আজ মনে পড়ছে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি প্রায় সংবিত্হারা ছিলাম বললেও অত্যুক্তি হবে না। সেদিন আমার ওই সুদীর্ঘ দুই ঘণ্টা ৫৫ মিনিটের বক্তব্যে (যা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে সম্পূর্ণ এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে) নিজের অজান্তেই অনেক রূঢ় শব্দ ব্যবহার করেছিলাম। অন্যদিকে মুজিব ভাই তাঁর স্বকর্ণে শ্রবণ করেও অপরিসীম সহিষ্ণুতার মাধ্যমে সেসব সহ্য করেছিলেন। এমনও হতে পারে, আমার ওই বক্তব্য তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। তাই বক্তব্য শ্রবণে তিনি বিমুগ্ধ না হলেও বিস্মিত, আশ্চর্যান্বিত ও দগ্ধীভূত হয়েছিলেন। তারপর সত্যি কথা বলতে গেলে, একটা অজানা আশঙ্কায় আমি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলাম। ওই সময়ের দোদুল্যমান মানসিক অবস্থায়ই খবর পেলাম, মনি ভাই আমাকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। নির্ধারিত সময়ে আমি মনি ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি বললেন, মামা তোকে দেখা করতে বলেছেন। সেদিনই অর্থাৎ ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের তিন-চার দিন আগে রাত ৯টার দিকে মনি ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে গেলেন।

আজও ভেবে বিস্মিত হই, আশ্চর্যান্বিত ও বিমোহিত হই, বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে পড়লে মনে হলো, কোনো রাগ-ক্ষোভ নেই। শান্ত-সমাহিত প্রশান্তচিত্তে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী সিদ্দিকী সাহেব, শুনলাম আপনি নাকি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন? এমনিতে মুজিব ভাই আমাকে তুই সম্বোধন করতেন। কিন্তু আজকে ভিন্নভাবে বলছেন। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ একটা ধমক দিয়ে বললেন, বস। তারপর কিছুটা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলতে থাকলেন— ‘আমার পেটের ছাও, আমাকেই ধরে খাও? আমি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য, সারাটা জীবন তাঁর পথেই হেঁটেছি। যদি আমি গণতন্ত্রকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালো না বাসতাম, তাহলে আমি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে থাকতাম, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নয়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর স্যার (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) ইন্তেকাল করলেও আমি তাঁর হাতের গণতন্ত্রের পতাকাকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেই নাই। বরং সজ্ঞানে, সবলে, সজোরে তুলে ধরে সামনের পথে হেঁটেছি। তুমি দুই দিনের বৈরাগী, ভাতেরে কও অন্ন! শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শিষ্যকে তুমি গণতন্ত্র শেখাও!’ সত্যি বলতে কী, তখন আমার অবস্থা দাঁড়াল ‘ত্রাহি মধুসূদন’।

তারপরই তিনি স্বগতোক্তির মতো করে বলতে থাকলেন— ‘আমার নির্দেশে বাংলার মানুষ অকুতোভয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, জিতেছে এবং জয়লাভ করেও তারা ঘরে উঠে যায় নাই। আমার মুক্তির জন্য বিরামহীন আন্দোলন করে আন্তর্জাতিক মতামত ও সমর্থন আদায় করে পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে আমাকে মুক্ত করে এনেছে। আমি রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, তিন বছর আমি তোমাদের কিছু দিতে পারব না। জনগণ সেই তিন বছর আমাকে অকাতরে দান করেছে। এই তিন বছরে আমি যে তাদেরকে কিছু দিতে পারি নাই তাই নয়, এখনো দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি করতে পারি নাই। আমি মানুষকে কী জবাব দেব? তার উপর খুন-রাহাজানি, ঈদের জামাতে সংসদ সদস্য হত্যা—এসবের মাধ্যমে যে অস্থিরতা ও বিভীষিকাময় অবস্থা তৈরি হচ্ছে, তাতে যেকোনো সময় প্রশাসন ধসে পড়তে পারে। তাতে অতি বিপ্লবীদের এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের অভিলাষ পূর্ণ হতে পারে। তাই আমার আরো কিছুটা সময় দরকার। আমি একটা অবস্থানে আসলেই গণতান্ত্রিক বহুদলীয় সংসদীয় বিধান পুনঃপ্রবর্তন করব।’

ওই মুহূর্তে আমার সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া পদত্যাগপত্রটি অতি বিনম্রভাবে মুজিব ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে লিখিত পদত্যাগপত্রটি পড়লেন, তারপর আমাকে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, পদত্যাগ করে তারপর আপনি কী করবেন? আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম। আকাশে বিদ্যুৎ-ঝিলিকের মতো তাঁর স্বভাবসুলভ মুচকি হেসে বললেন— ‘গোপালগঞ্জে আব্বার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজে প্রিন্সিপালগিরি কর গিয়ে, যা।’ সেটিই ছিল মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ।

বঙ্গবন্ধুর বৈশিষ্ট্যের স্বাতন্ত্র্য এবং হৃদয়ের ঔদার্য এখানেই। আমার পদত্যাগপত্রটি তাঁর পাঞ্জাবির পকেটেই রয়ে গেছে, স্পিকারের কাছে তিনি কখনোই দেননি। শুধু তা-ই নয়, জেনারেল ওসমানী এবং মঈনুল হোসেন সাহেবের পদত্যাগপত্রের ক্ষেত্রেও নাকি তাই হয়েছিল।

লেখক : স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি



সাতদিনের সেরা