kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

ইতিহাসে চিরস্থায়ী নাম

ইকরামউজ্জমান   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০৪:০৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইতিহাসে চিরস্থায়ী নাম

শেখ কামালের চিন্তায় প্রথম থেকেই প্রাধান্য পেয়েছে তারুণ্য। তিনি চেয়েছেন তারুণ্যকে ক্রীড়াঙ্গনে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে। লোকান্তরিত শেখ কামাল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনুপ্রেরণার সতত উৎস। তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা আমাদের ইতিহাসের সম্পদ

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে আধুনিক ক্রীড়ামনস্ক, সংস্কারবাদী, যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপ্লব সৃষ্টিকারী ক্রীড়া সংগঠক শেখ কামাল যে স্থান করে নিয়েছেন—এটি চিরস্থায়ী। অবাক হয়ে ভাবি, মাত্র ২৬ বছর কয়েক দিনের জীবনে একজন বাস্তববাদী, স্বপ্নচারী মানুষ কিভাবে দেশের খেলার ছবি পাল্টে দিয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে এই স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে। মুক্তিযুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করার সময়ের দিনগুলোতে বন্ধুকে বলেছেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে খেলার ছবিটাই বদলে দেব আমি।’ এ সবই ইতিহাসের অংশ। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি তাঁর লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন। চিহ্নিত হয়েছেন স্বাধীনতার পর প্রথম ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কার সাধন এবং পরিবর্তনের কারিগর ও রূপকার হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় সন্তান শেখ কামাল। তিনি ছিলেন উজ্জীবিত দেশপ্রেমিক। তাঁর বুকজুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। খেলাধুলা ভালোবাসতেন অন্তরের অন্তস্তল থেকে। ছিলেন অসীম আগ্রহী ও দৃঢ় সংকল্পের মানুষ। লাখ লাখ মানুষের রক্তে কেনা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি ছিল তাঁর নিজস্ব দায়বদ্ধতা ও কমিটমেন্ট। ক্রীড়াঙ্গনে সময়ের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা চিহ্নিত করে কাজ করেছেন এবং উদ্যোগ নিয়েছেন। আর এ ক্ষেত্রে ক্লাব ও ক্রীড়াঙ্গনসংশ্লিষ্ট মহল সবাইকে সম্পৃক্ত করে লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। একটি বিষয়ে জোর দিয়েই বলছি, শেখ কামালের ব্যক্তিত্ব প্রায় সব দিক থেকে সমন্বিত হয়েছে তাঁর সাংগঠনিক সত্তায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারে এবং সাফল্য অর্জন করতে পারে, যদি সে যা করছে তার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ও সত্যিকারের আন্তরিক হয়। স্বপ্ন, কল্পনাময়তা ও একাগ্রতা—এই তিন মন্ত্র শেখ কামালকে পরিচিত ও চিহ্নিত করেছে অনুকরণীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। একজন আদর্শ সংগঠক হওয়ার জন্য যেসব গুণ প্রয়োজন সেগুলো হলো সাহস, সততা, দূরদৃষ্টি, নিজের ওপর আস্থা, সহনশীলতা, বিচক্ষণতা। এগুলো শেখ কামালের মধ্যে ছিল। নিজে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন; কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে কখনো দলীয় রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেননি। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অনড়। ক্রীড়া সংগঠক ও খেলোয়াড়দের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা। সব সময় তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

স্বাধীনতার পর ক্রীড়াঙ্গনে ভালো পরিবেশ সৃষ্টি, ভালো খেলাকে উৎসাহিত করা, সমাজে খেলোয়াড়দের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি, ক্লাবের খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে উপকৃত করার অগ্রদূত হলেন শেখ কামাল। আশাবাদী এই ব্যক্তিত্ব নৈতিকতার চর্চা ও সুশাসনের বিষয়ে ছিলেন সোচ্চার। সব সময় সম্মিলিত শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্বাস করতেন, জীবনের অবিরাম সুবিধাকে কোনো কিছুই কেড়ে নিতে পারে না। যে কাজগুলো করেছেন, চিন্তা-ভাবনা এবং বুঝেশুনে করেছেন সাহস, প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কামাল সব ক্ষেত্রেই পেছন থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্যদের সব সময় ভাবতে দিয়েছেন যে তারাই সামনে রয়েছে। নিজের ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের বিভিন্ন খেলার দল গঠন থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজে জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র কয়েক মাস, ১৯৭৫ সালে। ‘ফ্লেক্সিবল’ ম্যানেজমেন্টে বিশ্বাসী হলেও নীতি এবং ক্লাবের শৃঙ্খলার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। ক্লাবে খেলোয়াড়দের মধ্যে ‘ফেভারিটিজম’ সৃষ্টিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহ করেছেন। নতুন দল আবাহনীকে বিভিন্ন খেলায় মাঠে নামানোর জন্য প্রথমবার যেভাবে দল গঠন করেছেন, অধিনায়ক নির্বাচন করেছেন—এটা ছিল তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা। এতে ক্রিকেট, ফুটবল, হকিতে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে নতুন ক্লাব। এলাকাভিত্তিক ক্লাব দেশের সেরা দলে পরিণত হয়েছে। দেশের বাইরে বিদেশে সাড়া জাগিয়েছে। ক্লাবের পেছনে দাঁড়িয়ে গড়েছেন বিরাটসংখ্যক সমর্থক ও ভক্ত। ক্লাবের ভালো খেলা ও বিজয় তাদের টেনেছে। শেখ কামাল খেলাধুলার আবেদন শুধু বৃদ্ধি করেননি, ক্রীড়াঙ্গনে নতুন রুচিরও জন্ম দিয়েছেন।

শেখ কামালের চিন্তায় প্রথম থেকেই প্রাধান্য পেয়েছে তারুণ্য, তাদের সামর্থ্য ও সম্ভাবনা। তিনি চেয়েছেন তারুণ্যকে ক্রীড়াঙ্গনে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে। ক্রীড়াঙ্গনসংশ্লিষ্টদের চিন্তা ও চেতনায় পরিবর্তন আনতে ঠিক যেভাবে বঙ্গবন্ধু ভেবেছেন, চেয়েছেন এবং অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

শেখ কামাল নিজে খেলোয়াড় ছিলেন। ক্রিকেট, বাস্কেটবল, ভলিবল, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিকস সব খেলায় তাঁর একসময় সরব বিচরণ ছিল। ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনকে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উৎকর্ষ প্রদর্শন থেকে অনেক বেশি শ্রেয় ও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন। আর এতে জাতির বৃহত্তর ক্রীড়াঙ্গন উপকৃত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্ত বিদায়ের শিকার না হলে, শেখ কামাল বেঁচে থাকলে তিনি ক্রীড়াঙ্গনে আরো অনেক অবদান রাখতে পারতেন। এতে ক্রীড়াঙ্গন আরো ঋদ্ধ হতো। তাঁর তিরোধানে দেশের ক্রীড়াঙ্গন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত জুন-জুলাই মাসে রাত জেগে দ্রুতগতির ইউরো ফুটবল দেখতে বসে শেখ কামালকে নিয়ে ভেবেছি। এখন থেকে ৪৭ বছর আগে তিনি তাঁর ক্লাব আবাহনীতে আইরিশ কোচ বিল হার্টের মাধ্যমে ইউরোপ ঘরানার ফুটবলের প্রচলন করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বাঙালির ১০০ বছরের সনাতন ফুটবল চত্বরে দিয়েছেন নতুন ফুটবলের স্বাদ। আমরা ফুটবলকে বলেছি আধুনিক ফুটবল। ঢাকায় যখন ইউরোপ ঘরানার ফুটবল আবাহনী খেলেছে, তখন ভারতের কলকাতার জমজমাট ফুটবল লিগে সেই পুরনো আমলের ফুটবল নিয়ে উচ্ছ্বাস আর হৈচৈ। আবাহনী শুধু দেশে নয়, প্রতিবেশী দেশের ক্লাবগুলোর চোখ খুলে দিয়েছে। প্রথম ক্লাব, যারা দেশে ইউরোপিয়ান ফুটবল কোচ নিয়োগ দিয়েছে। দেশের ফুটবলে নতুন মাত্রা সংযুক্ত হয়েছে। এখানেই শেখ কামালের অগ্রসরমাণ চিন্তা।

শেখ কামাল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে। আমার কাছে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যখন তিনি খেলোয়াড়দের স্বার্থরক্ষার জন্য মেট্রোপলিস ফুটবল খেলোয়াড় সমিতি গঠন করেন। এই সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। দ্বিতীয়ত, ১৯৭৫ সালে দুস্থ খেলোয়াড়দের সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন। এখানেই তাঁর মানবিক গুণাবলি এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়ে সচেতনতা। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে অসাধারণ অবদানের জন্য শেখ কামালকে ১৯৯৮ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ এবং ২০১১ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। লোকান্তরিত শেখ কামাল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনুপ্রেরণার সতত উৎস।

পোস্ট স্ক্রিপ্ট

আজ ৫ আগস্ট। শেখ কামালের ৭২তম জন্মবার্ষিকী। তিনি আমাদের মধ্যে নেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করেছে স্বদেশি ঘাতকরা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন শেখ কামাল। একজনের মধ্যে এত গুণ ও প্রতিভার সমাহার সত্যিই বিরল। একদিকে তিনি ছিলেন খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক; অন্যদিকে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মযোগে ছিল তাঁর বহুমুখী প্রতিভা। পাশাপাশি রাজনীতিতে তিনি দক্ষতার ছাপ রেখে গেছেন। এই নিবন্ধে সংক্ষেপে ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা ও অগ্রসর চিন্তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা আমাদের ইতিহাসের সম্পদ। এগুলো জানার প্রয়োজন আছে। এটা শুধু অতীতকে বোঝার জন্য নয়, ভবিষ্যতের পথরেখা সন্ধানের জন্যও। বস্তুত ইতিহাসের সব রাস্তা ভবিষ্যতের দিকেই প্রসারিত।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা