kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

ঢাকায় ঢুকেই ভোগান্তি, পকেট উজাড়

লায়েকুজ্জামান, ওমর ফারুক ও সজিব ঘোষ   

২ আগস্ট, ২০২১ ০৩:৩২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকায় ঢুকেই ভোগান্তি, পকেট উজাড়

রাজধানীর মিরপুরের একটি কারখানার পোশাক শ্রমিক মশিউর। মাথায় বড় কাপড়ের ব্যাগ আর হাতে প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে গুলিস্তান থেকে পল্টনের দিকে হাঁটছিলেন। ঘামে শরীর ভিজে একাকার। গতকাল রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় পৌঁছেন তিনি। সহজে বাস পাওয়া গেলেও তাঁকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে ঠিকই। তবে ঢাকায় ঢোকা পর্যন্ত পথে ভোগান্তি টের না পেলেও গুলিস্তানে এসেই দেন কষ্টে ডুব। ফুলবাড়িয়া থেকে গোলাপ শাহর মাজার পর্যন্ত সড়কে দেড় ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করেও মেলেনি কোনো বাস। শেষমেশ উপায় না পেয়ে হাঁটতে শুরু করেন। দুপুরের তেজি রোদে হেঁটেই বা কত দূর যাবেন। তাই রিকশার খোঁজ। গুলিস্তান থেকে মিরপুর যাওয়ার রিকশাভাড়া চাওয়া হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা। মশিউরের পকেটে আছে ৭০০ টাকা। তাই পথ থেকেই মিরপুর যাওয়ার আরেক সঙ্গী জোগাড় করলেন। দুজন ভাড়া ভাগাভাগি করে এক হাজার ২০০ টাকায় রওনা হলেন মিরপুরের দিকে।

kalerkanthoজিরো পয়েন্টের কিছুটা আগেই সড়কের পাশে দাঁড়ানো আছে বেশ কয়েকটি মাইক্রোবাস। মাইক্রোবাসের সারিতে আছে অ্যাম্বুল্যান্সও। এসব গাড়িতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের যাত্রী তোলা হচ্ছে। এমনকি সাদা রঙের গাড়িতে লাল রঙে লেখা অ্যাম্বুল্যান্সেও। গাড়ির ছাদে আছে অকার্যকর লাল বাতি। অ্যাম্বুল্যান্সের চিরচেনা হুইসেলও বন্ধ। এসব মাইক্রোবাসে ৩০০ টাকার নিচে ভাড়া নেই। তা সে পল্টন থেকে রামপুরা হলেও। তবু নিরুপায় হয়ে তাতে চড়ছে মানুষ।

ফুলবাড়িয়া থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত সড়কে হাজারো মানুষ ঘরে ফেরার উপায় খুঁজছিল। এই পথে গতকাল দুপুরে কিছু বাস চলাচল করলেও তাতে ওঠার উপায় ছিল না। অপেক্ষমাণ মানুষের চেয়ে তা পর্যাপ্ত ছিল না।

গতকাল ঢাকায় ফেরা এসব মানুষের রিকশায় চড়তে আর্থিক সামর্থ্যের পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। কেননা, মানুষের পাশাপাশি রাস্তায় প্রচুর রিকশা থাকলেও সহজে যাত্রী তোলা হচ্ছিল না তাতে। ভাড়া আর দূরত্বের সমন্বয় করা দুই পক্ষের জন্যই ছিল মুশকিল। এত যাত্রী উপস্থিত থাকার পরও তাঁরা কেন যাত্রী নিচ্ছেন না; এমন ভাবনা জানতে কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র কথা হয়। তাঁদের একজন হারুন মিয়া বলেন, ‘দূরের যাত্রী পেলে যাব, তাই দূরের খ্যাপ খুঁজি।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনের পেছনের রাস্তায় চারজন মিলে একটি ভ্যান ঠিক করেছেন। ভাড়া ৬০০ টাকা। তাঁদের একজনকে হাজারীবাগ, একজনকে জিগাতলা নামিয়ে অন্য দুইজনকে নিয়ে ভ্যান চলে যাবে মোহাম্মদপুর। সেই ভ্যানের যাত্রী নোমান বলেন, ‘আমি বাড়ি থেকে যখনই আসি গুলিস্তান থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় লেগুনায় করে হাজারীবাগ যাই। এখন তো লেগুনা বন্ধ। ১৫০ টাকার নিচে রিকশা যেতে চাচ্ছে না। ভাইদের সঙ্গে উঠছি আমারে হাজারীবাগ নামিয়ে দিয়ে যাবে ১০০ টাকা দেব।’

‘সরকার মনে অয় আমরারে মানুষ মনে করে না’ : ‘সরকার মনে অয় আমরারে মানুষ মনে করে না। তা নইলে এত কষ্ট দেয় ক্যান। বাস যদি ছাড়বোই হেইডা দুপুর পর্যন্ত ক্যান। যাত্রাবাড়ী থাইকা হাইটা মিরপুর যাইতাছি। হাঁটতে আর ভালা লাগে না। পকেটে টেহা নাই যে রিকশায় যামু।’ এভাবেই আক্ষেপ করে বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা আসা আরিফ হোসেন নামের এক যুবক। তিনি রাজধানীর মিরপুরের একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ করেন।

কঠোর লকডাউনের মধ্যে হঠাৎ করে শনিবার রাত থেকে ১৬ ঘণ্টার জন্য গণপরিবহন চালুর সিদ্ধান্ত দেয় সরকার। এ খবর জানতে পেরে সারা দেশ থেকে মানুষ আসতে শুরু করে ঢাকায়। কিন্তু দুপুরের দিকে ঢাকায় আন্ত পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ায় গ্রাম থেকে আসা লোকজন পড়েন ভোগান্তিতে।

আরিফ হোসেন জানান, দুপুর সোয়া ১টার দিকে যাত্রাবাড়ী নেমে দেখেন ঢাকায় কোনো বাস চলছে না। এক রিকশাচালক মিরপুরে যেতে তাঁর কাছে ৬০০ টাকা ভাড়া চান। পরে তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে হেঁটেই রওনা হন মিরপুরের উদ্দেশে। দুপুর সোয়া ২টার দিকে গুলিস্তানে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘পকেটে ২০০ টাকা আছে। এক ঘণ্টা ধইরা হাইটা গুলিস্তান পর্যন্ত আইছি। যতক্ষণ গায়ে শক্তি আছে ততক্ষণ হাঁটমু। ফার্মগেটের পরে গিয়া যদি ১০০ টাকা দিয়া রিকশা পাই তা দিয়ে মিরপুর যামু।’

পোস্তগোলা থেকে আব্দুল্লাহপুর দেড় হাজার টাকা ভাড়া : শনিবার রাত ৯টার দিকে পুরান ঢাকার জুরাইন রেলগেটের কাছে এক নারীসহ তিনজনকে অটোরিকশা থেকে নামতে দেখা যায়। তিনজনের সঙ্গেই বড় বড় ব্যাগ। তাঁরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আবদুল্লাহপুর যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশা খুঁজছিলেন। এ সময় রেলপথের পাশে সাত-আটটি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের দেখে তিনজন অটোরিকশাচালক এগিয়ে এসে জানতে চান তাঁরা কোথায় যাবেন। আবদুল্লাহপুরের ভাড়া জানতে চাইলে অটোরিকশাচালকরা দুই হাজার টাকা ভাড়া চান। পরে অন্য কোনো বাহন না পেয়ে দেড় হাজার টাকায় তাঁদেরকে আবদুল্লাহপুরের দিকে যেতে দেখা যায়।

সরকারকে ধন্যবাদ গাড়ির চাকা ঘোরাতে দিছে : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দেখা যায়, একের পর এক বাস ছেড়ে যাচ্ছে কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তবে টার্মিনালে যাত্রী কম। এ কারণে কেউ ব্যাগ নিয়ে এলেই তাঁকে গাড়িতে তোলার জন্য টানাটানি চলে। তিশা পরিবহনের কন্ডাক্টর আলামিন বলেন, ‘অনেক দিন ধইরা বাস বন্ধ। আমাগোও কোনো রোজগার নাই। কয়েক ঘণ্টার লাইগা বাস চালানোর সুযোগ দেওয়ায় আমরা বাস লইয়া বাইর হইছি। সকালে যখন ট্রিপ নিয়া আইছি তহন যাত্রী ছিল। অহন ফেরার সময় যাত্রী নাই।’

পোশাককর্মী কম, সাধারণ যাত্রীই বেশি : পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য সরকার গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচল করার অনুমতি দেয়। গণপরিবহন চলাচল করলেও বাসে পোশাককর্মীর দেখা মিলেছে খুব কম, সাধারণ যাত্রীর সংখ্যাই ছিল বেশি। যশোর থেকে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাস সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গাবতলী বাস টার্মিনালে এসে পৌঁছায়। ৫২ আসনের বাসে প্রতিটি আসনেই যাত্রী দেখা যায়, তবে বাসটিতে কোনো পোশাককর্মী খুঁজে পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে আসা ১০টি বাসে খোঁজ নিয়ে পোশাকশিল্পে কর্মরত মাত্র ১৪ জন শ্রমিককে পাওয়া যায়।

সরকার গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাস চলাচলের অনুমতি দিলেও রাত পর্যন্ত দেখা গেছে দূরপাল্লার কিছু বাস চলাচল করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, যানজটের কারণে কিছু বাস হয়তো নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেনি। তাই বাসগুলো ঢাকায় আসতে একটু সময় লাগতে পারে। তবে সরকার গণপরিবহন চলাচলের কোনো সময় বাড়ায়নি।’

কঠোর বিধি-নিষেধে ঢিলেঢালা ভাব : এদিকে গতকাল ছিল চলমান কঠোর বিধি-নিষেধের দশম দিন। গত ৯ দিনের চেয়ে গতকালের সড়কের চেহারা ছিল একেবারেই ভিন্ন। ঢাকার প্রবেশমুখ ও আশপাশের এলাকাগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে চলাচল করতে দেখা গেছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে যান চলাচলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকায় ফেরা মানুষ। সড়কে ব্যক্তিগত যান চলাচল ছিল অন্যদিনের চেয়ে বেশি। দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাস চলার কথা ছিল। তবে দুপুরের পরও আজিমপুর, গুলিস্তান, শান্তিনগর, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় বাস চলতে দেখা গেছে। বেশির ভাগ এলাকায়ই ছিল না পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি চৌকি। তেমন কাউকে জিজ্ঞাসার মুখে পড়তে হয়নি। সব মিলিয়ে চলমান লকডাউন পরিস্থিতি গতকাল ভেঙে পড়েছিল।



সাতদিনের সেরা