kalerkantho

সোমবার । ৫ আশ্বিন ১৪২৮। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১২ সফর ১৪৪৩

সম্পদের ছড়াছড়ি হেলেনা জাহাঙ্গীরের!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১ আগস্ট, ২০২১ ০৭:২১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বিপুল সম্পদের হদিস পেয়েছে র‌্যাব। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক র‌্যাব কর্মকর্তার কথায়, এত সম্পদ থাকার পরও বিভিন্ন সময়ে প্রতারণা, চাঁদাবাজি কিংবা ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে অর্থ কামানোয় ব্যস্ত ছিলেন হেলেনা। এখন তাঁর আয়ের উৎস খুঁজতে সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাঠে নামবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিগগিরই হেলেনার সম্পদের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধানে নামবে। তারা হেলেনার মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে। মানি লন্ডারিং, বিদেশে অর্থপাচারসহ হেলেনা জাহাঙ্গীরের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কোনো প্রকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

জানতে চাইলে দুদক সচিব ড. মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘র‌্যাব যেহেতু তাদের ব্রিফিংয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক বিষয়টি উল্লেখ করেছে, তাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের অবহিত করবে। পরবর্তীতে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

এখন পর্যন্ত র‌্যাবের তদন্তে যা উঠে এসেছে তাতে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানায় রাজধানীতে ১৫টি ফ্ল্যাটের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ৩৬ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ২ নম্বরের ৮৬ নম্বর সড়কের ৭/বি নম্বর বাড়িতে আট হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, গুলশান এভিনিউ ও নিকেতনে দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ১১ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট এবং কাজীপাড়ায় একটি ফ্ল্যাট আছে।

র‌্যাবের তদন্তে আরো জানা যাচ্ছে, হেলেনা পাঁচটি গার্মেন্টের মালিক। এগুলো হলো মিরপুর ১১ নম্বরের নিউ কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জের জয় অটো গার্মেন্টস, জেসি এমব্রয়ডারি, প্যাক কনসার্ন (যৌথ মালিকানা) ও হুমায়ারা স্টিকার। তদন্তে সাতটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। সেগুলো হলো জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন, আর্চারি ফেডারেশন ক্লাব, নোটারি ডোনেশনস, টেনিস ফেডারেশন, ইনারহিল ক্লাব, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল লেডিস ক্লাব ও ক্যারম ফেডারেশন।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, হেলেনা মোট ১২টি ক্লাবের সদস্য। সেগুলো হলো গুলশান ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, ঢাকা বোর্ড ক্লাব, গুলশান সোসাইটি ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গুলশান জগার সোসাইটি, ফিল্ম ক্লাব, গুলশান হেলথ ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, ঢাকা রাইফেলস ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার্স ক্লাব। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে কখনো তিনি ছয়টি গাড়ি, কখনো আটটি গাড়ির মালিকানার কথা বলেছেন।

র‌্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১৮ সালে নিবন্ধন ছাড়াই জয়যাত্রা নামের আইপি টিভির কার্যক্রম শুরু করেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। এই ভুঁইফোড় টিভিতে প্রায় ৭০ জন কর্মী আছে। বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ আছে। ক্ষেত্রবিশেষে বেতন-ভাতা না দিয়েই অনেককে চাকরিচ্যুতির নজিরও আছে। এ ছাড়া কর্মীদের মধ্যে অনেকেই জয়যাত্রার আইডি কার্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে থাকেন।

র‌্যাব জানায়, গত দুই বছরে বিভিন্ন মাধ্যম ও টেলিভিশনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এবং এজেন্সি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্নজনের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করছেন হেলেনা। কারো কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, কারো কাছ থেকে ২০ হাজার; আবার কারো কাছ থেকে এক লাখ টাকাও নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে এভাবে তিনি কী পরিমাণ টাকা কামিয়েছেন কিংবা এই অর্থ কোন কাজে ব্যবহার করেছেন, তার সদুত্তর দেননি হেলেনা। তাঁর বাসা ও অফিস থেকে যেসব ভাউচার উদ্ধার করা হয়েছে, সেসব এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, হেলেনার একটি বিশেষ সাইবার টিম আছে। ওই দলের সদস্যদের তিনি নিজের প্রচার-প্রচারণায় ব্যবহার করতেন। যারা হেলেনা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করত, তাদের কৌশলে ঘায়েল করার পাশাপাশি অপমান-অপদস্থ করতেও ওই দলকে কাজে লাগানো হতো। হেলেনা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রথমে সখ্য তৈরি করতেন। পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ও করতেন। হেলেনা সুনামগঞ্জে ত্রাণ বিতরণ করায় স্থানীয়রা তাঁকে ‘পল্লীমাতা’ উপাধি দেয়। তিনি বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের নামে প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ এনেছেন। সেগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তার সদুত্তর দেননি জিজ্ঞাসাবাদে।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হেলেনা জাহাঙ্গীরের অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করা হয়েছিল, সেসব বিষয়ে নানা তথ্য মিলেছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

রাবের তদন্তে আরো উঠে এসছে, হেলেনা সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির জন্য থেমে থাকেননি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লোকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তাঁর। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাকে প্রয়োজন হয়েছে, তাকেই তিনি ঘায়েল করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলেছেন এবং সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ছড়িয়েছেন শুধু উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত লাখ লাখ লোক তাঁর সঙ্গে আছেন বলে দাবি করে সম্প্রতি তিনি ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠন করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বক্তব্য উল্লেখ করে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাঁর ওই বক্তব্য খুবই উদ্বেগজনক। কাউকে এভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে কথা বলা সমীচীন নয়। তিনি শুধু নিজের অবস্থান উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এ ধরনের অপপ্রয়াস, অপতৎপরতা চালিয়েছিলেন। ’

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। গত ১৭ জানুয়ারি তাঁকে এই পদ দেওয়া হয়। গত রবিবার তাঁকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।

হেলেনার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা : অনুমোদন ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জয়যাত্রা টিভির সম্প্রচারের অভিযোগে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নামে পল্লবী থানায় আরেকটি মামলা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে র‌্যাব-৪-এর একজন উপপরিদর্শক (এসআই) গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই মামলা করেন। এ নিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নামে রাজধানীর গুলশান থানায় দুটি ও পল্লবী থানায় একটি মামলা হলো। বর্তমানে এসব মামলার তদন্ত করতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ।

৭ দিনের রিমান্ড আবেদন : এদিকে পল্লবী থানার মামলায় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলামের আদালতে এ রিমান্ড আবেদন করা হয়। গুলশান থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় রিমান্ড শেষে হলে এ মামলার রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।



সাতদিনের সেরা