kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

কর্মস্থলমুখী জনস্রোত

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১ আগস্ট, ২০২১ ০২:৫৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কর্মস্থলমুখী জনস্রোত

গতকাল সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী শ্রমিক-কর্মচারীরা। স্রোতের মতো কর্মস্থলমুখী মানুষের এমন জটলা মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের।

দুই কাঁধে তিনটি ব্যাগ। চার বছরের ছেলের হাত ধরে হেঁটে আমিনবাজার সেতু পার হচ্ছিলেন আসাদুজ্জামান। কোলে ছোট্ট মেয়ে আর হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে তাঁকে অনুসরণ করছেন স্ত্রী আমেনা। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামানকে শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় কারখানা থেকে ফোন করে আজ রবিবার কাজে যোগ দিতে বলা হয়। রাতেই পাশের বাড়ির এক ইজিবাইকচালকের সঙ্গে কথা বলে রাখেন তিনি। আজ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রথমে ৭০০ টাকা ভাড়ায় আসেন চন্দ্রা পর্যন্ত। এরপর আরো চারবার ইজিবাইক বদল করে মোট দুই হাজার ৮০০ টাকা খরচ করে আসেন ঢাকার আমিনবাজার। মিরপুরের পল্লবীর লীন নিটওয়্যারের কর্মী আসাদ দ্রুত পা চালাচ্ছিলেন পল্লবীর বাসায় ফেরার জন্য।

আসাদুজ্জামানের মতোই অবস্থা টাঙ্গাইলের নাগরপুরের জুলেখার। গত বছর করোনা বিধি-নিষেধের মধ্যে মাত্র এক দিন দেরি করে কাজে যোগ দেওয়ায় তাঁর স্বামী শিহাব চাকরি হারান। স্বামীর চাকরি হারানোর ঘটনা জুলেখাকে এখন তাড়া করে ফেরে। তাই এবার কোনো ভুল নয়। যে করেই হোক ঢাকায় তাঁকে ফিরতেই হবে। তিনিও শুক্রবার রাত ১০টায় কারখানা কর্তৃপক্ষের ফোন পেয়েছেন। ভোরেই ঢাকার পথে রওনা দেন।

কারখানা খোলার খবরে আসাদুজ্জামান ও জুলেখার মতো লাখো শ্রমিক গতকাল শনিবার ঢাকায় প্রবেশ করেছেন। চলমান কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যেই গত শুক্রবার রাতে তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা আজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।

কালের কণ্ঠ’র বিভিন্ন জেলা, আঞ্চলিক ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে কর্মস্থলমুখী মানুষের ভোগান্তির চিত্র পাওয়া যায়।

পোশাক শ্রমিকদের যাঁরা ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি গেছেন, তাঁদের ছাড়াই কারখানা খোলার শর্ত মেনে নেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাঁরা গ্রামের বাড়ি আছেন তাঁদের এখন কাজে যোগ দিতে হবে না। এ জন্য তাঁদের চাকরিও যাবে না। বিধি-নিষেধ শিথিল হলে তাঁরা কাজে যোগ দেবেন।

কিন্তু এমন শর্তের বরখেলাপ করে পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ শুক্রবার রাতেই শ্রমিকদের মোবাইল ফোনে কল করে ও খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে কাজে যোগ দিতে বলে। এতে করে গণপরিহন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও চাকরি বাঁচানোর জন্য শ্রমিকরা কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেন গতকাল। সড়ক ও ফেরিঘাটে ঢাকামুখী জনস্রোত তৈরি হয়। ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হলেও কর্মস্থলে ফিরতে মরিয়া লোকজন হেঁটে, স্বল্প গতির যানবাহনে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে ছুটে আসে।

শ্রমিকদের অনেকেই বলেছেন, তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছেন। কখনো পণ্যবাহী গাড়ি, বালু উত্তোলনের ড্রেজার, মোটরসাইকেল, মালবাহী কনটেইনার, রিকশা, ইজি বাইক ও অটোরিকশায় ভেঙে ভেঙে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কর্মস্থল এলাকায় এসেছেন। অনেকে বলেছেন, ৪০ টাকার বাসভাড়ার পথ ইজি বাইকে এসেছেন ৭০০ টাকায়।

ঢাকামুখী মানুষের ঢলে প্রভাব পড়েছে ফেরিঘাটে। ফেরিতে যাত্রীর জন্য গাড়ি ওঠার সুযোগ পায়নি। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে সাধারণত ছয়টি ফেরি চলাচল করলেও গতকাল যাত্রীর চাপে ১০টি ফেরি চালানো হয়েছে। বাংলাবাজার ঘাটে ঢাকামুখী যাত্রী দিয়েই এসব ফেরি বোঝাই ছিল। উল্টো ছবি শিমুলিয়া ঘাটে। এই ঘাট থেকে ফেরিগুলো প্রায় খালিই গেছে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গতকাল সকাল থেকে সারা দিন কর্মস্থলমুখী লাখো মানুষের ঢল ছিল। দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে সচল থাকা চারটি ফেরিঘাটের পন্টুনসহ সংযোগ সড়কে নারী, শিশুসহ হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রিকশা-ভ্যান, অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার মাহিন্দ্রা, মোটরসাইকেল ও ট্রাকসহ পণ্যবাহী বিভিন্ন গাড়িতে করে ভেঙে ভেঙে হাজার হাজার মানুষ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এসে নামছিল। এসব মানুষের মধ্যে পোশাক কারখানার কর্মীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. শিহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, সকাল থেকে ছোট-বড় ৯টি ফেরি চলাচল করছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌলতদিয়া ঘাটে হাজার হাজার যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বহরে থাকা ১৬টি ফেরি চালু করা হয়।

বিআইডাব্লিউটিএ সূত্র বলেছে, আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলবে।

গাজীপুরের এক পোশাক কারখানায় কাজ করেন আলমগীর হোসেন। তাঁর বাড়ি বরিশাল। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্ট বন্ধ হওয়ার পর পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সুপারভাইজার ফোন দিয়ে জানাইছে, রবিবার গার্মেন্টস খোলা। যেভাবেই হোক যেতে হবে। সময়মতো উপস্থিত না হলে চাকরি থাকবে না।’

ঢাকার আরেক প্রবেশমুখ নারায়ণগঞ্জের সড়কেও মানুষের চাপ দেখা গেছে। হেঁটে, ছোট-বড় গাড়ি মিলিয়ে যে যেভাবে পারছে ঢাকার দিকে ছুটছে। এ এলাকায়ও সাত শর মতো পোশাক কারখানা রয়েছে। চাকরি বাঁচাতে ১০০ টাকার ভাড়া এক হাজার ৫০০ টাকা দিয়েও কুমিল্লা থেকে নারায়ণগঞ্জ এসেছেন অনেকে। সানোয়ারা নামের এক পোশাক শ্রমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কাঁচপুর বিসিকে কাজ করি। গত রাতে (শুক্রবার) অফিস থেকে ফোন দিয়ে বলেছে রবিবার অফিস করতে হবে। সঠিক সময়ে পৌঁছতে না পারলে চাকরি চলে যাবে—এ কথাও বলেছে।’

এদিকে যান চলাচল বেড়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে। গণপরিবহন না থাকায় ছোট যানে গাদাগাদি করে মানুষকে কর্মস্থলে ফিরতে দেখা যায়।

জামালপুর থেকে ঢাকার মিরপুরে যাচ্ছিলেন ছালমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘চাকরি বাঁচাতে কয়েক দফা গাড়ি বদলে, হেঁটে এলেঙ্গা পর্যন্ত এসেছি। এখানে কোনো পরিবহন না পেয়ে আবার হাঁটা শুরু করেছি’।

সিরাজগঞ্জের আসাদুল বলেন, ‘নৌকা দিয়ে যমুনা নদী পার হয়ে এলেঙ্গা এসেছি। এখন ইজি বাইকে ঢাকা যেতে একজনের ভাড়া চাচ্ছে ৫০০ টাকা। আমার কাছে এত টাকা নাই। একটা ট্রাক পাইলে কম টাকায় উঠে যাব।’

কুড়িগ্রাম থেকে বালু তোলার ড্রেজারে করেও নদী পাড়ি দেয় অনেক মানুষ। সেখানে গাদাগাদি করে উঠতে গিয়ে অনেকে নদীতে পড়ে যাচ্ছিল। গাজীপুরের সড়কে মানুষের চাপ ছিল। অতিরিক্ত ভাড়ায় ছোট যান ও হেঁটে গাজীপুর ও আশাপাশের এলাকায় ভোর থেকেই মানুষ আসতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড়ও বাড়ে।



সাতদিনের সেরা