kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

সময় ও ব্যয় বাড়ে কাজ শেষ হয় না

সজিব ঘোষ    

৩১ জুলাই, ২০২১ ০৩:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সময় ও ব্যয় বাড়ে কাজ শেষ হয় না

ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুতগতির গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এখনো শেষ হয়নি। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের সময় এরই মধ্যে তিন দফা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেই বাড়তি সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করা যায়নি। প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এখন আরেক দফা সময় বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা চলছে।

রাজধানীতে এটিই প্রথম বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মধ্যবর্তী উভয় পাশের একটি করে লেন শুধু বিআরটি বাস চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকার বিস্তৃতি ২০.২ কিলোমিটার। বিআরটি লেনের পাশাপাশি করিডরটিতে উভয় দিকে দুটি করে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক হালকা যান চলার লেন, একটি করে অযান্ত্রিক যান চলাচলের লেন বা সার্ভিস লেন এবং উভয় পাশে ফুটপাত থাকবে। এতে ছয়টি এলিভেটেড স্টেশন ও ১০ লেনবিশিষ্ট টঙ্গী সেতু থাকবে। ছয়টি ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৬ কিলোমিটার অ্যাট গ্রেড (সমতলে) ও সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড (ওপরে) করিডর নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১১৩টি বা ৫৬ কিলোমিটার ফিডার রোডের উন্নয়ন করা হবে। বিভিন্ন স্থানে ২৫টি স্টপেজ থাকবে। জলজট নিরসনে প্রকল্পের আওতায় টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার নালা নির্মাণ করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ২০-২৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা যাবে।

বিআরটি লেন নির্মাণের জন্য ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)’ অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেটা না হওয়ায় প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এরপর আরেক দফায় ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। ওই বাড়তি মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবার সময় বাড়ানো হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময় ব্যয় বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সমন্বয়ে চারটি প্যাকেজে প্রকল্পটির কাজ চলছে।

গত জুন পর্যন্ত অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুটি প্যাকেজের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি দুটির কাজ চলছে। সব মিলিয়ে ওই সময় পর্যন্ত প্রকল্পটির কাজের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৫৮.৪০ শতাংশ। আর মোট আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫১.০৯ শতাংশ।

যে দুটি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে সেগুলো হলো ‘সিও থ্রি’ এবং ‘সিও ফোর’। এই দুটি প্যাকেজের কাজ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিআরটির মূল করিডরের সঙ্গে ফিডার রোডের (স্টপেজে আসা-যাওয়ার সড়ক) উন্নয়নকাজ হয় ‘সিও থ্রি’ প্যাকেজের অধীন। আর ‘সিও ফোর’ প্যাকেজের অধীন গাজীপুরে বিআরটির বাস ডিপোর নির্মাণকাজ করা হয়।

বিমানবন্দর থেকে আজমপুর এবং শিববাড়ী থেকে চেরাগ আলী পর্যন্ত অংশটি ‘সিও ওয়ান’ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। এই অংশে কাজের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ। প্যাকেজে কাজের পরিকল্পিত অগ্রগতি ৭৭.৩৫ শতাংশ আর বাস্তব অগ্রগতি ৫৮.২৮ শতাংশ। এই অংশে মাটির নিচের কাজ ছাড়া ওপরের কোনো কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। বাস স্টপেজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের মতো বড় কাজগুলো বাকি থেকে গেছে। টঙ্গী সেতু থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কের ৯ কিলোমিটারে এখন কাজ চলছে। কাজটি করছে সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ। টঙ্গী কলেজ গেট থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত এই অংশের সাত কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়ে গেছে। যে দুই কিলোমিটার পুরনো সড়ক আছে সেখানেই মূলত যানজট সৃষ্টি হয়। টঙ্গীর বাকি তিন কিলোমিটার এলাকায় কাজ করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। বিআরটির নির্মাণকাজের জন্য টঙ্গী সেতু থেকে টঙ্গী স্টেশন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যানজট সৃষ্টি হয়।

আজমপুর থেকে চেরাগ আলী পর্যন্ত অংশটি ‘সিও টু’ প্যাকেজের অধীন। এই কাজ করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এখানে ফ্লাইওভার, সেতু ও সড়কের কাজ হবে। এসব কাজের কোনোটিই এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই অংশে কাজের পরিকল্পিত অগ্রগতি ৬৫.২৫ শতাংশ আর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৫০.০১ শতাংশ। এই অংশে বড় কাজের মধ্যে ফ্লাইওভার ও সড়ক তৈরির কাজ বাকি আছে।

‘সিও ওয়ান’ প্যাকেজের প্রকল্প পরিচালক এ এস এম ইলিয়াস শাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের নিচের কাজ অর্থাৎ সড়কের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন ওপরের কাজ বা সেতুর কাজ বাকি।’ তিনি বলেন, মহাসড়কে এখন যানজটের যে ভোগান্তি চলছে সেটা সেতু কর্তৃপক্ষের কাজ শেষ না হওয়ার কারণেই হচ্ছে।

সেতুর কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ‘সিও টু’ প্যাকেজের প্রকল্প পরিচালক লিয়াকত আলীর সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ঢাকা-গাজীপুর দ্রুতগতির এই গণপরিবহনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছে ঢাকা বিআরটি কম্পানি লিমিটেড। চার বছরের কাজ এখনো শেষ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকের কাজের সময় বেশি লাগে আর অগ্রগতি কম দেখা যায়। মূলত নকশা পরিবর্তনের কারণেই অনেকটা দেরি হয়েছে। মাটির নিচের জটিল কাজগুলো শেষ হয়ে গেছে। ওপরের কাজ হতে আর বেশি সময় লাগবে না।’

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দ্রুতই আরো তিন মাসের সময় চাওয়া হতে পারে। আশা করছি সব ঠিক থাকলে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়লে ব্যয় তো বাড়বেই।’

বিআরটির কাজের ধীরগতির কারণে প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং এতে ভোগান্তিতে পড়ছে ওই মহাসড়ক ব্যবহারকারীরা—এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিআরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘চেরাগ আলী মোড়ে আগে সমস্যা ছিল। এখন ওখানে তেমন সমস্যা হয় না। সংস্কার করার পর ওই জায়গাটিও ঠিক হয়ে গেছে। এখন নিয়মিত যানজট হয় ব্রিজ থেকে স্টেশন পর্যন্ত।’



সাতদিনের সেরা