kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

এমএলএম বাণিজ্যের নামে প্রতারণা

কইয়ের তেলে কই ভাজছে ওরা

জহিরুল ইসলাম   

৩১ জুলাই, ২০২১ ০৩:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কইয়ের তেলে কই ভাজছে ওরা

এমএলএম বাণিজ্যের নামে জালিয়াতি থামছে না। সাধারণ মানুষকে দ্বিগুণ, তিন গুণ লাভের সহজ ফাঁদে ফেলে আর ভোলানো না যাওয়ায় এখন অনলাইনে ভিন্ন কৌশল নিয়েছে এই জালিয়াতচক্র। সম্প্রতি কোটি কোটি টাকা মেরে লাপাত্তা হওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘ডেইলি বিক্রয় হাট’ নামের একটি এমএলএম কম্পানির বিরুদ্ধে। প্রতারকচক্রটি অনলাইনে অ্যাপস চালু করে বহুগুণ লাভের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এই চক্রের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে কয়েক শ পরিবার। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে শত শত তরুণের। ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ, স্পিক এশিয়া, নিউওয়ের সঙ্গে জড়িতদেরই অনলাইনে নতুন নামে প্রতিষ্ঠান খুলে প্রতারণা করার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতারণার ফাঁদে পড়া কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই কম্পানিতে একজন ব্যক্তি জয়েন করে নতুন কাউকে জয়েন করালে তাকে স্পট বোনাস, ম্যাচিং বোনাস, রেফারেন্স বোনাসসহ অর্থ পরিশোধ করা হয়। শুরুতে এসব বোনাসের অর্থ নিজেদের জয়েন করা টাকা থেকে দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করায় চক্রটি। এরপর শুরু হয় টালবাহানা। অনেকটা কইয়ের তেলে কই ভাজার মতো অবস্থা।

বগুড়ার শাজাহানপুর এলাকার রুবেল হাসান বিদেশে থাকতেন। দেশে ফিরে এই চক্রের খপ্পরে পড়েন তিনি। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু টাকা নিয়ে সবে দেশে ফিরেছি। রাজিব হাসান অপু নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ডেইলি বিক্রয় হাটে দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করি। পাশাপাশি বেশ কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনকেও জয়েন করাই। প্রথম মাসে আমার টাকা থেকেই কিছু টাকা আমাকে কমিশন হিসেবে দেয়। পরের মাস থেকে আর কম্পানিটির অ্যাপস কাজ করছে না। এরপর আর ওদের খোঁজই নেই। এখন আমার এলাকায় যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজিব হাসান অপুর বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া এলাকায়। অপু নিজেও প্রতারিত হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘পল্টনে একদিন নোয়াখালীর হানিফ রাজু নামের এক মুদি দোকানদার জানান, অ্যাপসভিত্তিক

Daily Bikroy Hat নামে একটি নতুন কম্পানি এসেছে। ডেসটিনির সাবেক ট্রেইনার আমিনুল ইসলাম হৃদয় ওই কম্পানির মালিক। সেখানে টাকা বিনিয়োগ করলে অনেক মুনাফা অর্জন করা যাবে। দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যাবে। দোকানির কথা শুনে তাঁর সঙ্গে আমি ওই কম্পানির পল্টনের অফিসে যাই। সেখানে গেলে আমিনুল ইসলাম হৃদয় আমাকে লোভনীয় অফার দিয়ে তাঁদের সঙ্গে জয়েন করতে বলেন। জয়েন করার পর প্রথম প্রথম স্পট বোনাস, ম্যাচিং বোনাস, রেফারেন্স বোনাস মিলিয়ে ভালোই ইনকাম হতো। ফলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে প্রায় ৫০ জনকে ন্যূনতম এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা দিয়ে জয়েন করাই।’

অপু আরো বলেন, ‘তারা আমাকে সাবান, শ্যাম্পু, হারপিক, পাখাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের স্যাম্পল দেখিয়ে অর্ডার নিয়েছিল। পরে পণ্যগুলো চাইলে হৃদয় জানান, এগুলো দেখানোর জন্য, নেওয়ার জন্য না। তবে জমা টাকার চক্রবৃদ্ধি হারে মুনাফা পাওয়া যাবে। শুরুতে মুনাফা দিলেও যখন বেশি টাকা ইনভেস্ট করে ফেলি তখন তারা বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখায়। এরপর অফিস ও অ্যাপসও বন্ধ করে দেয়। করোনা শুরুর পর থেকে তাদের আর পাওয়া যাচ্ছে না।’

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ‘ডেইলি বিক্রয় হাট’ কম্পানির নামে প্রতারণার প্রধান হোতা আমিনুল ইসলাম হৃদয়। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হৃদয় ২০১২ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন। ওই সময় তিনি এমএলএম কম্পানি ডেসটিনিতে যোগ দেন। পরে ডেসটিনিসহ বেশ কটি এমএলএম কম্পানিতে ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেন। ২০১৫ সালে আর্থিক সংকটে পড়লে এক খ্রিস্টান মেয়েকে বিয়ে করেন। ওই মেয়ের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়ে তাঁকে তালাক দিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় করা মামলার পলাতক আসামি হৃদয়। পরে তিনি আরেকটি বিয়ে করেন।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, হৃদয় তাঁর ছোট ভাই এইচ এম আতিককে দিয়ে প্রতারণার সব কাজ করিয়ে নেন। আতিককে একটি ভুয়া আইটি ফার্মের ডিরেক্টর করা হয়। এসব বিষয়ে কথা বলতে ওই অফিসে গিয়ে দেখা যায় সেটি তালাবদ্ধ।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে আমিনুল ইসলাম হৃদয় বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হচ্ছে এসব মিথ্যা। করোনার কারণে কম্পানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যার জন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে না।’

এসব বিষয়ে র‌্যাব মিডিয়া উইংয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে যখন কোনো ভুক্তভোগী থানায় মামলা করেন তখন আমরা গোয়েন্দা ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করি। অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’



সাতদিনের সেরা