kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

আশা জাগাতে পারছে না বিএনপি

কর্মকৌশল নিয়ে অস্পষ্টতা

এনাম আবেদীন   

৩১ জুলাই, ২০২১ ০৩:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আশা জাগাতে পারছে না বিএনপি

প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতার বাইরে আছে বিএনপি। আর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র দুই বছর। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও মানুষের মধ্যে আশা জাগানোর মতো পরিস্থিতি বিএনপি এখনো তৈরি করতে পারছে না। বরং দলটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যেও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁরা বলছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই কেবল বিএনপির ভবিষ্যৎ আছে। তবে সেই নির্বাচন আদায় করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চাপে ফেলতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচনে সরকার আগ্রহী হবে না এমনটি তাঁরাও মনে করেন। কিন্তু চাপে ফেলতে হলে যা যা করণীয় সেই কর্মকৌশল প্রণয়নের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট থাকায় সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়নি। তাঁরা বলছেন, নির্বাচনের আর মাত্র দুই বছর বাকি থাকলেও বিএনপির ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিএনপিকে কাছে টানছে এমন বার্তাও তাঁদের কাছে নেই। আবার আন্দোলনের ‘সক্ষমতা’ নিয়েও প্রশ্ন আছে। বলা হচ্ছে, আন্দোলন করে বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলা বেশ কঠিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিএনপি কি একলা চলবে, নাকি সরকারবিরোধী সব দলকে কাছে টেনে ঐক্য গড়ে তুলবে, সেই রাজনীতিও এখনো ঠিক করতে পারেনি দলটি। জামায়াত ও ইসলামপন্থী কিছু দল এখনো বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকায় কেউ কেউ বিএনপিকে কিছুটা ডান ঘেঁষা বলে মনে করেন। তাই ওই পরিচয় ঘোচাতে উদার ও বামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। কিন্তু উদারপন্থী জোট গঠন করতে হলে জামায়াতকে জোট থেকে বিদায় করতে হবে। অনেকের মতে, জামায়াত নিয়ে চলতে চাইলে সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট করে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত। কারণ সেটিও একটি রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় বিএনপি এখন কোন দিকে সেটিও জনমনে যেমন অস্পষ্ট, তেমনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অকার্যকর হয়ে পড়ায় উদারপন্থী দলগুলোর মধ্যেও বিএনপিকে নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আবার নতুন জোট গঠনের তৎপরতাও দলটি শুরু করতে পারেনি।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, ‘ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে বিএনপির কোনো পরিকল্পনা নেই।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মাত্র দুই বছর বাকি থাকলেও বিএনপি এখনো ঘুমিয়ে আছে। এ কারণে দেশের জনগণ মনে করছে বিএনপি কিছু পারবে না।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন না হয় বুঝলাম তারা শেষ বছরে করবে। কিন্তু জোট গঠন ও রাজনীতি এটা তো তারা শুরু করতে পারে। অথচ তারা বসে আছে সব কিছু শেষ বছরে করবে। আসলে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তারা কিছুই করতে পারবে না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘জনসমর্থনের হিসাব-নিকাশে বিএনপি এখনো ফ্যাক্টর হলেও দলটির নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা রয়েছে। ফলে বিএনপিকে বিকল্প শক্তি ভেবে মানুষ আশাবাদী হতে পারছে না।’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সরকারের দমন-পীড়ন ও হামলা-মামলায় বিএনপি চাপে আছে এটি সত্যি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সঠিক কর্মকৌশল প্রণয়ন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায়ও দলটি পিছিয়ে আছে। সবচেয়ে বড় কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মন বিএনপি এখনো গলাতে পারেনি।’

জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে ধারাবাহিক বৈঠক করে দল কিভাবে অগ্রসর হবে তার একটি রোডম্যাপ তৈরির চেষ্টা করেছে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। ওই আলোচনায় জামায়াত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রসঙ্গ ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ওই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়ন দূরে থাক; স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজনীতি নিয়ে আলোচনাই এখন থেমে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোডম্যাপ তৈরির ওই আলোচনায় দলের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০০ আসনের জন্য ৩০০ কমান্ডার বা নেতা ঠিক করার প্রস্তাব করেছিলেন। আসনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি তাঁদের মাধ্যমেই আন্দোলন পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল ওই প্রস্তাবে। তবে ওই প্রস্তাবের সঙ্গে ঢাকায় বা কেন্দ্রেও একজন নেতা থাকা দরকার বলে মত দিয়েছিলেন দলটির প্রয়াত নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। কিন্তু ওই ঘটনার পরই সব আলোচনা থেমে যায়। অনেকের সন্দেহ, কেন্দ্রে নেতা ঠিক করার প্রস্তাব ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পছন্দ না হওয়ায় রাজনীতি নিয়ে আলোচনাই থেমে গেছে। আর এভাবেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক কার্যত ‘ঝুলে’ গেছে। সূত্র মতে, এখন কেবল করোনাসহ সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু আলোচনার পর ওই ইস্যুতে দলের পক্ষ থেকে নিয়মিত ব্রিফিং করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখন আর স্থায়ী কমিটিতে হচ্ছে না। ফলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতাদের তারেক রহমান বিশ্বাস করেন কি না, এমন প্রশ্ন উঠেছে সদস্যদের মধ্যে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য মনে করেন, ‘দেশ পরিচালনায় সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতার কারণেই মানুষ বিএনপিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে। কারণ বিএনপি অতীতে সুশাসন দিতে পেরেছে। বিকল্প হিসেবে তাঁরা বিএনপিকেই দেখেন।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, ‘জনগণ ভোট দিতে পারলে বিএনপিকে নিয়ে আশা আছে এটি দেশবাসী যেমন জানে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানেন। তবে ভোট দেওয়ার এই প্রক্রিয়া ছলচাতুরী করে সরকার আটকে রেখেছে। তাই আমি মনে করি দেশের জনগণের চেতনাও জাগ্রত হতে হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না অবশ্য মনে করেন, ‘অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে বিএনপি হতাশা তৈরি করছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আশা সৃষ্টির মতো চেষ্টাও দলটি করছে বলে মনে হয় না।’



সাতদিনের সেরা