kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তিন বছর

মামলার বোঝা হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা

সজিব ঘোষ   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০৩:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মামলার বোঝা হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা

তিন বছর আগের এই দিনে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই রাজধানীতে আন্দোলনের সূত্রপাত, যা পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ওই আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর ‘হেলমেট বাহিনী’র হামলার ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও করা হয়। হামলার ক্ষত ও মামলার বোঝা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই এখনো ধুঁকছে।

জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে চাপা পড়ে দুই শিক্ষার্থী দিয়া ও রাজীব নিহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ঢাকার জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সরকার সমর্থকরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ অর্ধশতাধিক মামলায় প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরে অবশ্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আশ্বাসে সড়ক থেকে শ্রেণিকক্ষে ফেরে শিক্ষার্থীরা।

দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নিম্ন আদালত ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজনকে খালাস দেন। বর্তমানে আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন।

ওই আন্দোলনের মুখে তড়িঘড়ি করে ওই বছরই সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়। যদিও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের আগেই সেই আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওই আন্দোলনের সময় হামলার শিকার হন তামিম আহমেদ তুরাগ। তিনি তখন বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। জিগাতলা এলাকায় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যতম তিনি। তিনি এখনো পায়ে ভর দিয়ে বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না।

পুলিশের ঝামেলা আর শারীরিক যন্ত্রণায় শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাটাই শেষ করতে পারেননি জানিয়ে তুরাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, “সেদিনের হামলায় আমার পায়ের টিস্যু নষ্ট হয়ে গেছে। হাঁটতে পারি না। আমাকে বুট দিয়ে লাথি দিচ্ছিল আর বলতে বলছিল, ‘বল, তুই শিবির।’ আমি তবু বলি নাই। ওই দিনের ঘটনা এই জীবনে ভোলা সম্ভব না। এই ক্ষত আর কত দিন বয়ে বেড়াতে হবে তা-ও জানি না।”

আন্দোলনের চতুর্থ দিন মারুফ হোসেনসহ আরো কয়েকজনকে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ওই রাতেই তাদের মধ্য থেকে মারুফসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। করোনায় আদালত বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মিত হাজিরা দিতে হতো তাঁকে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মামলা কবে শেষ হবে জানি না। শুধু হয়রানি করার জন্যই মামলা করা হয়েছে। ছয় মাসের জন্য মামলা স্থগিত ছিল। এখন করোনার জন্য সেটা বর্ধিত হচ্ছে।’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে ৯টি মামলার আসামি হয়েছেন ঢাকার তারেক আজিজ। এখনো তাঁকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়। তিনি বলেন, ‘এসব মামলার কোনো ভিত্তি নাই। তবু ভয় দেখানোর জন্য মামলাগুলো দিয়ে রেখেছে। দেশে অন্য কোনো আন্দোলন হলেও আমার পরিবার আতঙ্কিত থাকে। আমার নিজেরও গুমের ভয় কাজ করে। সরকার চাইলেই মামলাগুলো প্রত্যাহার হবে।’

মামলার আসামি কয়েকজন শিক্ষার্থীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলাগুলো এমনভাবে করা হয়েছে, যেখানে পরিষ্কারভাবে কোনো অপরাধ উল্লেখ করা নেই। সেগুলো তদন্ত করে যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এমন কিছু নেই। তিনি মনে করেন, মামলার মূল উদ্দেশ্যটাই ছিল ফৌজদারিব্যবস্থা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করা। যেহেতু একরকমের শায়েস্তা করা হয়ে গেছে সে জন্য কারোরই আসলে গরজ নেই মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি দেখা কিংবা আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আসলে এগুলো যত দিন ঝুলিয়ে রাখা যায় তত দিন ভয় দেখানোটা চালিয়ে রাখা যায়। এই উদ্দেশ্যেই মামলাগুলো এখনো শেষ করা হয়নি বলে তাঁর ধারণা।

আন্দোলনের পর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ) নামের একটি সংগঠন তৈরি করা হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ মেহেদি দীপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হামলা-মামলার শিকার হওয়ায় অনেকেই এখন কথা বলতে ভয় পায়। কথা বললে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকে। যারা চুপচাপ আছে, তাদের অনেকেই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। আন্দোলনে আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় অনেকেই এখনো গুরুতর আহত। অর্থকষ্টে তারা সঠিক চিকিৎসাও করাতে পারছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। এই দিনটা নিয়ে আমাদের অনেক ভাবনা ছিল। এখন অনলাইনের বাইরে কিছুই করা যাচ্ছে না। তবু বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মতো বিষয় নিয়ে অনলাইনে তিন দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।’

আন্দোলনের মুখে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এ বেশ কিছু সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে কমানো হচ্ছে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পরিমাণ। একই সঙ্গে অজামিনযোগ্য অপরাধকে আনা হচ্ছে জামিনের আওতায়। এতে দুর্ঘটনায় কাউকে নিহত করা ছাড়া সব ধরনের অপরাধ জামিনযোগ্য হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে ২৯টি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি ধারায় বিদ্যমান কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড কমানো হচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তখন আন্দোলন থামাতে লোক দেখানোর জন্যই আইন করা হয়েছিল। এখন সব বড় বড় শাস্তি কমিয়ে আইন সংশোধন করা হচ্ছে।’



সাতদিনের সেরা