kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

মানুষ বাঁচাতে নতুন কৌশলের তাগাদা

ফারজানা লাবনী   

২৮ জুলাই, ২০২১ ০২:৫৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষ বাঁচাতে নতুন কৌশলের তাগাদা

কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে করোনায় আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবার, করোনায় কাজ হারানো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা বয়স্ক মানুষদের বাসাবাড়িতে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে একটি স্বেচ্ছাসেবকদলের সঙ্গে কাজ করছেন সেখানে বসবাসরত বাংলদেশি তরুণী ফাতেমা তাবাসুম। মোবাইল ফোনে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় সংকটে থাকা মানুষকে সহযোগিতা করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই দলে যোগ দিয়েছে। অনেকে সারা দিন অফিস করে সন্ধ্যা থেকে আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। এতে সরকারের ওপর চাপ কমেছে। করোনায় বিপর্যস্ত মানুষ ভালো থাকছে।’

এ অবস্থায় বাংলাদেশেও করোনায় সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের কষ্ট কমাতে বিশেষজ্ঞদের অনেকে পাড়া-মহল্লায় কাজ করতে স্বেচ্ছাসেবকদল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য, শিক্ষার্থীসহ আগ্রহী সাধারণ মানুষ এই দলে থাকবে। স্বেচ্ছাসেবকরা খাদ্য, চিকিৎসাসহ সরকারি-বেসরকারি সহায়তাসামগ্রী সংকটে পড়া মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেবে। আর এসব কার্যক্রম তদারকিতে থাকবেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনায় আর্থিক সংকটে থাকা মানুষকে ভালো রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। সে ক্ষেত্রে অল্প আয়ের চার কোটি পরিবারকে এক বছর নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা প্রদান, দ্রুততার সঙ্গে টিকা প্রদান নিশ্চিত করা, শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের জন্য মালিকদের পক্ষ থেকে নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা রাখা, সরকারি বড় প্রকল্প ও কম গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটা আপাতত স্থগিত রেখে বা ব্যয় কমিয়ে করোনা মোকাবেলায় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা, টিসিবির পণ্যের দাম আরো কমিয়ে সরবরাহ বাড়ানো কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। করোনা মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর কথাও বলছেন তাঁরা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে দেশে টানা ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন চলছে। প্রথমবারের মতো প্রায় সব খাতের কলকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। দিনমজুর, গণপরিবহনকর্মী ও দোকানকর্মীরা কাজ হারিয়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের বেশির ভাগ ব্যবসায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ভয়াবহ বিপাকে পড়েছে। সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তাই তারা পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতেও বাড়িভাড়া, স্কুল-কলেজের ফি, চিকিৎসা ব্যয়, পানি ও বিদ্যুতের খরচ সবই নির্দিষ্ট সময়ে কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। লকডাউনে গণপরিবহন না থাকায় যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে দুই থেকে তিন গুণ।

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংস্থা, সিপিডি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ভিন্ন ভিন্ন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ৪৮.৪৯ শতাংশ পরিবার থেকে অন্তত একজন কাজ হারিয়েছেন বা কাজ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কাজ হারিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে শহরের ৭৩.৩ শতাংশ এবং গ্রামের ৯২.৫ শতাংশ মানুষ। শহরে অস্থায়ীভাবে বসবাসরত ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাদের বেশির ভাগ গ্রামে গিয়েও কাজ পায়নি। করোনার কারণে ৭৬ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে। মাসে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করে এমন ৬৮ শতাংশ এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করে এমন ৭৩ শতাংশ ব্যক্তির আয় কমেছে। শ্রমজীবী মানুষ বেশি আর্থিক সংকটে পড়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে দেশে নতুন করে প্রায় দুই কোটি মানুষ গরিব হয়েছে। করোনার প্রকোপ না কমলে এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকবে। এই পরিস্থিতিতে লকডাউনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সরকারকে নিজের সক্ষমতা কম থাকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানুষের জীবন-জীবিকা সচল রাখতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। এই কাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। হাতে গোনা কিছু বিত্তশালী সহায়তার হাত বাড়ালেও সামর্থ্যবান বেশির ভাগ মানুষই এগিয়ে আসছেন না। ধনীরা যাতে এগিয়ে আসেন সে লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের ব্যবসায় বিভিন্ন নীতি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া যেতে পারে।’ 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘করোনা মহামারিতে অনেকে চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। অনেকে খাবারের কষ্টে আছে। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। এসব মানুষকে বাঁচাতে এখনই সরকারকে কিছু কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে। ঘরে ঘরে খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিতে সরকারের সঙ্গে আগ্রহী সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব কাজে দুর্নীতি এড়াতে কঠোর নজরদারি করতে হবে। 

গত বছরের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর এপ্রিল-মে মাসে এক লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও এসব কার্যক্রম চলমান। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযোগ পাওয়া যায় যে বড়মাপের ব্যবসায়ীরা সরকারের দেওয়া সুবিধা পেলেও কম আয়ের ও সাধারণ মানুষের বেশির ভাগের ভাগ্যে এসব জুটছে না। তাই এখনই সরকারকে নতুন কৌশল নিয়ে মানুষ বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে।



সাতদিনের সেরা