kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

নির্বাচন স্থগিতে ইসিরও অস্বস্তি কেটেছে

► নির্বাচনী এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া
► সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভোটগ্রহণের তারিখ পুনর্নির্ধারণ হতে পারে

কাজী হাফিজ    

২৭ জুলাই, ২০২১ ০৩:৫৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নির্বাচন স্থগিতে ইসিরও অস্বস্তি কেটেছে

হাইকোর্টের নির্দেশে সিলেট-৩ আসনের নির্বাচন আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনী এলাকার অনেক ভোটারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরও (ইসি) অস্বস্তি কেটেছে। আবার মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনাররা এখন বলছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালত থেকে আর কোনো আদেশ না পেলে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে পারে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ইসির বিবেচনায় শোকের মাস হওয়ায় আগস্টে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম গতকাল সোমবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার ভয়াবহ সংক্রমণে দেশে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। নির্বাচন কর্মকর্তারাও এর শিকার। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি অস্বস্তির। আদালতের স্থগিতাদেশের কপি এখনো আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। তবে সংবাদমাধ্যম থেকে যেটা জেনেছি তা হচ্ছে—৯ দিনের জন্য এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত মত, এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি চলমান থাকা পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতের কোনো নির্দেশনা পেলে সেটা আরো স্বস্তিকর হতো।’ তিনি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ অনেক কিছু থেকে হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে কেউ এই সংক্রমণের শিকার হলে তার দায়ভার নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তাতে পারে।

৫ আগস্টের পর আগস্ট মাসের যেকোনো দিন কি এই নির্বাচন হতে পারে—এ প্রশ্নে রফিকুল ইসলাম বলেন, আগস্ট মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নানা ধরনের সমস্যা আছে। শোকের মাস হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এই মাসে নানা কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ থাকে। সেসব কর্মসূচি নির্বাচনী প্রচারের কাজে ব্যবহার হলে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে সংকট তৈরি করে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন এ মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠান এড়াতে চায়। এ অবস্থায় করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালতের নতুন কোনো নির্দেশনা না পেলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই নির্বাচন হতে পারে। আদালতের রায়ের কপি পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

অন্য নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার করণেই করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন আগামী ২৮ জুলাই সিলেট-৩ আসনে ভোটগ্রহণ করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। এই আসনের সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণসহ সব প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন তা প্রতিপালনে আমরা বাধ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই নির্বাচন সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে করা যেতে পারে। দৈবদুর্বিপাকের কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান প্রদত্ত নিজ ক্ষমতাবলে এই নির্বাচনের জন্য সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অতিরিক্ত ৯০ দিনের সময় নিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে পারে।

গত ১১ মার্চ সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। ৯০ দিন অর্থাৎ ৮ জুনের মধ্যে ওই আসনের উপনির্বাচনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংবিধানের ক্ষমতাবলে করোনাভাইরাস সংক্রমণকে দৈবদুর্বিপাক হিসেবে উল্লেখ করে আরো ৯০ দিন বাড়িয়ে নেন সিইসি। এরপর গত ২ জুন ওই উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এই তফসিলে ১৪ জুলাই ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইসি ১৫ জুন পৃথক এক নোটিশে ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করে ২৮ জুলাই।

২৮ জুলাই সিলেট-৩ আসন ছাড়াও কুমিল্লা-৫ ও ঢাকা-১৪ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কুমিল্লা-৫ ও ঢাকা-১৪ আসনে প্রতিপক্ষরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। গত ১ জুলাই তাঁদের শপথগ্রহণও সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে কালের কণ্ঠ’র সিলেট অফিস জানায়, প্রায় শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনী এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাধারণ ভোটারদের অনেকে মনে করছেন করোনা সংক্রমণের এই সময়ে এটি হওয়া দরকার ছিল। আবার কেউ বলছেন, নির্বাচনের প্রচারকাজ, সভা, মিছিলে সংক্রমণ ছড়ায় বেশি। তাই আরো আগে এমন সিদ্ধান্ত আসা উচিত ছিল। কারণ করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বিশাল জনসভা, শোডাউন এসবে সংক্রমণ যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন বরং ভোট পেছালে আবারও প্রচারের সুযোগ তৈরি হবে। সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সারকারখানা এলাকার বাসিন্দা ছমছু মিয়া বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন হলে সংক্রমণ বাড়বে। নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্তে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।’ একই কথা দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ব্যবসায়ী মনসুর হোসেনের। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এটা আরো আগে করা উচিত ছিল।’

বালাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কনিষ্ঠ সদস্য শাহ আলম সজিব তাঁর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনের কাছে করোনা পৌঁছে দিয়ে ভোটগ্রহণের দুই দিন আগে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।’

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ভোটের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। যে গণজোয়ার দেখেছি, তাতে মানুষের রায় আমাদের পক্ষে থাকবে। এ রকম সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রচারকাজের শুরুতে এলে বরং ভালো হতো।’

বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লিয়াকত শাহ ফরিদী বলেন, ‘জনমানুষকে রক্ষার্থে নিশ্চয়ই আদালত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত আরো এক সপ্তাহ বা পনের দিন আগে এলে আরো উপকার হতো। নির্বাচনের প্রচার শেষ, এ রকম সময় এমন সিদ্ধান্ত এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনা খুব তাড়াতাড়ি নিশ্চিহ্ন হবে না। ফলে পরবর্তীতে আবার যখন ভোটের দিন নির্ধারিত হবে আবারও প্রচারকাজের সুযোগ হবে। এতে দ্বিতীয় দফা করোনা সংক্রমণের শঙ্কা থাকবে।’

সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘আদালতের সিদ্ধান্তকে অবশ্যই আমরা সম্মান জানাই।’ একই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘দেড় মাস ধরে মাঠে-ময়দানে কাজ করেছি। যতটা পেরেছি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজ করেছি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও সিলেট এসেছিলেন। প্রচার শেষে নেতাকর্মী ও ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত হতাশার। তিনি বলেন, ‘আইনজীবী যাঁরা এই রিট করেছেন তাঁদের আরো আগে এটা করা উচিত ছিল।’ 



সাতদিনের সেরা