kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

হাজারে শাস্তি চারজনের সহজেই মিলছে জামিন

ফাতিমা তুজ জোহরা   

২৬ জুলাই, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাজারে শাস্তি চারজনের সহজেই মিলছে জামিন

২০১৯ সালে কুড়িগ্রামে ধর্ষণের শিকার এক স্কুলছাত্রী (১৪) অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী মেয়েটির দরিদ্র পরিবার মামলা করলেও স্থানীয়ভাবে চাপে পড়ে মিটমাটে রাজি হয়। সালিসের মাধ্যমে চল্লিশোর্ধ্ব আসামির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় মেয়েটির। বিয়ের এক বছরের মাথায় বাচ্চাসহ মেয়েটিকে ফিরতে হয় বাবার বাড়িতে। তালাক দেওয়া হয় তাকে।

এভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপে ধর্ষণের মামলা তুলে নেওয়ার ঘটনা নেহাত কম নয় বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে গড়ে ১০০টি ঘটনার মধ্যে ১০টির ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগী নারী বা তার পরিবার মামলা করতে রাজি হয় না। আর যা-ও বা মামলা করা হয়, সেগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এর মধ্যে জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীসহ তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে আসামি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক জরিপ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টা থেকে ১৫ দিনের মধ্যে জামিন পাচ্ছে ধর্ষণ মামলার আসামিরা।

কুড়িগ্রামে ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নিপীড়নসংক্রান্ত দুই হাজার ১০২টি মামলা করা হয়েছে। এত মামলায় সাক্ষী মাত্র ১২ জন। একজন আসামিও শাস্তি পায়নি। নিষ্পত্তি হয়েছে আটটি মামলা।

স্থানীয়ভাবে ধর্ষণসহ যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন কুড়িগ্রামের মাহিদেব যুব কল্যাণ সমিতির সমন্বয়ক ইসফাতুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ১৮ বছরের কর্মজীবনে কোনো আসামির (ধর্ষণ মামলার) শাস্তি হতে দেখিনি। আমরা এ যাবৎ যত মামলা লড়েছি, সেগুলোও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের চাপে তুলে নেওয়া হয়।’

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা স্কুলছাত্রীর দুর্দশা সম্পর্কে তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার রায় হওয়ার কথা। আসামি সময়মতো শাস্তি পেলে এমন দুর্বিষহ জীবন হতো না মেয়েটির। তার গল্পটা অন্য রকম হতে পারত। আক্ষেপ ঝরে পড়ে তাঁর গলায়।

ইসফাতুল কবির আরো বলেন, মামলা করবে কী, বিচারই তো পায় না। সালিস হলে তা-ও কিছু টাকা পায় ভুক্তভোগীর পরিবার। আদালতে গিয়ে মামলার অগ্রগতিও জানা যায় না; কেউ গুরুত্বই দেয় না, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা জানান তিনি।

কুড়িগ্রামের মতো দেশের অন্য সব জেলার চিত্র প্রায় অভিন্ন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে ৩০ হাজার ২৭২টি ধর্ষণ মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে চার হাজার ৬৯৫টি, ২০১৯ সালে ছয় হাজার ৭৬৬টি এবং ২০২০ সালে ছয় হাজার ২২০টি মামলা করা হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৩.৬৬ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। মোট ৪৬ জেলার ৫৪টি ট্রাইব্যুনালে এক লাখ ৪১ হাজার ১৮৭টি মামলা বিচারাধীন। ট্রাইব্যুনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে হাজারে শাস্তি পেয়েছে চারজন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৬৭ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৭২২ জন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডাব্লিউএলএ) বলছে, দেশে ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় মামলা হচ্ছে ১০ শতাংশেরও কম। ধর্ষণের ঘটনায় শাস্তির চিত্র আরো শোচনীয়।

২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫৩৬টি ধর্ষণের মামলার তদারকি করেছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। এর মধ্যে বিচার হয়েছে মাত্র চারটির। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের দ্বারস্থ হয় ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার ২২ হাজার ৩৮৬ জন। এর মধ্যে ২০ শতাংশ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। রায় ঘোষণার হার ছিল ৩.৬৬ শতাংশ।

এমজেএফ সাতটি সহযোগী সংগঠন নিয়ে দেশের ১০টি জেলার ২৫টি ধর্ষণ মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়ে জরিপ করে গত জানুয়ারি মাসে। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়ের করা এসব মামলার ভুক্তভোগী ছিল প্রতিবন্ধী তিনজন, পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী চারজন, ১১ থেকে ১৫ বছরের পাঁচজন, ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ১৬ জন। এসব মামলার ৩৪ আসামির মধ্যে জামিনে আছে ২৭ জন। দুই আসামি প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাঁচজন পুনরায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে।

এমজেএফ জানায়, গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টা থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার আসামিরা জামিন পাচ্ছে। ২৫টি মামলার মধ্যে দুটি মামলা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। চারটি মামলার নথি পাওয়া যাচ্ছে না। যে ২০টি মামলার চার্জশিট হয়েছে, সেগুলোর ছয় থেকে ২৩ বার শুনানি হয়েছে। একটি মামলার এখনো মেডিকো-লিগ্যাল টেস্ট হয়নি।

নারীপক্ষ, সিআরপি ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদের আওতায় ২০১৪-২০১৫ সালে চার্জশিট হওয়া ৯টি মামলার এখনো রায় হয়নি। পরে ২০১৬-২০১৭ সালে চার্জশিট হওয়া ১২টি মামলার রায়ও হয়নি এখনো। আর তিনটি মামলায় এখনো অভিযোগপত্রই দাখিল করা হয়নি। সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেশির ভাগ মামলার সাক্ষী হাজির না হওয়ায় তারিখ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। অভিভাবকরাও হতাশ হয়ে আর কোর্টে যেতে চাইছেন না। দরিদ্র অভিভাবকদের আর্থিক অনটন তো রয়েছেই।

মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী মনে করেন, পার্লামেন্টে-মিডিয়াতে প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণ মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি জানতে চাইলে, শাস্তির নির্দেশ দিলে সবাই তৎপর হবে। সংগঠনগুলো বলতে বলতে হতাশ। তিনি বলেন, বিচার পাওয়ার সুযোগ, নারী ও শিশুবান্ধব আইন, নজরদারি ব্যবস্থা, বিচারের রায় ও শাস্তির বিধান না হওয়া পর্যন্ত যত আইনই হোক না কেন, কিছুই হবে না। শাসকগোষ্ঠীর নজরদারি, শূন্য সহনশীলতা, সততা-স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার হাজার ৫৪১টি ধর্ষণের মামলার মধ্যে শুধু ৬০ জন আসামি শাস্তি পায়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।



সাতদিনের সেরা