kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

নির্দেশনা মানছে না ডাক ও কুরিয়ার

এস এম আজাদ   

২৪ জুলাই, ২০২১ ০৩:১৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নির্দেশনা মানছে না ডাক ও কুরিয়ার

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি প্যাকেট থেকে ৩৫০টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয় গত ১৯ মে। এই প্যাকেট ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছিল সৌদি আরব। অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তদন্তে জানা গেছে, গাজীপুর পোস্ট অফিস থেকে পার্সেলটি পাঠানো হয়। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রেরকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ছবি রাখা হয়নি। তদন্তকারীরা পার্সেলের ভেতরে মাদকপাচারের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এক যুবক ও এক নারীকে গ্রেপ্তার করে ডাক বিভাগের এক কর্মীরও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পান। তাঁরা পার্সেলে জিনিসপত্রের সঙ্গে লুকিয়ে, এমনকি লাগেজে আচারের বয়ামে কয়েকটি ছোট ইয়াবার চালান সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন।

গত ৬ জুন র‌্যাব একযোগে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ডন চেম্বার মোড়ের এসএ পরিবহনের পার্সেলবাহী গাড়ি ও ঢাকার মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের জননী এক্সপ্রেস পার্সেল সার্ভিসের গাড়ি থেকে এক কেজি ৪৫০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করে। এসব পার্সেল প্রেরণকারীরও এনআইডি ও ছবি রাখেনি কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। তদন্ত করে শাহাবুল হাসান নামের সিরাজগঞ্জের এক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, এই ব্যক্তি এমন একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত, যারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সীমান্ত এলাকা থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলে করে হেরোইনের চালান এনে ঢাকা ও আশপাশে বিক্রি করে।

গত ১৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা তদন্তে পুলিশ লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথাইলামাইড (এলএসডি) নামের নতুন এক মাদকদ্রব্যের কারবারের তথ্য পায়। আটজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের তদন্তকারীরা তথ্য পান, আনলাইনে যোগাযোগের পর নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে পার্সেলে এলএসডির চালান দেশে আসছে। এ ছাড়া গত ২৬ জুন ডাইমিথাইল ট্রিপটামিন (ডিএমটি) নামের নতুন ধরনের আরেকটি মাদকদ্রব্য জব্দ করে র‌্যাব। এই বাহিনী তদন্ত করে জানায়, কানাডা ও থাইল্যান্ড থেকে কুরিয়ারে পাঠানো বইয়ের পার্সেলে লুকিয়ে আনা হচ্ছে এটি।

এই তিনটি ঘটনার তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলের ভেতরে লুকিয়ে মাদকের চালান আনা-নেওয়া চলছে। নির্দেশনা থাকলেও প্রেরক বা প্রাপকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ছবি রাখছে না সরকারি ডাক বিভাগ কিংবা বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান। তারা যে নির্দেশনা মানছে না সেটাও নজরে নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে মাদক কারবারিরা কুরিয়ার সার্ভিস ও ডাক বিভাগের মাধ্যমে পার্সেলের ভেতর লুকিয়ে মাদক পাচার করে আসছে—বিষয়টি নজরে আসার পর সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এটি ঠেকাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে দেশে প্রথম গঠিত হয় জাতীয় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটি। গত ২৭ ডিসেম্বর এই কমিটির সভায় পার্সেলের ভেতর লুকিয়ে মাদকপাচারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। ওই সভায় ১৭টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, মাদকপাচারকারীকে শনাক্তে সব পার্সেলেই প্রেরকের এনআইডির কপি ও ছবি দিতে হবে। বিমানবন্দর ও অন্যান্য বন্দরে উন্নত প্রযুক্তির স্ক্যানার ও ডগ স্কোয়াড রাখার ব্যাপারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া অবৈধ কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারিতে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে একটি সুপারিশ করে। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে গত ২ মার্চ ডাক অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠায়।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাক অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও বেসরকারি ছয় শতাধিক কুরিয়ার সার্ভিস এই নির্দেশনা মানছে না। এসব প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো কর্তৃপক্ষের নজরদারি। গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারির মাধ্যমেই কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেলে লুকিয়ে পাঠানো মাদকের চালান ধরছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

যদিও বৈধ কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বলছেন, এনআইডিও ভুয়া হতে পারে। এ কারণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ন্যাশনাল সার্ভারের মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চাইছেন তাঁরা। এ ছাড়া কুরিয়ার সার্ভিসে স্ক্যানার মেশিন স্থাপনেও সরকারি সহায়তা চান তাঁরা।

ডিএনসির সদ্যোবিদায়ি মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো পার্সেলের ভেতরে মাদকদ্রব্য শুধু যে দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে তা নয়, বিদেশ থেকে আসছেও। আমরা খাত ধরেছি। কোকেন ধরেছি। এবার এলএসডি, আইস ধরা পড়ছে। এ কারণে বিমানবন্দরে ও কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা ডগ স্কোয়াড গঠনের কাজ শুরু করেছি। তবে বন্দরে অনেক কর্তৃপক্ষ আছে। একটি কাজে অনেকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা দেশ শতাধিক কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করি। এরপর এনআইডি, ছবি রাখা ও পার্সেল পরীক্ষার জন্য নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছি। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের চালান ধরতে পারে। কিন্তু নির্দেশনা তো এই অধিদপ্তর বা কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মানাতে পারে না। এটা ডাক অধিদপ্তরের বিষয়।’

জানতে চাইলে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সিরাজউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্দেশনা পেয়ে আমরাও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দেশনা দিয়েছি। আমাদের ফরেন পোস্ট শাখায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পোস্ট অফিসে প্যাকেট খুলে ভেতরে কী আছে দেখার পর পুনরায় প্যাকেট করার চর্চা আমরা শুরু করছি।’

কিন্তু এ নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। গাজীপুর পোস্ট অফিস থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে পাঠানো পার্সেলের ভেতরে ইয়াবা ধরা পড়েছে, ডাক বিভাগের কর্মী জড়িত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘ওটা আগের ঘটনা। এখন মানছে সবাই।’ বেসরকারি দেশি-বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নির্দেশনা মানছে না—এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কী করছে জানতে চাইলে সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রণালয়ের কুরিয়ার সার্ভিস অথরিটি। সেখানে সদস্যসচিব আমাদের অতিরিক্ত মহাপরিচালক। এ ব্যাপারে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

গত বছরের ৭ ডিসেম্বর জিপিওর ফরেন পোস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে পাচারের সময় ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে পুলিশ। এরপর জানা যায়, জিপিওর স্ক্যানারটি নষ্ট থাকায় কাপড়ের ভেতরে লুকানো এসব ইয়াবা ধরা পড়েনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘এরপর উন্নত মানের স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে। জিপিওতে নজরদারি আরো বাড়ানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ছয় শতাধিক বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সিএসএবি) সদস্য এখন পর্যন্ত মাত্র ৭২টি। এই সংগঠনেরও সবার লাইসেন্স নেই।

সিএসএবির সভাপতি ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্ণধার হাফিজুর রহমান পুলক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এনআইডি ও ছবি বাধ্যতামূলক করার সেই নির্দশনা আসলে কোনো পর্যায়েই মানা হচ্ছে না। আলোচনা হয় কিন্তু বাস্তবায়নে কিছু হয় না। স্ক্যানার বসানো নিয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আমরা সহযোগিতা পাইনি। স্ক্যানার বা এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলেও আমরা আমাদের পয়েন্টে পার্সেল খুলে যাচাই করে আবার প্যাকেট করছি। সিসি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে অনেক সময় মাদকপাচারকারী ধরা পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান আছে লাইসেন্সের বাইরে। তারা মাদক পাচার করলে কে দেখবে?’ সমাধানে কী করা দরকার—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাস্তবসম্মত কার্যক্রম দরকার। ব্যয়বহুল স্ক্যানার স্থাপনে আমাদের সহায়তা করতে হবে। এনআইডির ফটোকপিও ভুয়া হতে পারে। এ কারণে সার্ভারের সঙ্গে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করলে সবচেয়ে ভালো হবে।’

ডিএনসি ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, কুরিয়ারের পার্সেল অনেকটা নজরদারির বাইরে থাকার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। এসএ পরিবহনসহ কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিস তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির নামে হয়রানির অভিযোগ করায় আদালত এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। এ কারণে ঝামেলা এড়াতে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া পার্সেলবাহী গাড়ি বা অফিসে তল্লাশিতে যায় না পুলিশ, র‌্যাব ও ডিএনসি।

অনলাইন ও পার্সেলে মাদক কারবারের ব্যাপারে র‌্যাবের মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নজরদারির মাধ্যমে এমন অপতৎপরতা আমরা ধরছি। ভবিষ্যতেও নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি থাকবে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।’



সাতদিনের সেরা