kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

এখন বড় দুই চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৪ জুলাই, ২০২১ ০২:৩০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এখন বড় দুই চ্যালেঞ্জ

ফাইল ছবি

শঙ্কার মাঝেও ঈদ উদযাপনের পর নতুন মেয়াদে ১৪ দিনের বিধি-নিষেধ বাস্তবায়ন করে সংক্রমণের লাগাম টানা আর গত ৯ দিনে শিথিল চলাফেরায় যারা অজান্তেই আক্রান্ত হয়েছে, সামনে তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে আক্রান্তদের মধ্যে যাদের হাসপাতালে যেতে হবে—সেই চাপ কতটা সামাল দিতে পারবে তা নিয়ে সংশয়ে আছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

দেশ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অবস্থায় ঈদের জন্য কঠোর বিধি-নিষেধ ৯ দিন শিথিল করা হয়। এরপর পূর্বঘোষিত নির্দেশনা অনুসারেই গতকাল শুক্রবার থেকে আবার কঠোর বিধি-নিষেধ শুরু হয়েছে। মাঝের দিনগুলোর ভেতর যে কদিন সরকারি বন্ধ ছিল, সে দিনগুলোতে নমুনা সংগ্রহ কম হওয়ায় শনাক্তও কম হয়েছে, তবে শনাক্ত হার আগের চেয়েও বেশি ছিল।

অন্যদিকে আগেই বিশেষজ্ঞরা ঈদ-পরবর্তী সংক্রমণের আরেক ধাপ ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কা জানিয়ে রেখেছেন। ঈদ আয়োজনে বিধি-নিষেধ শিথিল থাকা পুরো সময়ে পশুর হাট থেকে শুরু করে গ্রামমুখী মানুষের ঢলে, পরিবহনে, শপিং মল বা পথেঘাটে তেমনভাবে ছিল না স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মিলিয়ে আগের দফায় ১৪ দিন লকডাউনের পুরো মেয়াদ কার্যকরভাবে শেষ করা যায়নি। বিশেষ করে শেষের তিন-চার দিন বেশ ঢিলেঢালা ছিল পরিবেশ। আবার যে কদিন ভালো ও কার্যকর ছিল, তার সুফল বুঝতে না বুঝতেই শিথিল মেয়াদের আওতায় স্বাভাবিক হয়ে পড়ে সব কিছু।

গতকাল থেকে শুরু হওয়া লকডাউন যাতে আবার ঢিলেঢালা হয়ে না পড়ে, সেদিকে সরকারের কঠোর নজরদারি থাকবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের ২৩ দফা নির্দেশনা যাতে পুরোপরি কার্যকর হয় সেটাই চান বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি এই লকডাউনের ফলে দুর্ভোগে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা দিতে প্রয়োজনমতো সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজভিত্তিক সব মহলকে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার গতি আরো বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপদেষ্টা ও রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজীবন যেমন সব কিছু বন্ধ করে রাখা যাবে না, আবার যখন সংক্রমণ বেড়ে যাবে তখন সেটা যেকোনো পদ্ধতিতেই হোক দমন করতেই হবে। এভাবেই এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। সেদিকে নজর রেখে আমরা যে পরিস্থিতি কাটিয়ে এলাম তার ভিত্তিতে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি হচ্ছে রাজধানী থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি টিম মাঠে নামানো। যেমনটা আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষকে উদ্ধার করে আর আগুনও নেভায়, তেমনিভাবে কাজ করতে হবে।’

ড. মুশতাক বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগে ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের কাঠামো তৈরি করা আছে, কিন্তু জনবল নেই বললেই চলে। তাই এখন প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করে হলেও এমন টিম মাঠে রাখা দরকার। যেখানেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাবে দ্রুত সেখানে পরীক্ষা, শনাক্ত, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। কোনোবারেই আমরা পরিপূর্ণভাবে এ কাজটি করতে পারিনি। তাই এবারের বিধি-নিষেধের সময়ে এই বিষয়কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতেই হবে। কারণ গত কয়েক দিনে সংক্রমণের যে যোগসূত্র ঘটে গেছে তার প্রভাব দেখা যাবে এ মাসের শেষে বা আগস্টের প্রথম থেকে। আর মৃত্যু ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠবে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে।

ড. মুশতাক হোসেন বলেন, আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আক্রান্তদের জন্য হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা। যাদের হাসপাতালে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে তাদের হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার আওতায় এলাকায় এলাকায় অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টার গড়া দরকার। অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টারগুলোতে শুধু সিলিন্ডার অক্সিজেন থাকলেই চলবে। এতে অনেকেই আইসোলেশন সেন্টার থেকেই বাসায় ফিরতে পারবে সুস্থ হয়ে। যাদের হাই ফ্লো বা আইসিইউ সেবা লাগবে শুধু তাদেরই হাসপাতালে পাঠানো দরকার হবে। এতে হাসপাতালগুলোতে চাপ কমবে, মানুষও দ্রুত সময়ে চিকিৎসার আওতায় এসে জীবন বাঁচাতে পারবে। আর সর্বোপরি সংক্রমণের চেইন ভেঙে করোনা দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।

পরিস্থিতির মুখে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি আরো জোরালো করতে শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম আরো কয়েকজন পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার বড় কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে দেখেছেন। এসব হাসপাতালে অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা কেমন আছে, সামনে রোগীর চাপ কতটা সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা।

মহাপরিচালক হাসপাতাল পরিস্থিতি ঘুরে দেখার সময় রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের মুখে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকাসহ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ কমে আসা ছাড়া শেষ মেয়াদের লকডাউনের খুব বড় একটা প্রভাব দেখা যায়নি। পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ চলছে। সংক্রমণ কতটা খারাপ হতে পারে আর আমরা কতটা সামাল দিতে পারব, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি, এখন পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা যা আছে তা ভালোই।’

মহাপরিচালক বলেন, সাধারণত যেখানে ৭০ থেকে ৯০ টনের মতো অক্সিজেন চাহিদা থাকে, তা এখন বেড়ে ২০০ টনে উঠেছে। এই চাহিদার হিসাবে এখন পর্যন্ত দেশে পর্যাপ্ত জোগান আছে। ভারত থেকেও নিয়মিত অক্সিজেন আসছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকায় রোগীর চাপ বেশি থাকছে, ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক রোগী আসছে প্রতিদিন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, চলতি বছরে গত ৫ এপ্রিল থেকে একটানা বিধি-নিষেধের আওতায় রয়েছে দেশ। কখনো কঠোর আবার কখনো শিথিল। এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিথিল বা স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল গেল ১৪-২২ জুলাই পর্যন্ত। আর তখন আবার গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণ চলছিল। সর্বোচ্চ মৃত্যু ঘটে এই সময়ের মধ্যে। দৈনিক সংক্রমণের হারও ৩০ শতাংশের ওপরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন অর্থনৈতিকভাবে এক ধরনের আত্মঘাতী হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা, সতর্কতা আর টিকা নিশ্চিত করতে পারলেই দ্রুত সাফল্য মিলবে। টিকার গতি ধীর থাকলে সংক্রমণের লাগাম টেনে রাখা কঠিন হবে, যা প্রভাব পড়বে হাসপাতালের ওপর, অর্থনীতির ওপর।



সাতদিনের সেরা