kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সংক্রামক রোগের ধর্ম ভুলে গেলে চলবে না

আবদুল বায়েস   

১৯ জুলাই, ২০২১ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংক্রামক রোগের ধর্ম ভুলে গেলে চলবে না

করোনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। কয়েক দিন ধরেই দৈনিক গড়পড়তা মৃত্যু ২০০! অর্থনীতি স্থবির প্রায়। দারিদ্র্য বাড়ছে। সবচেয়ে বড় গ্যাঁড়াকলে পড়েছে মধ্যবিত্ত। সব সঞ্চয় খুইয়ে শুধু ইজ্জত নামক সম্পদটি আঁকড়ে ধরে বসে আছে। বলতে পারছে না। সইতেও পারছে না।

গত সপ্তাহে শেষ হওয়া ‘কড়াকড়ি’র লকডাউনের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ বেহুঁশের মতো ছুুটেছে। অনেকেই মাস্ক পরেনি। মানেনি বিধি-নিষেধ। জাপানি ভাষায় একে বলে ‘হারিকিরি’ বা আত্মহনন। বলা হয় নিরক্ষর ও গরিব বলে নাকি আমাদের দেশের এই অবস্থা। এটা কি শুধুই বাংলাদেশের জনগণের বৈশিষ্ট্য? বোধহয় না। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আমার এক সহকর্মী অধ্যাপক সেদিন জানালেন, আমেরিকার অর্ধেক জনগণ নাকি মনে করে করোনা রোগটির অস্তিত্ব নেই। তাদের ধারণা, সরকার তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। তারা টিকা নিতে উৎসাহী নয়। অনেক শহরেই তাই টিকা নেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো একটি স্টেট বলেছে যে টিকা নিলে তারা বন্দুক উপহার দেবে। উদ্দেশ্য যদি তাতে জনগণ অন্তত টিকা দেয়। স্বাধীনতাকামী মার্কিনরা টিকা দেওয়ার পর ভেবেছিল আর মুখ ঢাকার দরকার নেই। এসব ‘নিয়ম’ তাদের জন্য বেমানান।

টিকা নিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং মানুষের আগ্রহ আপাতত সন্তোষজনক। তবে আমার সেই সহকর্মী বলছেন, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই টিকা নিয়ে সরকার নানা বিপর্যয়ে পড়েছে। এমনকি টিকা নিতে বাধ্য করতে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। কারণ জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ বিশ্বাসই করতে চায় না যে কভিড বলে কিছু আছে। ইন্দোনেশিয়ার সরকার টিকা নিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে লটারির ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা টিকা নেওয়ার পর লটারিতে কাউকে দিয়েছে গরু, কাউকে দিয়েছে মুরগি, কাউকে দিয়েছে সাইকেল।

চীন একটা একনায়কতান্ত্রিক দেশ, যেখানে জনগণ সরকারের নির্দেশ অমান্য করার সাহস রাখে না। অথচ সেই দেশ শেষ পর্যন্ত টিকা গ্রহণকারীদের পুরস্কৃৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারাও বলছে, জনগণ টিকা নিলে পাবে ডিম, খাবার কিংবা টিস্যু পেপার কেনার কুপন। তাইওয়ান তাদের জনগণকে টিকা নিতে উৎসাহিত করতে শেষ পর্যন্ত চিকেন ফ্রাইসহ নানা খাবার উপহার দিয়েছে।

মাইক্রো ইকোনমিকস ক্লাসে শিক্ষার্থীদের আমরা অর্থনীতির ১০ নীতি পড়িয়ে আসছি। বলা হয়ে থাকে যে অর্থনীতিবিদগণ অনেক বিষয়েই একমত নন, তবে ১০টা বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। এর একটা হচ্ছে মানুষ উৎসাহে সাড়া দেয় (চবড়ঢ়ষব ত্বংঢ়ড়হফ ঃড় ওহপবহঃরাবং)। ভর্তুকি পেলে যেমন উৎপাদক উৎপাদন বাড়ায় (ইতিবাচক উদ্দীপনা) তেমনি বড় অঙ্কের জরিমানা হলে (নেতিবাচক উদ্দীপনা) কার্বন নির্গত করতে গিয়ে দুইবার ভাবতে হবে। অর্থনীতির একটি নিয়ম হলো পুরস্কার ও শাস্তি। অর্থাৎ মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করাতে হলে চাই পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা। সঠিক পুরস্কার ও শাস্তির বিধান থাকলে মানবজাতি অনেক সময় তার আচরণ বদলায়। কেউ এর নাম দিয়েছে ‘লাঠি ও গাজর’ নীতি (ঈধত্ত্ড়ঃ ধহফ ঝঃরপশ চড়ষরপু)।

আমরা জেনে আনন্দিত যে আমাদের সরকার এরই মধ্যে দেশের অন্তত ৮০ শতাংশ জনগণকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বলা যত সহজ, করা ততটাই কঠিন; অন্তত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে। গত মার্চ পর্যন্ত চীনে মাত্র সাড়ে সাত কোটি লোক টিকা নিয়েছিল, যা মোট জনগণের মাত্র ৫ শতাংশ। তা দিয়েই তারা দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করাতে পেরেছিল। তখনো তাইওয়ানে একজনও টিকা নেয়নি। তাদের অর্থনীতি তাতে থামেনি। তাহলে তারা কী মন্ত্র পড়ে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দিল? মন্ত্রটি ছোট। সবাই মাস্ক পরুন। এখন পর্যন্ত কভিড প্রতিরোধের এটাই মূলমন্ত্র। মাস্ক ছাড়া আর কোনো মন্ত্র এখনো কার্যকর হয়নি। তবে টিকা দরকার মৃত্যু ঠেকাতে।

যারা মাস্ক না পরে প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তা কতটুকু নিবৃতিমূলক তা ভেবে দেখা দরকার। মোট কথা, জেল-জরিমানা যত জোরদার হবে, মাস্ক পরার বা আইন মানার প্রবণতা তত পোক্ত হবে। ভুলে যাই কী করে—মাস্ক হচ্ছে করোনা মোকাবেলার মোক্ষম মাধ্যম।

আমার সহকর্মী অধ্যাপকের আকুতিটুকু দিয়ে শেষ করি। সংক্রামক রোগের ধর্ম ভুলে গেলে চলবে না। সংস্পর্শে এলেই সংক্রমণ। মৃত্যু অনিবার্য না হলেও ভোগান্তি হবেই। যাকেই মাস্কবিহীন পাওয়া যাবে, তাকেই শাস্তির আওতায় আনুন। দেশ ও মানুষের স্বার্থে সরকার কি এটুকু কঠোর হতে পারে না?

 লেখক : সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা