kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

করোনা ইউনিটেও রোগীর ভরসা স্বজনরা

♦ কভিড নন-কভিড রোগী আর স্বজনে ঠাসাঠাসি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ♦ রেড জোন অরক্ষিত, চলছে অবাধে সবার যাতায়াত, সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা ♦ কুলাতে পারছেন না চিকিৎসক নার্স কর্মীরা, চলছে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা

তৌফিক মারুফ    

১৮ জুলাই, ২০২১ ০২:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনা ইউনিটেও রোগীর ভরসা স্বজনরা

অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে ট্রলিতে ওঠানো, ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ হলে ওয়ার্ড বা কেবিন পর্যন্ত ঠেলে নেওয়া—সবই করতে হয় রোগীর স্বজনদের।

নিচে সিঁড়িতে ওঠার পথেই লাল স্টিকারে বেশ বড় করে লেখা ‘কভিড-১৯ রেড জোন’। সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠলে বাঁয়ে একইভাবে বড় লাল অক্ষরে লেখা ‘আইসোলেশন ইউনিট’। গেট পুরোটাই খোলা। ভেতরের করিডরে বসার ব্যবস্থা চিকিৎসক ও নার্সদের। গ্লাস দিয়ে আলাদা করা ওয়ার্ডের ভেতরে সারি সারি বেডে রোগী। প্রায় প্রতি বেডের সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার। প্রতিটি বেডেই রোগী আছে। কেউ শুয়ে, কেউ বসে। কারো অক্সিজেন লাগানো, কেউ আছে অক্সিজেন ছাড়াই। প্রতি রোগীর কাছেই এক-দুজন করে স্বজন। ছোট পরিসরের রুম রোগী আর স্বজনদের ভিড়ে রীতিমতো ঠাসাঠাসি। আছেন ডাক্তার-নার্সও।

একটি বেডের রোগীর মুখে খাবার তুলে দিতে দেখা যায় তার সঙ্গে থাকা স্বজনকে। একজন রোগী বেড না পেয়ে রুমের ভেতরের ডিউটি ডাক্তারের চেয়ারেই বসে পড়েন। কিছুক্ষণ পরেই সঙ্গে থাকা তরুণকে ডেকে বলেন, ‘আমারে বাথরুমে নিয়া চল, বাথরুম করুম।’ ওই তরুণ রোগীকে ধরে নিয়ে যান বাথরুমের দিকে।

অন্যদিকে বাইরে থেকে যে যার মতো ঢুকছে, বের হচ্ছে অবাধে। সানজিদা নামের একজন বাইরে থেকে এসেই হনহন করে ঢুকে গেলেন ওয়ার্ডের ভেতরে। সঙ্গে আরো এক যুবক। ওয়ার্ডের ভেতরের বাঁ পাশের সারির মাঝের বেডে বসে আছেন বয়স্ক একজন রোগী, যাঁর মাস্ক ঝুলছে থুতনির নিচে। সানজিদা গিয়ে রোগীর বেডে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলা শুরু করেন। কথা বলতে বলতেই বেরিয়ে আসেন ওয়ার্ডের বাইরে।

জানতে চাইলে সানজিদা বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাবাকে এখানে ভর্তি করেছি। তাঁর করোনার উপসর্গ আছে। মাঝেমধ্যে শ্বাসকষ্ট হয়, তখন অক্সিজেন লাগে, আবার মাঝেমধ্যে অক্সিজেন ছাড়াই থাকতে পারেন। আমরা দুই ভাই-বোন বাবার সঙ্গে থাকি। তাঁকে খাওয়ানো, বাথরুমে নেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো—সবই আমরা করি। আমরা আক্রান্ত হতেই পারি। কিন্তু কী করব!’

পাশ থেকেই আরেক রোগীকে অক্সিজেন লাগানো অবস্থায় চারজনে ধরাধরি করে ওই ইউনিট থেকে বের করে নিচে নিয়ে যান। তাঁদের একজন সুমন বলেন, বাবার করোনার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। তীব্র শ্বাসকষ্ট আছে। সিলিন্ডার, অক্সিজেনে কাজ হচ্ছে না। হাইফ্লোতে বেড নেই। ডাক্তাররা আইসিইউর পরামর্শ দিয়েছেন। এখন বাইরে নিয়ে যাই, দেখি কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউ পাই কি না।’

গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কভিড রেড জোন জুড়েই দেখা যায় রোগী আর স্বজনদের এমন ভিড় আর ছোটাছুটি। এ ছাড়া নিচতলায় আউডডোর থেকে শুরু করে দ্বিতীয় তলার প্রশাসনিক ব্লকেও দেখা যায় মানুষের রীতিমতো উপচে পড়া ভিড়। প্রশাসনিক ব্লকে বেশি ভিড় বিদেশগামীদের টিকা নিতে। নিচে আইটডোরে করোনা টেস্টিং বুথেও ক্ষণে ক্ষণে আসছে মানুষ। ওই বুথের সামনে দিয়েই রেড জোনে যাতায়াত মানুষের।

রেড জোনে কেন সবার অবাধে যাতায়াত থাকছে জানতে চাইলে এই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন রোগীর চাপ অনেক বেশি। ফলে রোগীদের স্বজনরাও রোগীর সঙ্গে থাকতে চায়। তারা যার যার রোগীকে সেবায় সহায়তা করে।

পরিচালক বলেন, ‘রোগীর চাপ সামলাতে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যেই ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডকেও কভিড আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তর করব। এ ছাড়া জনবলও লাগবে। জনবল চেয়েছি। পাব বলে আশা করছি।’

দুপুর ১২টায় হাসপাতালের মূল ভবনের নিচতলার করিডর আর রাস্তাজুড়ে হঠাৎই যেন মানুষ আর গাড়ি-রিকশা-অটোরিকশায় রীতিমতো জট লেগে যায়। হৈ-হুল্লোড়ে অস্থির হয়ে ওঠে পরিবেশ। খবর পেয়ে আনসার সদস্যদের নিয়ে ছুটে আসেন পরিচালক। রিকশা-অটোরিকশা লাঠিপেটা করে জটমুক্ত করেন। তবে নির্দিষ্ট পার্কিং এরিয়ার বাইরে পুরো রাস্তার দুই পাশে গাড়ি রাখায় চটে যান পরিচালক। পরে আনসার সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে করিডরে মানুষের জটলা কমানোর চেষ্টা করেন। পরিচালক বলেন, হাসপাতালে যদি এমন ঠাসাঠাসি থাকে তবে সংক্রমণ কমানো কঠিন হবে।

সাড়ে ১২টায় একটি প্রাইভেট কার এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে আহাজারি করতে করতে বেরিয়ে আসেন মধ্যবয়সী এক নারী। সামনে যাকে পান তাকে ধরেই জানতে চান এখানে আইসিইউ খালি আছে কি না। এ সময় হাসপাতালের একাধিক স্টাফ এগিয়ে গিয়ে জানান আইসিইউ খালি নেই একটিও। অন্য কোথাও যেতে হবে। কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন ওই নারী। বলেন, ‘আমার হাজব্যান্ডকে নিয়ে আসছিলাম। খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’ তিনি গাড়িতে উঠে দ্রুত চলে যান আইসিইউর খোঁজে অন্য কোথাও।

আইসিইউ মিলছে না কেন জানতে চাইলে পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, ‘এখানে এখন ১০টি আইসিইউ আছে। সবগুলোই রোগীতে ভরা। আরো ১০টি আইসিইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে এর যন্ত্রপাতি আসছে। যন্ত্রপাতি হাতে পেলে সেগুলো স্থাপন করতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। সেই সঙ্গে অ্যানেসথেসিয়োলজিস্টও দরকার হবে। সেই নিয়োগপ্রক্রিয়াও মন্ত্রণালয় থেকে চলছে।’

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. সায়েদুজ্জামান জানান, ২৬৩টি কভিড ডেডিকেটেড জেনারেল বেডের মধ্যে গতকাল খালি ছিল ৬০টি। ১০টি আইসিইউ, ৩০টি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সংবলিত বেড ও ১৫টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরযুক্ত বেডের সবগুলোই রোগীতে পূর্ণ ।

এদিকে পরিচালক জানান, সব মিলিয়ে ৮৫০ বেডের শহীদ সোরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কভিড ডেডিকেটেড বেড ছাড়াও অন্যগুলোতেও নিয়মিত রোগী থাকছে। সেই সঙ্গে আউটডোরেও প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ২০০ জন রোগী থাকে। তাদের সঙ্গে আরো একাধিক মানুষ আসে। সব মিলিয়ে বড় একটি ভিড় সামাল দিতে হচ্ছে প্রতিদিন।



সাতদিনের সেরা