kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

জীবন আর সাম্যের উৎসব অলিম্পিক গেমস

ইকরামউজ্জমান   

১৭ জুলাই, ২০২১ ০৪:১৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জীবন আর সাম্যের উৎসব অলিম্পিক গেমস

আধুনিক অলিম্পিকের ১২৫ বছরের পথযাত্রায় ৩১টি গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ ভেন্যুগুলো অনধিকৃত ছিল, এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। এর আগে আর কখনো জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করে, বাধ্য হয়ে নতুন নিয়ম-কানুন ও বিধি-নিষেধ সৃষ্টি করে ‘গ্রেটেস্ট ইভেন্ট অন আর্থ’—অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়নি। ৩২তম অলিম্পিক গেমস শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ২৩ জুলাই টোকিওতে। অলিম্পিকের দেউটি নিভিয়ে ফেলা হবে ৮ আগস্ট। অলিম্পিক মঞ্চে স্বাগতিক জাপান নিজেকে এশিয়ার নতুন ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে কি না—এটা সময়ই বলে দেবে। জাপান কিন্তু পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েই নামছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টোকিও অলিম্পিক এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর ক্রীড়াঙ্গনের জন্য তাৎপর্যময়।

অলিম্পিক গেমস মানুষ, জীবন আর সাম্যের উৎসব। বর্ণাঢ্য এই বৃহৎ ক্রীড়ায় সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র সব মানুষের প্রবেশাধিকার আছে। স্বাগতিক দেশ বা বাইরে থেকে গিয়ে পঞ্চবৃত্তের ইন্দ্রজালের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আছে সবার। তবে দর্শক হিসেবে বিভিন্ন ভেন্যুতে খেলা উপভোগের পেছনে আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কখনো ‘খামতি’ দেখা যায়নি বিগত অলিম্পিকগুলোতে।

ক্রীড়াবিদ, খেলোয়াড়, ক্রীড়া কর্মকর্তা, ক্রীড়ামোদী সমাজ এবং গেমসসংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়েই অলিম্পিক উৎসব। খেলাধুলাই অলিম্পিকের মুখ্য বিষয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও গেমসের আছে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, নীতি ও শিক্ষা। আছে আবেদনময়ী দর্শন। অলিম্পিক মানুষের কথা ভাবে। তাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সপক্ষে। বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চায় মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে। অলিম্পিকের লক্ষ্য হলো, বিশ্ব মানবসমাজকে একত্র করে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে। অলিম্পিক হলো বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের আছে ‘জাদুকরী’ শক্তি। পৃথিবীতে মাত্র দুটি জায়গায় সব অঞ্চল থেকে মানুষ এসে জমায়েত হয়। এর একটি হলো অলিম্পিক চত্বর আর অন্যটি জাতিসংঘ। জাতিসংঘের থেকেও বেশি দেশের প্রতিনিধি আসেন অলিম্পিক চত্বরে। বৃহত্তর ক্রীড়ায় অংশ নেওয়ার যোগ্যতা নেই, এমন দেশের প্রতিনিধিরাও অলিম্পিকে সুযোগ পান ‘ওয়াইল্ড কার্ডের’ মাধ্যমে বিশেষ বিবেচনায়। অংশ নেন দেশহীন খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা অলিম্পিকের পতাকার আওতায়। এর পেছনে আছে অলিম্পিকের মৌলিক দর্শন আর সেটি হলো ‘অংশগ্রহণ আসল, জয়লাভ নয়’।

কভিড-১৯ সারা বিশ্বের স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহকে পুরোপুরি তছনছ করে ফেলেছে। কভিড মানুষকে অসামাজিক ও ঘরবন্দি করে ফেলেছে। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছে। ক্রীড়াঙ্গন তো স্বাভাবিক জীবনের বাইরে নয়। এক পর্যায়ে সারা বিশ্বের খেলাধুলা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় কভিড মহামারির জন্য। আইওসি অলিম্পিক পিছিয়ে দেয় এক বছরের জন্য। সেই অলিম্পিক আবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জৈব সুরক্ষা বলয়ের কঠোর নিয়মের মধ্য দিয়ে। কবে যে কভিড মহামারি থেকে বিশ্ব মুক্তি পাবে, কেউ জানে না! করোনা জীবনের প্রতিটি দিনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। কিন্তু জীবন তো থমকে থাকতে পারে না। আর তাই নতুন স্বাভাবিকতায় ধীরে ধীরে সচল হয়ে উঠেছে ক্রীড়াঙ্গন। এরই মধ্যে বিভিন্ন খেলার বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এতে কোথাও দর্শক ছিল না, কোথাও সীমিতসংখ্যক দর্শক, আবার কোথাও গ্যালারি ভর্তি দর্শক ছিল।

অলিম্পিক গেমস আয়োজনের বিষয়টি কিন্তু একদম ভিন্ন। অনেক খেলার একসঙ্গে আয়োজন। একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষের ‘ইনভলভমেন্ট’ পক্ষকাল ধরে। গেমস আয়োজনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে স্বাগতিক দেশের অর্থনীতির উত্থান-পতন। জাপান মহামারির মধ্যেই গেমসের আয়োজন করে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু পুষিয়ে নিতে পারবে—এটা এখন জানা সম্ভব নয়। অথচ এশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি অলিম্পিক গেমস (১৯৬৪ সালে প্রথমে টোকিও, ১৯৮৮ সালে সিউল এবং ২০০৮ সালে বেইজিং) বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশগুলোর ক্রীড়াঙ্গন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

অলিম্পিক আন্দোলনের ‘হৃিপণ্ড’ হলেন অ্যাথলেটরা। তাঁরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যক। অলিম্পিক দর্শন ও ভাবনায় অ্যাথলেটরাই সবচেয়ে আগে। চার বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন গেমে খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদরা কঠোর অনুশীলন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে টোকিও অলিম্পিককে লক্ষ্য করে নিজেদের তৈরি করেছেন। সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তো অলিম্পিক। এই প্রস্তুতির পেছনে আছে সরকারি-বেসরকারি বড় বিনিয়োগ। বিভিন্ন ধরনের কার্যকর উদ্যোগ। এত কিছুর পরও যদি ক্রীড়াবিদরা অলিম্পিকে অংশ নিতে না পারেন, তাঁদের স্বপ্ন যদি ভঙ্গ হয়—এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ক্রীড়াঙ্গনে আর তো কিছু হতে পারে না। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়দের জন্যই অলিম্পিকের আয়োজন। তাঁদের মেধা ও সম্ভাবনাকে অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করা। অলিম্পিক ভিলেজ খুলে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড় এরই মধ্যে জাপানে পৌঁছে গেছেন। তাঁরা বহন করে নিয়ে এসেছেন দেশ ও জাতির স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।

টোকিও অলিম্পিকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এবার বাংলাদেশ থেকে অংশ নেবেন ছয়জন অ্যাথলেট। তাঁরা হলেন আর্চার রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকী, শ্যুটার আবদুল্লাহ হেল বাকি, অ্যাথলেট জহির রায়হান ও সাঁতারু জুনয়না আহমেদ ও আরিফুল ইসলাম। এর মধ্যে শুধু আর্চার রোমান সানা যোগ্যতা অর্জন করে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন। অন্যরা ‘ওয়াইল্ড কার্ডের’ মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস গেমস থেকে বাংলাদেশ প্রতিটি অলিম্পিকে অংশ নিয়েছে। এরই মধ্যে অলিম্পিয়ানের তালিকা বেশ বড় হয়েছে। এবার বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের ‘সেফ দ্য মিশন’ হলেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সভাপতি শেখ বসির আহমেদ মামুন।

অলিম্পিকে পদক পেতে হলে ক্রীড়াঙ্গনে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন আছে—সেই উদ্যোগের ধারেকাছেও আমাদের ক্রীড়াঙ্গন নেই। কয়েক মাস অনুশীলন করে প্রতিবার অলিম্পিকে অংশগ্রহণ বা কখনো কখনো বিদেশে অনুশীলন করে অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গত সাড়ে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে বজায় আছে। পদক জেতার চিন্তার জন্য দেওয়া হয়নি। ‘অলিম্পিয়ান’ সম্মানের অধিকারী যাঁরা হয়েছেন তাঁদের মধ্যে অলিম্পিক মঞ্চে প্রাথমিক হিটের বেড়া কয়জন অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন? এবার যাঁরা অলিম্পিকে গেছেন তাঁরা যদি টাইমিং ও পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে নিজেদের অতিক্রম করতে পারেন, তা হবে ‘অ্যাচিভমেন্ট’। বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হবে। অদৃষ্ট থেকে কিছু হলেও হতে পারে—এই ধরনের চিন্তা সব সময় হতাশার জন্ম দেয়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ আছে। যে দেশগুলো খেলাধুলার ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে, ভালো করছে; সে দেশগুলোর সমাজ উন্নত, সুসভ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো এবং রাষ্ট্রযন্ত্র দক্ষ হাতে পরিচালিত হচ্ছে। অলিম্পিক মঞ্চ বারবার এটা প্রমাণ করে!

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা