kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের উন্নয়ন দরকার

ড. নিয়াজ আহম্মেদ   

১৫ জুলাই, ২০২১ ০৩:৫৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের উন্নয়ন দরকার

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর থেকে কারাগার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন সংশোধন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে। অপরাধ ও অপরাধীদের প্রতি পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি ও বিকাশ, অপরাধীদের প্রতি সমাজের মনোভাবের পরিবর্তন এবং অপরাধকে একটি জটিল প্রপঞ্চ হিসেবে শুধু আইনগত কাঠামোর মধ্যে না দেখে সামাজিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধ নির্মূলের জন্য সংশোধন ব্যবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়। মূলত কোনো শাস্তিই অপরাধীকে অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখতে পুরোপুরি সমর্থ নয়। আর সে কারণেই অপরাধীর চারিত্রিক সংশোধনের গুরুত্ব এত বেশি। বয়সের ভিন্নতার কারণে আমরা অপরাধী ও কিশোর অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করি, সে কারণে ভিন্ন ভিন্ন সংশোধন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। বয়স্কদের তুলনায় শিশু-কিশোরদের সংশোধন বেশি দরকার, কেননা তারা যেন নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করার সুযোগ পায়। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের এত অল্প বয়সে কারাগারে নিক্ষেপ করে কঠিন শাস্তি দিলে তাদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে তার বিকাশের পথ একবারেই বন্ধ হয়ে যাবে। কেননা শাস্তি সংশোধনের একটি উদ্দেশ্য বটে; কিন্তু তা কতটুকু কার্যকর এ নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।

বাংলাদেশে শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী আইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত বা সংস্পর্শে আসা শিশু বা অভিভাবক কর্তৃক প্রেরিত শিশুদের উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনে একীভূত করার লক্ষ্যে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদান, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, শারীরিক, বুদ্ধিভিত্তিক ও মানবিক উৎকর্ষ সাধন, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানবিকতার উন্নয়ন এবং সমাজে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এ কেন্দ্রের কাজ। মোদ্দাকথা, একটি শিশু অপরাধ করার পর তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে সমাজে স্বাভাবিক জীবন যাপনের উপযোগী করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব এই কর্তৃপক্ষের। এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এমন মনোভাব ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা উচিত। কঠিনভাবে মনে রাখতে হবে, তাঁদের কাজ শিশু-কিশোরদের শাস্তি দেওয়া নয়, তাদের সংশোধন করা। সংশোধনের জন্য কেন্দ্রের অবকাঠামো, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং তাদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য বড় বিষয়। তাদের মমতা দিয়ে যেমন রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, তেমনি নিজেদের পেশাদারির পরিচয় দিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যাবলি সম্পাদন করতে হবে।

সমাজে কিশোর অপরাধ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার চেয়েও বড় আতঙ্ক কিশোর গ্যাং। আমরা যদি এদের সংখ্যা কমাতে চাই এবং এদের সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাই, তাহলে প্রথমত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ কথা সত্য, একটি অবকাঠামোর মধ্যে রেখে মানুষকে সংশোধন করা বেশ সহজ নয়। কেন্দ্রের অবকাঠামো ও ভেতরকার পরিবেশ যদি সংশোধনের জন্য উপযুক্ত ও অনুকূলে না থাকে, তাহলে কিভাবে আমরা সংশোধন করব। আমরা যদি কেন্দ্রকে শাস্তিদানের মতো কারাগার মনে করি এবং পরিবেশ যদি কারাগারের মতো থাকে, তাহলে কিভাবে তাদের মধ্যে পরিবর্তন হবে। কারাগার ও সংশোধনাগার এক নয়। দুটির উদ্দেশ্য আলাদা। একটি প্রত্যক্ষ, অন্যটি পরোক্ষ। কাজেই শিশু-কিশোরদের এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে নিজেদের সংশোধনের সুযোগ পায়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১৮ বছর পার হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হতে পারে। আমরা যদি তাদের এই সুযোগ তৈরি করে দিতে না পারি, তাহলে সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না। মোটাদাগে সংশোধন করতে চাইলে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র এবং এর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে এবং একে ঢেলে সাজাতে হবে।

 কেন্দ্রের অবকাঠামো ও পরিবেশের উন্নয়ন এবং ভেতরকার কার্যাবলি সঠিক ও যথাযথভাবে সম্পাদনের মাধ্যমেই শিশু-কিশোরদের মানসিকতার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এদের খাদ্যসহ আনুষঙ্গিক খরচের বরাদ্দ তাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য অপ্রতুল মনে হয়। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। শিশু-কিশোরদের জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্নের। তাদের মায়ের মমতা, ভাইয়ের আদর, বোনের ভালোবাসা দিতে হবে। পরিবার নয়; কিন্তু একটি পারিবারিক পরিবেশ তাদের জন্য অপরিহার্য। মানসিক বিকাশের জন্য অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কেন্দ্রকে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। এখানকার কর্মকর্তাদের শিশু বর্ধন, বিকাশ ও পরিচালনাবিষয়ক একাডেমিক জ্ঞান সম্পর্কে পারদর্শী এবং তার অনুশীলন থাকতে হবে। থাকতে হবে আচরণবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা এবং নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করার ইচ্ছা। এমন লোকদের দায়িত্ব দিতে হবে, যারা একাডেমিক এবং মানবিক মানসিকতাসম্পন্ন বিবেকবোধ মানুষ। কেন্দ্রের ভৌত পরিবেশ এবং এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের মানসিকতার উন্নয়ন কেন্দ্রের উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যদি কেন্দ্রের উন্নয়ন করা না যায়, তাহলে তাদের কোনো উন্নয়ন হবে না। সংশোধনের পরিবর্তে শিশু-কিশোররা বড় অপরাধী হয়ে উঠবে। তাদের সংশোধনের দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা