kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ

মো. তানজিমুল ইসলাম   

১৪ জুলাই, ২০২১ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকেও এ দেশের মানুষ সরকারি ডাক বিভাগের ওপরই অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। এই সেবাটির ব্যাপক চাহিদা ছিল সে সময়। ডাক বিভাগের তুলনায় কুরিয়ার সার্ভিস বেশ দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ছিল বলে আধুনিক ছেলে-মেয়েদের ভিড় চোখে পড়ত ওই কুরিয়ারে। ডাকপিয়নের ক্রিং ক্রিং আওয়াজ অথবা কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যানকে দেখে মনটা কেমন যেন পুলকিত হয়ে যেত। ছেলে-মেয়েকে লেখা মা-বাবার অথবা মা-বাবাকে লেখা ছেলে-মেয়ের চিঠি! আহা, কী যে প্রশান্তি, পরিতৃপ্তি!

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ যেন সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে গেল। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এ দেশ ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপ নিতে শুরু করল। মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। তারবিহীন যন্ত্রটির মাধ্যমে অনায়াসেই অতিদূরের মানুষের সঙ্গে নিবিড় আলাপনে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ মানুষের অর্থ-সময়-শ্রম সব কিছুতেই বাড়তি সহায়ক হয়ে উঠল। এক পর্যায়ে এটি যেন নিত্যদিনের অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। আর ডাকপিয়নের পানে চেয়ে থাকতে হয় না। ইচ্ছা হলেই প্রিয় বন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো যায়। বিপদাপন্ন অবস্থায় অন্যের সাহায্য চাওয়া ছাড়াও না-ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষটির খবর দেওয়া-নেওয়া যায় তত্ক্ষণাৎ। অফিস-আদালতে কম্পিউটার যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার কেরানিদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। সেবাগ্রহীতার জন্য একই জিনিস বারবার লেখার বিড়ম্বনা থেকে রেহাই মিলেছে। ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণসহ যাবতীয় ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রাদি জীবনকে আরো সহজ করে দিয়েছে।

আধুনিকায়নের ফলে ডিজিটাল সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বাড়ছে। এখন আর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শুধু কথা বলাই নয়, বরং শর্ট মেসেজ পাঠানো, গান শোনা, সিনেমা-নাটক দেখা, ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা, রেকর্ড করা, ই-মেইল করা, বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে টাকা লেনদেন ও ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া যায়। কী আশীর্বাদ! ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি।

‘ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা’ একটি স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে চলে। এখানে কোনো আবেগ, বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি চলে না। তবে যারা এটি চালায়, তারা অনেকেই কারণে-অকারণে এর অপব্যবহার করতে ব্যস্ত থাকে। মোবাইল গেমের নেশায় আসক্ত হয়ে অবাধ্য ছেলে-মেয়েরা পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে যুব শ্রেণি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আবেগ-বিবেকের তোয়াক্কা না করেই যেকোনো ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির লেশমাত্র নেই দেখে হতাশ হয়ে পড়ছেন মা-বাবা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে তুড়ি মেরে কোমলমতি শিশুরা তাদের শৈশবকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে নানা ধরনের মোবাইল গেমে। ‘নিষিদ্ধের প্রতি আসক্তি’ নীতিতে গুগলে সার্চ দিয়ে একের পর এক নিষিদ্ধ গেমে বুঁদ হয়ে থাকছে সারাক্ষণ। বাসায় নিকটাত্মীয় এলেও তাদের তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলা বা শোনার চেয়ে বরং মোবাইলের টুং টাং মোহিনী শব্দেই অনেক খুশি। অন্যভাবে বলা যায়, মোবাইলপ্রেমে আসক্ত শিশুদের কোনো কিছুতেই বশ মানানো যায় না। অনেকটা মাদকাসক্ত লক্ষ্যভ্রষ্ট যুবসমাজের মতোই ভয়াবহ বৈকি! ফেসবুক নামের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অসামাজিক ও অসামঞ্জস্য ঘটনার জন্ম নিচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে এমনটিই ঘটে চলেছে এখানে-ওখানে। সারা রাত জেগে অচেনা-অজানা অতিথির সঙ্গে অবৈধ প্রেমালাপ, এমনকি অশ্লীল সংলাপের দ্বারা চারিত্রিক অবক্ষয়। একটু খেয়াল করলে আমাদের আশপাশেই এমন চিত্র দেখতে পাই।

ডিজিটাল কায়দায় আজকাল চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ধরনও অনেকটা পাল্টেছে। এখন আর রাত জেগে কেউ জীবন বাজি রেখে সনাতনি কায়দায় চুরি করতে যায় না, বরং পাসওয়ার্ড চুরি করে। ডিজিটাল কায়দায় ব্ল্যাকমেইল করা হয়। অশ্লীল ছবির সঙ্গে অন্য মুখের ছবি জোড়া লাগিয়ে বিপাকে ফেলে দেওয়া হয়। ব্যাংকের এটিএম কার্ডের পাসওয়ার্ড ছিনতাই করে বিপদাপন্ন ব্যক্তিকে সর্বস্বান্ত করা হয়। পরিবারের কোনো প্রিয় ব্যক্তিকে, এমনকি কোমলমতি শিশুকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মোবাইল ফোনে নানাভাবে হেনস্তা করার উদাহরণ এই সমাজে বিদ্যমান। মোবাইল ফোনের কথা রেকর্ড করে প্রিয় বন্ধুকেও কখনো কখনো ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়।

এমন অনেক নিত্যনতুন ঘটে যাওয়া ঘটনার সাক্ষী আমরা। মহৎ উদ্দেশ্য মাথায় রেখে ডিজিটাল যুগে আমাদের পা রাখা। এর সঙ্গে এটিও সত্য যে ডিজিটাল সিস্টেমকে পুঁজি করে দিনের পরে দিন নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত একটি অনুকূল সমাজ গঠনে কাজ করা। সেখানে নির্মল আলো-বাতাসের নির্যাস নিয়ে বেড়ে উঠবে পরবর্তী প্রজন্ম। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নতুন এক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক : কো-অর্ডিনেটর, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ



সাতদিনের সেরা