kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

জাপা না সরকারের শরিক না প্রকৃত বিরোধী দল

► দলের জন্য ‘অভিশাপ’ এরশাদের সম্পদ
► জাপা নামে দল করতে পারেন বিদিশা

লায়েকুজ্জামান   

১৪ জুলাই, ২০২১ ০৩:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জাপা না সরকারের শরিক না প্রকৃত বিরোধী দল

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতা নিয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টিরও রাজনৈতিক মৃত্যু হতে পারে। অবশ্য এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টি এখনো টিকে আছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মিত্র হলেও দলটি এখন সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে।

কিন্তু জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ। কারণ তাঁরা সরকারের শরিক নয়, যে কারণে দলের নেতাকর্মীরা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে দলটি প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালনেও ব্যর্থ হচ্ছে। সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জনপ্রত্যাশা হচ্ছে—সরকারের সমালোচনা ও সরকারের ব্যর্থতার দিকগুলো তুলে ধরা। কিন্তু জাতীয় পার্টি সে ধরনের ভূমিকা পালন করছে না।

অন্যদিকে দল হিসেবেও জাতীয় পার্টি পেছনের দিকে হাঁটছে। দলের রাজনৈতিক ভূমিকা এর অন্যতম কারণ। আরেকটি কারণ হলো, এরশাদের রেখে যাওয়া সম্পদ নিয়ে পারিবারিক কলহ।

১৯৮২ সালে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করেন সে সময়ের সেনাপ্রধান এরশাদ। পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের মতোই তিনিও একটি দল গঠন করেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠিত জাতীয় পার্টির প্রথম চেয়ারম্যান হন এরশাদ। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এরপর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে। এর পর থেকে দলটির আসন কমলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর মিত্রতা গড়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ওই সরকারে জাতীয় পার্টির একজন মন্ত্রী ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোটভুক্ত হয়ে নির্বাচন করে। মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে আবার ক্ষমতার অংশীদার হয়। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে যায় এবং এককভাবে নির্বাচন করে। মহাজোটে না থাকলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির আসন সমঝোতা হয়। যদিও পরে সব আসনে সমঝোতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বিএনপি ও এর জোট ভোট বর্জন করে। ওই নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও দলটি এককভাবে নির্বাচন করে। তবে পর্দার আড়ালে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আসন সমঝোতা হয়।

জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির ভূমিকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দিন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সংসদে যথাযথ বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারছে এমনটা মনে করছি না। বড়জোর তারা একটি প্রেসার গ্রুপের মতো কাজ করছে। তারা সরকারের বিপক্ষে কোনো কঠোর অবস্থান নিতে পারছে না, এটা হতে পারে অন্তরালে ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো সমঝোতা। জাতীয় পার্টিকে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় আসতে হলে তাদের বর্তমান অবস্থান ছাড়তে হবে। তাদের জনগণের আস্থায় আসতে হবে যে তারা প্রকৃত বিরোধী দল। এটা না করতে পারলে দলটির রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।’

এরশাদ কারাগার থেকে বের হওয়ার পর জাতীয় পার্টিতে চারটি বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয় এবং পার্টির নেতাদের একটি বড় অংশ আবার তাদের পুরনো দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগে ফিরে যায়। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি ভাঙেনি। এরশাদ-পরবর্তীকালে দলের প্রথম কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টিতে দুটি ধারার সৃষ্টি হয়। একদিকে ছিলেন এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের। পরবর্তী সময়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের হস্তক্ষেপে দলে নতুন পদ সৃষ্টি করে তাঁদের মধ্যকার বিরোধ মেটানো হয়।

তবে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আগে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পারিবারিক কলহ। ট্রাস্টের বাইরে থাকা এরশাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ কবজা করতে রওশনের সঙ্গে ‘ঐক্য’ গড়েছেন এরশাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিদিশা। জাতীয় পার্টির একটি সূত্র বলছে, বিদিশা দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চাপে রেখে জাতীয় পার্টির সর্বোচ্চ ফোরামে প্রবেশ করতে চান এবং সংসদ সদস্য হতে চান। তিনি রওশনকে সামনে রেখে দলে ভাঙন ধরাতে চান। তা না হলে নিজেই জাতীয় পার্টি নামে নতুন দলও করতে পারেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফয়সাল চিশতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি টিকে আছে, টিকে থাকবে। শেষ বয়সে এসে জাতীয় পার্টি ভাঙার দায় রওশন এরশাদ নেবেন না।’

জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘সময় ও রাজনীতির প্রয়োজনে জাতীয় পার্টির সৃষ্টি হয়েছিল। একই কারণে জাতীয় পার্টি এরশাদের আদর্শ ধারণ করে তাঁর নির্দেশিত পথে এগিয়ে যাবে। জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, তবে জাতীয় পার্টি টিকে আছে।’

এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি : দলের প্রতিষ্ঠাতার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টি ও পার্টির অঙ্গসংগঠনগুলো একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতীয় পার্টির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আজ বুধবার দুপুরে দলের কাকরাইলের কার্যালয়ে ১০ হাজার লোকের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হবে সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার অর্থায়নে। এই কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন দলের চেয়ারম্যান। এর আগে ওই কার্যালয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করবেন নেতাকর্মীরা। বিকেল ৩টায় শ্যামপুর বালুর মাঠে  আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিবেন জি এম কাদের।



সাতদিনের সেরা