kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

কভিড-১৯ ভ্যাকসিন সহজলভ্য করবে সমান্তরাল আমদানি

ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম   

১২ জুলাই, ২০২১ ০৪:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কভিড-১৯ ভ্যাকসিন সহজলভ্য করবে সমান্তরাল আমদানি

পণ্য আমদানিকারকরা সস্তায় পণ্য আমদানি করতে চান—পণ্যটি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। কোনো কোনো সময় তাঁরা পণ্যটি প্রস্তুতকারক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা তাঁদের প্রতিনিধির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন; আবার কোনো কোনো সময় তৃতীয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। প্রস্তুতকারক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁদের উদ্ভাবিত পণ্যের জন্য পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন, জিআই, কপিরাইটসহ বিভিন্ন ধরনের মেধাস্বত্ব দাবি করতে পারেন এবং সেগুলোকে যথাযথ মেধাসম্পদ কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করিয়ে নেন। ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজে পণ্যটি একটি দেশে বাজারজাত করতে পারেন এবং সেটি আবার ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিনা অনুমোদনে তৃতীয় কোনো মাধ্যমে অন্য দেশে আমদানি হতে পারে।

এ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই উদ্ভাবনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় লাইসেন্স চুক্তির মাধ্যমে পণ্যটির উৎপাদন এবং সরবরাহের অধিকার লাভ করতে পারেন। এ চুক্তিতে উদ্ভাবনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সদাতা হিসেবে লাইসেন্স গ্রহীতার কাছ থেকে কী পরিমাণ লাইসেন্সিং ফি বাবদ রয়ালটি পাবেন, কী উদ্দেশ্যে, যেমন—উৎপাদন সুবিধার অভাবে অন্যকে উৎপাদনের অধিকার প্রদান, পর্যাপ্ত উৎপাদন না করতে পারার কারণে অন্যকে উৎপাদনের অধিকার প্রদান বা একটি ভৌগোলিক বাজারে মনোনিবেশ করা, কত সময়ের জন্য চুক্তিটি বলবৎ থাকবে, উৎপাদিত পণ্যটি কোনো নির্ধারিত অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে বা এটি অন্য কোনো দেশে রপ্তানি করা যাবে কি না ইত্যাদি শর্তের উল্লেখ থাকে। এরূপ সম্মতি লাভকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পণ্যটি কোনো একটি দেশে বাজারজাত করলে তার অগোচরে অন্য কারো মাধ্যমে সেটি অন্য দেশে আমদানি হতে পারে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে উদ্ভাবনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা তার সম্মতিতে লাইসেন্স গ্রহীতা একই পণ্য একই সঙ্গে তৈরি ও বাজারজাত করতে পারেন। এরপর আমদানিকারক পণ্যটি উদ্ভাবনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাজারজাতকৃত দেশ থেকে বা লাইসেন্স গ্রহীতার লাইসেন্স চুক্তিতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার অবর্তমানে তাঁর দেশ থেকে আমদানি করতে পারেন। তবে আমদানিকারক উভয় দেশের মধ্যে সস্তা রপ্তানিকারক দেশকেই হয়তো প্রাধান্য  দেবেন, যার পণ্য বৈধভাবে তৈরি এবং যা নকল বা পাইরেটেড নয়। আর এই সস্তা রপ্তানিকারক দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল মেধাস্বত্বাধিকারীর অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। তৃতীয় পক্ষ থেকে আমদানিকারকের এরূপ আমদানি করাকে প্যারালাল ইম্পোর্টেশন বা সমান্তরাল আমদানি বলে।

ধরা যাক, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কম্পানি তাদের তৈরি কভিড-১৯ ভ্যাকসিনটি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ৫০০ টাকায় বাজারজাত করছে। এরপর দেখা গেল ইন্ডিয়ার সেরাম ইনস্টিটিউট সেটির যথাযথ লাইসেন্স নিয়ে এসে সস্তাশ্রমে ইন্ডিয়ায় ভ্যাকসিনটি তৈরি করে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩০০ টাকায় সেখানে বাজারজাত করছে। আর বাংলাদেশে এটি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্র্রাজেনেকার প্রতিনিধির মাধ্যমে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কোনো ওষুধ কম্পানি যদি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কম্পানি বা সেরাম ইনস্টিটিউটের অগোচরে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, ইন্ডিয়া বা অন্য কোনো বাজার থেকে ভ্যাকসিনটি আমদানি করে, তবে এ আমদানিকে সমান্তরাল আমদানি বলা যাবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সমান্তরাল আমদানি কী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ? প্যারিস কনভেনশন ১৮৮৩ সমান্তরাল আমদানির বিষয়ে নীরব। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৯৪-এর ক্ষেত্রে আশা করা হয়েছিল যে এটি সমান্তরাল আমদানিসহ মেধাসম্পদের সব দিক নিয়ে কথা বলবে; প্রকৃতপক্ষে সমান্তরাল আমদানি যে গ্যাট কর্তৃক অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্যের উদ্দেশ্যকে সমুুন্নত করে—চুক্তিটি এটি স্বীকার করলেও সমান্তরাল আমদানির জন্য সাধারণ অনুমতি দিতে সম্মত হতে পারেনি। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে চুক্তিটির ছয় অনুচ্ছেদ ঘোষণা করেছে যে এই চুক্তির অধীনে বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোনো কিছুই মেধাস্বত্বের নিঃশেষণ সংক্রান্ত বিচার্য বিষয়ে ব্যবহৃত হবে না। এর মানে সমান্তরাল আমদানির ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বের নিঃশেষণ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি দেশ যা-ই করুক না কেন, সে দেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিবাদ নিষ্পত্তিকারী সংগঠনের সামনে দাঁড়াতে হবে না। এরূপ নমনীয় বিধানের কারণে কিছু দেশ এটির অনুমতি দেয়, অন্যরা তা দেয় না।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে এটি অবৈধ নয়। এসব দেশের ডলারশপ, পাউন্ডশপ বা রিজেক্টশপে প্রাপ্ত পণ্যগুলো সমান্তরালভাবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানীকৃত এবং এগুলো যথেষ্ট সস্তা—এর কারণ হতে পারে সেগুলো নিম্নমানের কাঁচামাল ও সস্তাশ্রমে তৈরি, স্বত্বাধিকারী কর্তৃক বিভিন্ন বাজারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পণ্য উৎপাদন বা সেগুলোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ বা উৎস দেশের আইনিকাঠামো কর্তৃক কম খরচে পণ্যগুলো উৎপাদনে সহায়তা ইত্যাদি। আর এ সমান্তরাল আমদানীকৃত সস্তা পণ্যগুলোর প্রতি ভোক্তারা বেশি আকৃষ্ট হন। এটি স্থানীয় বাজারের মধ্যে দামের বৈষম্য রোধ এবং প্রবল প্রতিযোগিতা তৈরি করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দেশের আইনিকাঠামো কিভাবে সমান্তরাল আমদানিকে বৈধতা দেয়? সমান্তরাল আমদানিকে বৈধতা দিতে দেশগুলো নানা ধরনের রীতি-নীতি অনুসরণ করে। এদের মধ্যে একটি হচ্ছে—নিঃশেষণের নীতি, যা স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিঃশেষণ নামে পরিচিত হতে পারে। এই ধারণা অনুসারে পণ্যটি যখন কোনো নির্দিষ্ট দেশের বাজারে প্রথমে আসে, তখন স্বত্বাধিকারী সুরক্ষিত পণ্যের পুনঃ বিক্রয় নিয়ন্ত্রণের অধিকার হারান। প্রকৃতপক্ষে তার অধিকারগুলো নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং সে দেশের সব বাসিন্দা সমান্তরাল আমদানির অনুমোদন লাভ করে। এ অবস্থায় সে দেশের যেকোনো বাসিন্দা আমদানিকারক হিসেবে যেকোনো বৈধ উৎস থেকে পণ্যটি আমদানি করলে এবং তা কম মূল্যে বিক্রি করলে স্বত্বাধিকারী তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো দেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিঃশেষিত হওয়ার বিধানও অনুসরণ করে।

 ভোক্তাধিকারের সহায়ক হলেও সমান্তরাল আমদানির এ বিধানটি বাংলাদেশের কোনো আইনে লিপিবদ্ধ নেই। এর কারণ হতে পারে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব আইনগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে পেটেন্টস ও ডিজাইনস আইন ১৯১১ ট্রিপস অ্যাগ্রিমেন্টকে অনুসরণ করে না। তবে যত দূর জানা যায়, ড্রাফট পেটেন্ট আইন ২০২১-এ আন্তর্জাতিক নিঃশেষণের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো একটি পেটেন্ট পণ্য বিশ্বের যেকোনো বাজারে প্রথমে এলে বাংলাদেশের যে কেউই পেটেন্ট মালিকের বিনা অনুমোদনে সেটি আমদানি করতে পারবেন। এরূপ বিধান অন্যান্য মেধাস্বত্ব আইনেও সংযুক্ত এবং কার্যকর করা গেলে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য মেধাসম্পদ পণ্য এ দেশে সহজলভ্য করা যাবে।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা