kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

‘মেয়েকে না নিয়া বাড়ি ফিরুম না’

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১১ জুলাই, ২০২১ ০২:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘মেয়েকে না নিয়া বাড়ি ফিরুম না’

ষাটোর্ধ্ব হাসানুজ্জামান গাইবান্ধা থেকে এসেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। আহাজারি করতে করতে মেয়ে নুসরাত জাহানকে খুঁজছিলেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় কাজ করতেন তাঁর মেয়ে। দুই দিন ধরে নিখোঁজ মেয়ের সন্ধান করছেন তিনি। কখনো উঁকি দিচ্ছেন লাশ রাখার ঘরে। মর্গের লোকজনকে জড়িয়ে ধরে কখনো বলছেন, ‘আমার আম্মাজানরে দেখছেন আপনেরা! মেয়েকে না নিয়া বাড়ি ফিরুম না আমি।’

মর্গের পাশে কথা হয় অপেক্ষারত সুজন মিয়ার সঙ্গে। কিশোরগঞ্জের এই বাসিন্দার কিশোরী মেয়ে ফাতেমা ওই কারখানায় কাজ করত। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছে মেয়ে। ফজলুল হক নামের আরেক বাবা ১২ বছর বয়সী হাসনাইনের খোঁজ করছিলেন। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আমিনাবাদ কবি মোজাম্মেল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। ১২ বছর বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ওই কারখানায় পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজে করত সে। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে হাসনাইনের আর খোঁজ মিলছে না।

ভাই মোহাম্মদ আলীর খোঁজে মর্গের সামনে ছোটাছুটি করছিলেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, “আগুন লাগার পর ৬টা ৩ মিনিটে ভাই আমারে ফোন দিয়া কইছিল, ‘ভাই তোরা আমারে মাফ করে দিস। চারপাশে আগুন আর ধোঁয়া। নিঃশ্বাস নিতে পারতেছি না। ফ্লোরের গেটে আর সিঁড়িতে তালা। ৫০ থেকে ৬০ জন লোক মইরা যাইতেছি।’”

তিনি আরো বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মাত্র দেড় বছর আগে বিয়া হইছিল। ওর একটা ছেলে, নাম রুমান। ছেলেটার বয়স দুই মাস ১০ দিন। ও ফোনে বারবার কইছিল ছেলেটারে দেইখা রাখতে।’

কিশোরগঞ্জ থেকে ছেলে নাজমুলের খোঁজে মর্গে ছুটে এসেছেন বাবা চান মিয়া। ছেলের ছবি হাতে মর্গের সামনে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছিলেন। চান মিয়া বলছিলেন, ‘আমার এক ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়ে দুইটা ছোট। গরিব মানুষ। পোলাটারে কাজ পাঠাইছিলাম। জানতাম না পোলাটার লাশ খুঁজতে আইতে অইব।’

ঘটনার এক দিন পর গতকালও ওই কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের খোঁজ পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। স্বজনহারা রিক্ত মানুষগুলোর একটাই চাওয়া—স্বজনদের মরদেহ।

গতকাল শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে অবস্থান করে হৃদয়বিদারক এসব দৃশ্যের দেখা পাওয়া যায়। দুই দিন ধরে কারখানা ও হাসপাতালের মর্গে ছোটাছুটি করতে করতে ক্লান্ত মানুষগুলোর অপেক্ষা যেন আর ফুরায় না। সান্ত্বনা হিসেবে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশটি হলেও সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চায় তারা।

সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ৫২ শ্রমিকের লাশ পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে ২১ থেকে ৩০ দিন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগ বলছে, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের লাশ খালি চোখে চেনার উপায় নেই। তাই শনাক্তে একমাত্র ভরসা ডিএনএ টেস্ট। এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে স্বজনদের। পুড়ে অঙ্গার হওয়াদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ।

ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, লাশ শনাক্তে এরই মধ্যে ২৫ লাশ এবং ৩৫ জন স্বজনের স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশ হস্তান্তরে যেহেতু সময় লাগবে, তত দিন সেগুলো মর্গে রাখা হবে। এরই মধ্যে ঢামেক হাসপাতালের মর্গ থেকে ১৫টি মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্থানান্তর করা হয়েছে। আটটি রাখা হবে ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সিতে। বাকি ২৫টি মরদেহ থাকবে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) রোমানা আক্তার বলেন, ওই কারখানায় মারা যাওয়া শ্রমিকদের স্বজনদের স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। যাদের সঙ্গে ডিএনএ ম্যাচ করবে তাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

ময়নাতদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ বলেন, ৪৮টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

আহতদের ৫০ হাজার টাকার চেক : সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত তিনজনকে ৫০ হাজার টাকার চেক দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আব্দুস সালাম। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত তিন রোগীর স্বজনদের হাতে এই চেক তুলে দেন তিনি। এ সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।

ঢামেক মর্গ থেকে একজনের লাশ হস্তান্তর : এদিকে মোরসালিন মিয়া (২২) নামের একজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে ঢামেক মর্গ থেকে মোরসালিনের লাশ তাঁর মামা জুয়েল হকের কাছে তুলে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাঁর মামাও ওই কারখানায় কাজ করতেন। মোরসালিনের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায়।



সাতদিনের সেরা