kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

আগুনে ছাই ৫২ প্রাণ

► রূপগঞ্জে কারখানার আগুন নেভাতে ২৬ ঘণ্টা, সিঁড়িতে তালা
► নিখোঁজের তালিকায় ৪৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১০ জুলাই, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



আগুনে ছাই ৫২ প্রাণ

ছয়তলা বিশাল ভবনে আগুন জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে আগুনের দাপটে। ধোঁয়া আর আগুনে ঢাকা পড়া ভবনের সামনে চলছে শত শত লোকের আহাজারি। এরই মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লাশবাহী গাড়ি এসে দাঁড়াল ভবনটির সামনে। উদ্ধারকারীরা একে একে ৪৯টি বডিব্যাগ (লাশ রাখার ব্যাগ) বের করে এনে তুললেন গাড়িতে। দুপুরে যখন হুইসেল বাজিয়ে স্বজনহারাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল পাঁচটি লাশবাহী গাড়ি, তখন ভবনের পাঁচ ও ছয়তলার আগুন নেভাতে ব্যস্ত হয়ে গেল ফায়ার সার্ভিসের আরেকটি দল।

গতকাল শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতার কর্ণগোপ এলাকায় সজীব গ্রুপের মালিকানাধীন হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ছয়তলা কারখানা ভবনে ভয়াবহ আগুন এমন বিষাদমাখা পরিবেশ আর বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করে। এই আগুনের সূচনা গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে। গতকাল সন্ধ্যার ৭টার দিকে যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ততক্ষণে কেটে গেছে ২৬ ঘণ্টা। তখনো পাঁচ ও ছয়তলায় তল্লাশি চালানো বাকি ছিল। আগুন লাগার পরপর ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ হারান তিন শ্রমিক।

ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা জানা যাবে। এ ছাড়া স্বজনদের দাবি অনুযায়ী নিখোঁজ ৪৭ জনের তালিকা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

নিখোঁজ প্রিয়জনের জন্য ভবনের সামনে যখন স্বজনদের আকুতি আর আহাজারি চলছিল তখন কারখানার অন্য শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁরা সড়ক অবরোধ করতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। এ সময় আনসার সদস্যদের ওপর হামলা ও তিনটি অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

কারখানাটির ছয় হাজার কর্মীর মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রায় ৪০০ শ্রমিক ওভারটাইম (অতিরিক্ত সময়) কাজ করছিলেন বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে শ্রমিকদের দাবি, সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর সেখানে আটকা পড়ে শতাধিক। নিরাপদে বের হওয়ার আকুতি জানাতে একদল শ্রমিক চার তলায় কর্মকর্তাদের কাছে যান। সেখানে আটকা পড়েই ওই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, গতকাল দুপুর পর্যন্ত যাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের বেশির ভাগের দেহ আগুনে এমনভাবে পুড়েছে যে শনাক্ত করা কঠিন। পরিচয় শনাক্তে তাঁদের ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে।

অবশ্য গতকাল পর্যন্ত আগুন লাগার কারণ চিহ্নিত করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। ঘটনার তদন্তে ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এত নিরীহ শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, মোড়কীকরণ কাগজ (ফয়েল পেপার), তেলসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের কারণে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারখানার ছাদে ওঠার একটি সিঁড়ির তালাবদ্ধ থাকা এবং জরুরি বহির্গমনের পথ না থাকায় শ্রমিকরা আটকা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে ভবনটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং তা পুরোপুরি নির্বাপণ করা সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে তাত্ক্ষণিক ধারণা করা হলেও তদন্ত ছাড়া আসল কারণ জানা যাবে না। ঘটনার তদন্তে ফায়ার সার্ভিস পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিনি রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, আগুন পুরোপুরি নেভানো ও আবর্জনা সরানোর কাজ চলছে। সঙ্গে পাঁচ ও ছয়তলায় তল্লাশিও চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিকরা বলছেন, ভবনটির নিচতলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত। পরে ভবনের একটি ইউনিট থেকে অন্য ইউনিটে ও ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের কারণে নিচে নামতে না পেরে ওপরে ছাদে উঠতে চেয়েছিলেন শ্রমিকরা, কিন্তু সিঁড়ি তালাবন্ধ থাকায় মাঝখানে আটকা পড়ে তাঁদের মৃত্যু হয়।

সরেজমিনে কর্ণগোপ এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কমপ্লেক্সে ১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ছয়তলা যে ভবনে আগুন লেগেছে সেটির নাম ‘সেন্ট্রাল স্টোর’। ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী নূর আলম ও বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি নূরনবী কালের কণ্ঠকে জানান, নিচতলায় কাগজ ও কার্টন রাখা হয়। সেখানে আগুনের সূত্রপাত। দোতলায় ট্যাং জুস ও টোস্টের কারখানা। তিনতলায় লাচ্ছি নামের পানীয় তৈরির কারখানা। চার তলায় অফিসকক্ষ। পাঁচ তলায় সেমাই ও রাসায়নিক গুদাম এবং ছয়তলার পুরোটাই জিনিসপত্রের গুদাম। ভবনটি সেজান জুস কারখানা বলে পরিচিত হলেও কমপ্লেক্সের আরেকটি ভবনে ওই জুস তৈরি হয় বলে জানান কর্মীরা। দুই কর্মী বলেন, আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে ভবনটির তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যান স্বপ্না রানী (৪৪), মিনা আক্তার (৪৩) ও মোরসালিন (২৪) নামের তিন শ্রমিক। তাঁরা বলছিলেন, দুই থেকে পাঁচ তলার একদল কর্মী চার তলায় কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে নিরাপদে বের হওয়ার আকুতি জানান। তখন কর্মকর্তারা আগুন নিভে যাওয়ার আশ্বাস দেন। পরে সেখানেই আটকা পড়ে প্রাণ হারান তাঁরা।

শ্রমিকরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই ভবনে থাকা কারখানাগুলোতে তিন শিফটে কাজ হয়। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা, দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা এবং রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এই শিফটগুলো চলে। একেকটি শিফটে প্রায় দুই হাজার কর্মীর কাজ করার কথা থাকলেও বিকেলের শিফটে অনেক কম কর্মী কাজ করেন। তবুও হাজারের বেশি শ্রমিক কাজে ছিলেন বলে তাঁদের দাবি। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় সেকশনের পাঁচটি ফ্লোরে প্রায় ৪০০ শ্রমিক ওভারটাইম করছিলেন।’

হঠাৎ একের পর এক লাশ
গতকাল দুপুর ২টার দিকে আগুনের লেলিহান শিখা কমে এলে ভবনটির সামনে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি লাশবাহী গাড়ি আনা হয়। এ সময় উদ্ধারকারীরা একের পর এক লাশ এনে গাড়িতে তোলেন। এই দৃশ্য দেখে স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়।

ওই সময় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্সে করে আমরা ৪৯ জনের মৃতদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছি ময়নাতদন্তের জন্য।’ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধন বলেন, ‘ছয়তলা কারখানা ভবনের ওপরের দুটি তলায় আগুন নেভানোর কাজ এখনো চলছে। আমাদের সার্চ এখনো শেষ হয়নি।’

দুপুরে লাশ উদ্ধারের আগে স্বজনদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ৪৭ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তালিকা করে রূপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ নুসরাত সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক লাশ শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। সেগুলো ঢাকা মেডিক্যালে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য বলা হবে।’ 

যে কারণে এমন প্রাণহানি
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গাড়ির মই সেট করে ছাদ থেকে ২৫ জনকে উদ্ধার করেছি। বাকিরা যদি ছাদে উঠতে পারত, আমরা কিন্তু বাঁচাতে পারতাম। ছয়তলা ভবনের ছাদে ওঠার জন্য দুটি সিঁড়ি রয়েছে, যার একটির দরজা বন্ধ ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘চতুর্থ তলায় যাঁরা ছিলেন, সেখান থেকে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি তালাবন্ধ ছিল। আর নিচের দিকে সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে ছিল ভয়াবহ আগুন। উনারা নিচের দিকেও আসতে পারেন নাই, তালাবন্ধ থাকায় ছাদেও যেতে পারেন নাই।’ অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না—জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সেটা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। আমাদের তদন্ত কমিটি বের করবে কী কারণে আগুন লাগল, কত টাকার ক্ষতি হলো, অগ্নিনির্বাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না।’

দেবাশিষ বর্ধন বলেন, ওই কারখানায় কেমিক্যালসহ প্রচুর দাহ্য পদার্থ ছিল। প্লাস্টিক, ফয়েল, কাগজ, রেজিন, তেল, ঘিসহ তৈরি করা মালপত্রসহ বিভিন্ন পদার্থ ছিল। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লাগে এবং বেগ পেতে হয়। সন্ধ্যায় তিনি বলেন, আগুন নেভানোর কাজ শেষে সেখানে আরো লাশ রয়েছে কি না তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও শ্রমিকরা বলেন, একদিকের আগুন নেভালে অন্যদিকে আবার ধরে যায়। ভবনটি কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত। আগুন সব ইউনিট ও তলায় পৌঁছে গিয়েছিল, এ কারণে নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেখানে তেলও ছিল। চার তলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একসঙ্গে ২৫টি লাশ পাওয়া গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের কাঞ্চন স্টেশনের ইনচার্জ শাহ আলম বলেন, মধ্যরাতে ১২টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ভোর ৬টার দিকে আবার কারখানার চার তলায় আগুন বাড়তে থাকে।

গতকাল বিকেলে কলকারখানা পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কারখানার কোনো ত্রুটি বা দায় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি আমরা গঠন করেছি।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে আমরা সাত সদস্যের আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।’

র‌্যাবের মহাপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বিকেলে ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে বলেন, ‘তদন্ত করে এই ঘটনায় কারো দায়দায়িত্ব কী আছে, সেটা দেখা হবে। কারো গাফিলতি থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

১০ মাসে চারবার আগুন
কারখানার কয়েকজন শ্রমিক জানান, ভবনটিতে গত ১০ মাসে চারবার আগুন লাগে। এর আগে আগুন লাগলে নিচের ও ওপরের ইউনিটগুলোর কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। মাসুদ ও হোসেন নামের দুই শ্রমিক বলেন, এবারের আগুন নিভে যাবে বলে সবাইকে ভেতরে থাকতে বলেন অফিসাররা। তবে তাঁদের সেকশনের লোকজন গেটের তালা ভেঙে বের হতে পারে। তিন তলা থেকে যাঁরা চার তলায় চলে গেছেন তাঁরাই আটকা পড়েছেন। বারবার আগুন লাগলেও অগ্নিনির্বাপণের কোনো প্রশিক্ষণ শ্রমিকদের দেওয়া হয়নি বলে জানান তাঁরা। এদিকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন।

স্বজনদের আহাজারি থেকে বিক্ষোভ
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই কারখানা ভবনের সামনে আটকা পড়া শ্রমিকদের খোঁজে স্বজনরা ভিড় করতে থাকেন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত স্বজনের খোঁজ না পেয়ে অনেকে বিলাপ করতে শুরু করেন। তাঁদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনরা বলছিলেন, ভবনটির চার তলা থেকে কোনো শ্রমিকই বের হতে পারেননি। সেখানে অন্তত ৭০ জন কাজ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইনচার্জ মাহবুব, সুফিয়া, তাকিয়া, আমেনা, রহিমা, রিপন, শম্পা রানী, নাজমুল, মাহমুদ, রিতা, তাছলিমার নাম জানান তাঁরা।

সন্তানের খোঁজ না পেয়ে পাগলপ্রায় ফিরোজা বেগম (৩৮) দুপুরে কারখানার সামনে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ঘিরে ধরেন। কারো হাতে ধরে, কারো পায়ে ধরে বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার মায়েরে আইনা দেন। ও স্যার, আমার মায়ের হাড্ডিগুলা খুঁইজ্জা দেন স্যার।’ ফিরোজা জানান, তাঁর কিশোরী মেয়ে তাসলিমা (১৬) কারখানায় কাজ করত। তাকে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। মানজিলা বেগম নামের আরেক নারী জানান, তাঁর ছেলে নাজমুল হোসেন (২৫) আগুন লাগার পর ভেতরে আছেন বলে ফোনে একবার জানালেও পরে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সহকর্মী ও স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে অনেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। দুপুরে কারখানার সামনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তাঁরা। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় ধাওয়াধাওয়ি হয়। কারখানার গেটসংলগ্ন আনসার ক্যাম্প থেকে চারটি শর্টগান ছিনিয়ে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা পাশের খালে ফেলে দেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে তিনটি শর্টগান উদ্ধার করা গেলেও আরেকটি পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের হামলার শিকার হন কয়েকজন সংবাদকর্মীও। প্রায় এক ঘণ্টা পর রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রাতে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির জন্য কারা দায়ী, সেটা তদন্ত করে দেখা হবে। হতাহত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহতদের আশু আরোগ্য কামনা করেন রাষ্ট্রপতি।

পৃথক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।



সাতদিনের সেরা