kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

শুভ জন্মদিন

প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক   

৭ জুলাই, ২০২১ ০৪:৩২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব

জেবুন্নাহার আইভি জন্মেছিলেন অনেকটা সোনার চামচ মুখে নিয়ে। ১৯৪৪ সালের ৭ জুলাই ভৈরবের সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। মা হাসিনা বেগম ছিলেন গৃহিণী এবং বাবা জালালউদ্দিন আহমেদ ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন। আট বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে পঞ্চম আইভি রহমান বেড়ে ওঠেন যৌথ পরিবারে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় জন্মভূমি ভৈরবে। তিনি ১৯৬০ সালে বাংলাবাজার স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৬৯ সালে ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

জেবুন্নাহার আইভি বিয়ের পর হয়ে গেলেন আইভি রহমান। জিল্লুর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে তিনি তাঁর নিত্যসঙ্গী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁদের বিয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রধান সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও সম্পর্কিত ছিলেন আইভি। তাঁর বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। সেদিক থেকে আইভি রহমান শেখ রেহানার খালাশাশুড়ি। তাঁদের দুই কন্যা তানিয়া বাখ্ত ও তনিমা রহমান ময়না এবং একমাত্র পুত্র নাজমুল হাসান পাপন।

ছাত্রজীবনেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আইভি রহমান সম্পৃক্ত হয়েছেন। ১৯৬৯-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। ১৯৬৯ সালে মহিলা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আইভি রহমান ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ নেন, অন্য নারীদের প্রশিক্ষণেও নেতৃত্ব দেন। দেশ মাতৃকার টানে কাজ করেন স্বাধীন বাংলা বেতারেও। মা, মাটি, দেশ ও স্বাধীনতা বিষয়ক বিভিন্ন কথিকার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও উদ্যম সৃষ্টিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হন এবং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক কাজেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি পুনর্গঠন এবং সমাজসেবায় রয়েছে তাঁর যুগান্তকারী ভূমিকা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি যথাক্রমে জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে আইভি রহমানকে দেওয়া হয় স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (মরণোত্তর)। সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত আইভি রহমান নিষ্ঠাবান ছিলেন পরিবার ও সন্তান-সন্ততির প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে। তাঁর একমাত্র পুত্র নাজমুল হাসান পাপন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে এমবিএ ডিগ্রিধারী। বর্তমানে তিনি ভৈরব-কুলিয়ারচর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। তাঁর বড় মেয়ে তানিয়া বাখ্ত বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

একাধারে সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ, সহযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আইভি রহমান আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে শান্তির পথ অবলম্বন করে শেখ হাসিনার পাশে থেকেছেন। সুস্থ, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য লেখালেখি করেছেন। ‘সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা’ শিরোনামের একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে এ দেশের মানুষ মেনে নেয়নি, তারা মেনে নেয়নি তুলনাহীন পৈশাচিক বর্বরতায়...এই হত্যাকাণ্ডের প্রচণ্ড আকস্মিকতায়, বেদনায় মানুষ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, বোকা চোখে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছিল ঘৃণিত খুনি উন্মুক্ত অস্ত্রধারী এবং তাদের পোষ্যদের উল্লাস। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে জাতি মেনে নেয়নি...।’ আইভি রহমান কি জানেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য প্রকাশ্য সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলাও সভ্য বাঙালি মেনে নেয়নি। জাতি আজও মেনে নিতে পারেনি আইভি রহমানের অকালপ্রয়াণ।

আজীবন সংগ্রামী, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আইভি রহমানের জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : গবেষক ও গবেষক
সহযোগী অধ্যাপক, বিসিএস শিক্ষা
[email protected]



সাতদিনের সেরা