kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

ঢাকার বাইরে অক্সিজেনের চাহিদা চার গুণ বেড়েছে

মাসুদ রুমী    

২ জুলাই, ২০২১ ০২:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঢাকার বাইরে অক্সিজেনের চাহিদা চার গুণ বেড়েছে

মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে খুলনায় অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। রাজশাহী হাসপাতালে প্রতিদিন এখন গড়ে আট হাজার লিটার অক্সিজেন সরবরাহ করতে হচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য, যা দুই মাস আগে ছিল মাত্র দু-তিন হাজার লিটার। তবে স্থানীয়ভাবে কোনো উৎপাদন প্রতিষ্ঠান না থাকায় রাজধানীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সেখানকার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ঢাকায়ও করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। আর এতে রাজধানীতেও অক্সিজেনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন না বাড়ায় সামনের দিনগুলোতে সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিকল্প প্রস্তুতি না নিলে অক্সিজেন সংকট তীব্র হয়ে উঠতে পারে।  

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে চারটি প্রতিষ্ঠান অক্সিজেন তৈরি করে। এগুলো হচ্ছে লিন্ডে বাংলাদেশ, স্পেক্ট্রা অক্সিজেন, ইসলাম অক্সিজেন ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাসেজ। করোনা মহামারির আগে দেশে দৈনিক ১০০ টন মেডিক্যাল গ্রেড অক্সিজেনের চাহিদা ছিল। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সেই চাহিদা ৩০০ টন ছাড়িয়ে গেছে। এই চাহিদা আরো বাড়তে পারে।

সূত্র জানায়, দেশের বড় বড় হাসপাতালে প্রতিদিন সরবরাহকৃত ৫০ শতাংশের বেশি তরল অক্সিজেন সরবরাহ করে লিন্ডে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দিনে ১০০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫ টন সরবরাহ দিচ্ছে স্পেক্ট্রা অক্সিজেন। অন্যরা বাকিটা সরবরাহ করছে। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে ১৩৫ টনের মতো জোগান মিলছে। ভারত থেকে সম্প্রতি লিন্ডে বাংলাদেশ ও স্পেক্ট্রার অক্সিজেন আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৮০ টনের বেশি জোগান কমে গেছে।

যদিও সম্প্রতি সরকারিভাবে দেশে এই মুহূর্তে ৯০০ টন অক্সিজেন মজুদ আছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি জানান, দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে আরো ৪৫০ টন অক্সিজেন মজুদ রয়েছে।

জাহিদ মালেক বলেন, দেশে বর্তমানে সাধারণ ও কভিড রোগী মিলে ৭০-৮০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পিকের সময় সর্বোচ্চ অক্সিজেন চাহিদা ছিল ২১০ টন পর্যন্ত। এই মুহূর্তে দেশে দৈনিক অক্সিজেন উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে ২২০ থেকে ২৩০ টন। তিনি বলেন, আগামী মাসে একটি বেসরকারি সংস্থা ৪০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করবে। জুলাই মাসে অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা আরো ৪০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করবে। ফলে দেশে কভিডকালীন তৃতীয় ঢেউয়ের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে তা মোকাবেলা করতে কোনো সমস্যা হবে না। করোনা চিকিৎসায় রোগীর খারাপ অবস্থা হলে তখন অক্সিজেন মূল ভূমিকা পালন করে। এ কারণে অতি দ্রুত দেশের সরকারি ১৩০টি হাসপাতালে এখন সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক (জনসংযোগ) ডা. সাগুফতা আনোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অক্সিজেনের চাহিদা তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। তবে আমরা এখনো সামলাতে পারছি। লিন্ডে আমাদের বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহ করছে।’

জানতে চাইলে লিন্ডে বাংলাদেশের মুখপাত্র সায়কা মাজেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন ১০০ টানের কমবেশি অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারছি। এখন পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ হয়নি। সরকার লকডাউন দেওয়ায় ভালো হয়েছে। এতে সংক্রমণের হার কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরের জেলায় আগে আমাদের সপ্তাহে একটি ট্যাংকার পাঠালে হতো। কিন্তু এখন প্রতিদিন একটি করে ট্যাংকার পাঠাতে হচ্ছে।’ 

এদিকে ঢাকার বাইরে অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রতিদিন অক্সিজেন ট্যাংকার যাওয়া-আসায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগছে। চারদিকে চাহিদা বাড়ায় সময়মতো ট্যাংকার পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। অক্সিজেন সংকটে এক ঘণ্টায় সাতক্ষীরা মেডিক্যালে ছয় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটের এ ঘটনা ঘটে।

রাজশাহী হাসপাতালে দুই মাস আগে অক্সিজেনের চাহিদা ছিল মাত্র দু-তিন হাজার লিটার। গত এক মাসে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়েছে প্রায় তিন হাজার লিটার। সেটি বেড়ে গিয়ে এখন প্রতিদিন করোনা রোগীদের জন্য প্রায় আট হাজার লিটার অক্সিজেন সরবরাহ করতে হচ্ছে। হাসপাতালের ১২টি ওয়ার্ডে গতকাল বৃহস্পতিবার ৪০৫ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিল ৪৬২ জন। অক্সিজেন লাইন প্রতিটি শয্যায় না থাকায় অনেকেই বাইরে থেকে সিলিন্ডার কিনে চিকিৎসা নিচ্ছে।

রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোজার আগে আমাদের প্রতিদিন দু-তিন হাজার লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন হতো। এখন সেটি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে আট হাজার লিটার বা আট টন। এক মাস আগে এই চাহিদা ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার লিটার। আমরা এখন প্রতিদিন জাতীয় অক্সিজেন সরবরাহ ডিপো থেকে ১০ হাজার লিটার অক্সিজেন পাচ্ছি। ফলে আপাতত অক্সিজেনের সংকট নেই। তবে যে হারে রোগী বাড়ছে, তাতে বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে আমাদের।’

এদিকে খুলনা অক্সিজেন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেটি বর্তমানে উৎপাদনে নেই। প্রতিষ্ঠানটিতে একটি বিস্ফোরণ ঘটনায় ও ভোক্তা না থাকায় দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় স্পেক্ট্রা ও লিন্ডে এখানে অক্সিজেন সরবরাহ করছে। এর মধ্যে স্পেক্ট্রাই একমাত্র সিলিন্ডার রিফিলের ব্যবস্থা করতে পারছে। আর লিন্ডের রিফিল কেন্দ্র যশোরে।

খুলনায় অক্সিজেন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে আগেই লিন্ডে প্লান্ট বসিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে হাসপাতালে পাইপলাইনের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করছে। আবার স্পেক্ট্রাও সম্প্রতি সেখানে একটি প্লান্ট বসিয়েছে। স্পেক্ট্রার বসানো প্লান্টটির এখনো  কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখানের ভিআই প্লান্টটি আগে সপ্তাহে বা ১০ দিনের মাথায় একবার রিফিল করলে হতো। কিন্তু বর্তমানে সেটি কখনো এক দিন পর এক দিন আবার কখনো প্রতিদিনই রিফিল করতে হয়।

স্পেক্ট্রা অক্সিজেন কম্পানির খুলনা বিক্রয়কেন্দ্রের ইনচার্জ সজিব রায়হান বলেন, হাসপাতালে বেড সংকটের কারণে খুব বেশি সমস্যা না হলে হাসপাতালে রোগী না নিয়ে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ছোট সিলিন্ডারের চাহিদা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। আগে ১.৪ সাইজের সিলিন্ডার যেখানে প্রতিদিন ৩০টি করে চলত, এখন সেখানে চলে এক শরও বেশি। লিন্ডে বাংলাদেশের সাইকা মাজেদ বলেন, তাঁদের সিলিন্ডারগুলো ঢাকা থেকে রিফিল করে খুলনায় পাঠানো হয়। তবে শিগগিরই তাঁরা খুলনায় রিফিলের ব্যবস্থা চালু করবেন।

খুলনা অক্সিজেন কম্পানির ম্যানেজার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ঢাকা থেকে লিকুইড অক্সিজেন আনা হয় সড়কপথে। এরপর খুলনা অক্সিজেন লিমিটেডে সেগুলো সিলিন্ডারে রিফিল করে সরবরাহ করা হয়। তাই কিছুটা হলেও সময় ব্যয় হয়।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. দিলিপ কুমার কুণ্ডু জানান, অক্সিজেনের চাপ কমে গেলে মেশিনে টেনে পারে না। এ জন্য দ্রুত স্পেক্ট্রা কম্পানির প্লান্টটির কার্যক্রম শুরুর জন্য বলা হচ্ছে। ট্যাংক বসিয়ে ভ্যাকুয়াম রুমের কাজ চলছে। অন্যান্য কিছু কাজ শেষ হলে পাইপলাইন যুক্ত করেই দুটি প্লান্টের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা গেলে সার্বক্ষণিক প্রেসার ঠিক থাকবে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেন দরকার হয় খুব বেশি। বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেনের সরবরাহ আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দিচ্ছে চট্টগ্রামের শিল্প গ্রুপগুলো। ফলে ভারত অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করলেও আমাদের অক্সিজেনের সংকট হয়নি। তবে ঈদ-পরবর্তী পরিস্থিতি কী হয়, সেটা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. ফরিদ হোসেন মিঞা বলেন, ‘সাধারণ সময়ের চেয়ে করোনায় মেডিক্যাল অক্সিজেনের চাহিদা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশীয় ছোট ছোট কম্পানিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। বিদ্যমান কম্পানিগুলো এবং নতুনদের মাধ্যমে কিভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা আমাদের আছে।’

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী এবং কৌশিক দে, খুলনা।



সাতদিনের সেরা