kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

পরার্থপরতার ব্রত শিক্ষকতা ও রাজনীতি

গোলাম কবির   

৩০ জুন, ২০২১ ০৪:২৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পরার্থপরতার ব্রত শিক্ষকতা ও রাজনীতি

শিক্ষকতা ও রাজনীতি মানবহিতৈষণার এপিঠ-ওপিঠ। দুটিই ব্রত। এই ব্রত মানবমুক্তির দুস্তর সাধনা। সেই আদিকাল থেকে মানুষ, এমনকি অন্যান্য জীবজগৎ শিক্ষক হিসেবে পেয়েছে প্রকৃতিকে। বাঙালি কবি সুনির্মল বসু প্রকৃতিকে শিক্ষকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র।’ তিনি আকাশ-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি সামনে রেখে কিভাবে মানুষ সেখান থেকে অভ্রান্ত শিক্ষা পায় তার আকর্ষণীয় বর্ণনা দিয়েছেন। প্রকৃতির কবি বলে খ্যাত ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতিকে জীবন্ত সত্তা মনে করতেন। বহু যুগের মেধা কর্ষণের ভেতর দিয়ে ভূয়োদর্শী মানুষ শিক্ষক হিসেবে প্রকৃতির উদার-উন্মুক্ততার শিক্ষণীয়তাকে দখলের চেষ্টা করে আসছে। কতটুকু পেয়েছে, মহাকাল তার বিচার করবে।

গুহাচারী আদিম মানুষ সভ্যতার আলোয় চলতে গিয়ে সমাজবদ্ধ থেকেছে অস্তিত্বের প্রয়োজনে। সেই সমাজের নেতৃত্বে এসেছে অপেক্ষাকৃত উত্তম বোধসম্পন্ন পরাক্রমী মানুষ। সে ধারার বাহ্যিক অবসান হলেও নানা পরাক্রমতা এখনো বিদ্যমান।

বহুযুগের অভিজ্ঞতায় সচেতন মানুষ উপলব্ধি করেছে, শিক্ষকতা ও রাজনীতির জগতে পরার্থপরতার ব্রত কোনো কোনো ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত থাকা কল্যাণকর।

সুদীর্ঘ অতীতের কল্পলোকের ঘটনাপুঞ্জ, কল্পকথা, পুরাণ ইত্যাদিকে গত শতকেও অনেকে ইতিহাস বলে জেনেছে। তাই তখন যুগ বা কালকে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি নামে বিভক্ত করেছে। ইতিহাস যে কতিপয়ের শক্তিমদমত্ততায় ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ আর যুদ্ধবিলাস নয়, মানবকল্যাণ ও সমাজ উন্নয়নে কার কতটুকু অবদান তার বিশ্লেষণ, সে সত্য আধুনিক ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

একদা বর্শাধারী শাসকরা শক্তি প্রয়োগ করে শাসনাধীনদের নিয়ন্ত্রণ করেছে। তা ছাড়া শাসিতদের ধর্মের দোহাই দিয়ে শেখানো হয়েছে নৃপতিরা স্রষ্টার ছায়া ‘জিল্লুল্লাহু’। তাই সাধারণ মানুষ সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে সমর্পিত থেকেছে। গত শতক পর্যন্ত যার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়নি। জনগণের নেতৃত্ব বাছাইয়ের বয়স বেশি নয়। বর্তমান দুনিয়ায় এখানেও ভেজাল প্রবেশ করেছে নানাভাবে। পেশিশক্তি আর কড়ি ছিটানোর যেন যুগল নিয়ন্ত্রণ, সবাই মানবকল্যাণের প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতার শীর্ষে বসে। তারপর ক্ষমতা তাকে অন্ধ করে দেয়। ব্যতিক্রমী প্রাতঃস্মরণীয়দের সংখ্যা দূরবীক্ষণীয় হয়ে আসছে। এর মূলে ‘লোভ’ নামের দুর্দমনীয় ‘রিপু’। এই রিপু বা শত্রু সংবরণের উপায় আছে। যারা সংবরণ করতে পারে তাদের হাতেই মানবসেবার দায়িত্ব থাকা উচিত। রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষেরও আগে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছিলেন। তিনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার কালে পরাধীন দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামীণ জনপদ পর্যবেক্ষণ করে ‘আত্মশক্তি’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকে বড়ো করিয়া দেখিবার শক্তি অতি অল্প লোকের আছে। বিশেষত, লোভ যখন বেশি হয় তখন দেখিবার শক্তি আরো কমিয়া যায়।’ (‘সফলতার সদুপায়’) কিছুদিন থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ রাজনীতি ব্যবসায় মনোযোগী। উদ্দেশ্য মুনাফা। এর পেছনে থাকে লোভ। আর লোভ মানবকল্যাণ চেতনাকে পেছনে ফেলে দেয়। অথচ রাজনীতিকের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানবমুক্তি।

আজকের দিনে রাজনীতি অনেকটা মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। সুতরাং মুনাফার জন্য তাঁদের প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে হয়। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনীতিককে নতজানু হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এতে উভয় পক্ষই উপকৃত হয়। জনগণ উপেক্ষিত থাকে। দেখা যাচ্ছে, ডিগবাজিবিশারদরা ও কিছু অবিবেকি লুণ্ঠক রাজনীতিতে অভিষিক্ত। তাঁদের আমলানির্ভর থাকতে হয়। এতে সেবকরাই হয়ে ওঠেন দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা।

জেনারেল আইয়ুব খান রাজনীতিকদের বেতনভুক্ত কর্মচারী বানিয়েছিলেন। ১৯৭৫-এর পর তাঁদের রমরমা দেখা যায় রাজনীতিকে ‘রাজনীতিকদের জন্য ডিফিকাল্ট’ করার প্রকল্পে। প্রকৃত রাজনীতিক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন এবং জনগণ রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে বসেছে। এ অবস্থা থেকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে। এ ছাড়া মতবাদী ফাঁদের পরিণতি তো বহু পুরনো। তবু মানুষ নতুন করে সেই ফাঁদে পা দেয়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন পরহিতব্রতী রাজনীতিক। কারণ তাঁরাই দেশ ও জাতির নিয়ামক। এতসব কথা স্মরণে রেখে আমরা রাজনীতির কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এবার শিক্ষার দিকটি ফিরে দেখি।

প্রথমে বলে রাখি, জীবিকার কোনো সুলভ পথ না পেয়ে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে শিক্ষকতা করতে আমি বাধ্য হই। তাই এর অলিগলি সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে। সত্যিকার শিক্ষকের বৈশিষ্ট্যের অভাব আমার মাঝে ভয়ংকরভাবে প্রকটিত। তবু লিখছি, ঠেকে শিখেছি বলে। শিক্ষকতা করতে এসে নীতিবাক্য আওড়িয়েও নির্মোহ থাকতে পারিনি। সেই অপবাদ মাথায় তুলে নিয়ে ‘শিক্ষকতা কার সাজে’ তার পরিচয় দিতে এই অক্ষম আয়োজন।

সূচনায় আমরা বলেছি, আমাদের দৃশ্যমান আদি শিক্ষক প্রকৃতি। তার পরিক্রমার বিষয় থেকে আত্মরক্ষার কৌশল শিখে মানুষ পথে নেমেছে। রাজনীতি মূলত পরহিতব্রত। শিক্ষকতাও তেমনি ব্রত। ব্রত ছাড়া বেতনভোগী পেশাদার কর্মচারী হওয়া যায়, ব্রতী শিক্ষক হওয়া যায় না।

সাতচল্লিশের দেশভাগের ডামাডোলের পরও শিক্ষাসংক্রান্ত কিছু নৈতিক শিক্ষার বিষয় আমাদের পাঠ্যতালিকায় ছিল। সেখানে শিক্ষাগুরু ঋষি আয়োদ ধৌম্য ও তাঁর শিষ্য আরুণি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তাতে আমরা শিক্ষককে অশেষ শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে গণ্য করার দীক্ষা পেয়েছিলাম। ওই মহাভারতেই শুক্রাচার্যকে শিক্ষাগুরু হিসেবে দেখেছি, যেখানে শিষ্য হিসেবে ছিলেন কচ। ‘বিদায় অভিশাপে’ রবীন্দ্রনাথ কাহিনির নবজীবন দান করেন। এখানে মর্তজীবনের একটি সত্য চিরন্তন হয়ে আছে। ‘হেথা সুখ গেলে স্মৃতি একাকিনী বসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য গৃহে।’ এতসব উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য ঋষি ধৌম্য ও শুক্রাচার্য বিদ্যাদান করতেন, বিনিময় ছাড়া। তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন যথাক্রমে কৃষিকাজ ও পশু পালন করে। প্রসঙ্গত নিকট ইতিহাসের দুজন শ্রদ্ধেয় ধর্মবেত্তা ও নিঃস্বার্থ শিক্ষকের নাম করা যায়। তাঁরা হলেন ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)। তাঁরা জীবিকার জন্য যথাক্রমে খাদ্যশস্য ও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। পারিশ্রমিকের ভাবনা তাঁদের মাথায় আসেনি। সে যুগ গত হয়ে গেছে, তাইতো দেবযানীর অক্ষম ‘দীর্ঘশ্বাস’ ফেলে ভাবছি, হায় শিক্ষক! হায় শিক্ষা! এখন সেবাব্রতীরা শিক্ষকতায় আসেন না। অথচ সুলভ শিক্ষকতা প্রাপ্তিতে অশিক্ষকদের নীতিহীন প্রতিযোগিতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বিভূতিভূষণ আর সৈয়দ মুজতবা আলী দুর্দশাগ্রস্ত শিক্ষকের চিত্র এঁকেছেন। সর্বনাশা দেশভাগে হলো কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। নিবেদিতপ্রাণ অনেক শিক্ষক দেশান্তরিত হলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল হয়ে গেল অনেক অশিক্ষক পাস করাদের হাতে। তবু যেটুকু ছিল, তা-ও লুণ্ঠিত হওয়ার উপক্রম। সরকার বেতন-ভাতা কম দেয় না এখন। বলতে গেলে সরকারি-বেসরকারিতে তেমন তফাত নেই। এখন ফন্দি-ফিকির করে অনেকে অনায়াসে শিক্ষকতায় আসছেন। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা কলুষিত করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পৈতৃক সম্পত্তিতে রূপান্তর করতে চলেছেন। কোনো কোনো শিক্ষক সগর্বে বলেন, তাঁর গোটা পরিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরিণতিতে এমন ফল ফলেছে যে এখানকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র্যাংকিংয়ে স্থান পায় না। নিবেদিতপ্রাণ ব্রতী শিক্ষকের পরিবর্তে কিছু ধান্দাবাজ আর ডিগবাজিবিশারদ শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা বিলুণ্ঠিত করছেন। তাঁরা রাতারাতি খোলস পাল্টে ক্ষমতার পদলেহনে ব্যস্ত থাকেন। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের অধঃপাতে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর সঙ্গে করুণাহীন করোনার নিষ্ঠুরতা তো আছেই।

প্রবচনে আমরা পড়তাম, ‘সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই’ বা উদাহরণ দিয়েছি ‘শায়েস্তা খাঁর আমল’। তা নিয়ে হা-হুতাশ চলে, সমাধান মেলে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে শিক্ষক নামের কিছু মানুষ রাজনীতিসংশ্লিষ্ট হয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উন্নতির জন্য কামড়াকামড়ি করছেন। শিক্ষা অধঃপাতে নিপতিত হচ্ছে। রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে হয়তো আর দেখা যাবে না। তবে সহনীয়তায় ফিরে আসতে হবে। আর শিক্ষার এই বেহাল থেকে মুক্তি দিতে হলে সত্যিকার শিক্ষানুরাগী ও দেশপ্রেমিকদের কাণ্ডারি নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ শিক্ষকতা ও রাজনীতি পেশা নয়, পরার্থপরতার ব্রত।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ



সাতদিনের সেরা