kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

আজও গোলকধাঁধায় বিএনপি

নির্বাচনকালীন নেতৃত্ব নির্বাচনই বড় চ্যালেঞ্জ

এনাম আবেদীন   

৩০ জুন, ২০২১ ০২:৪৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নির্বাচনকালীন নেতৃত্ব নির্বাচনই বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলা অভিধান অনুযায়ী গোলকধাঁধা শব্দের অর্থ হলো জটিল পথ, যেখান থেকে সহজে বের হওয়া যায় না। বিএনপিও এখন ওই গোলকধাঁধায় পড়েছে বলেই পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি দলটির নেতারাও মনে করতে শুরু করেছেন। কারণ যে সংকটে বিএনপি এক-এগারোর থেকে পড়েছে, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ কী, তা দলটির নেতারাও জানেন না। অথচ আর মাত্র দুই বছর পর ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ওই নির্বাচনে অংশ নিতে হলে বিএনপিসহ সমর্থক জোটকে একজন নেতা ঠিক করতে হবে; যাঁর নেতৃত্বে দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে। বিএনপি ও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলছেন, দলটির সামনে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ কৌশলগত কারণে বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে তাঁরা আলোচনাও তুলতে পারছেন না। কারণ ওই আলোচনার অর্থই হলো দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রুষ্ট করা; যদিও নির্বাচনকালীন নেতা নির্বাচনের অর্থ তারেককে বাদ দেওয়া নয়। কারণ নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না পারলে তারেক কখনোই দেশে ফিরতে পারবেন না বলে মনে করেন দলের নেতারা। তবু নেতারা আপাতত এ বিষয়ে নীরব থাকারই কৌশল নিয়েছেন। তারেকের নেতৃত্বে তাঁরা এখন সময় পার করছেন মাত্র। বলছেন, কী হবে সেটি সময়ই বলে দেবে।

নেতৃত্বের সংকটের কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে নেতা হিসেবে ‘হায়ার’ করে তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। কিন্তু তিনি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বহীন অবস্থায় বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে জয়লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, কূটনীতিকদের এমন প্রশ্নের জবাব নির্বাচনের আগে বিএনপি বা ড. কামাল হোসেন স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। দেশের জনগণের মধ্যেও বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ছাড়াও বাংলাদেশে ‘ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন শক্তি বা সংস্থা বিএনপির কাছ থেকে দূরে চলে যায় বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে।

দ্বিতীয়ত, যে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণে প্রায় ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই সমীকরণ বদলাতে হবে দলটিকে। তৃতীয়ত, দলগত, নাকি জোটগতভাবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে সেটিও ঠিক করতে হবে আগামী এক বছরের মধ্যে। চতুর্থত, আন্দোলনের মুখে সরকারকে চাপে ফেলে, নাকি সরকারের নির্ধারণ করা ‘ছক’ অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেবে সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে দলটিকে।

বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হলো—গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আদায় করতে হলে কঠোর আন্দোলন ছাড়া উপায় নেই। আবার আন্দোলন করতে চাইলে আগেই তার জোট গঠন করতে হবে। সে হিসেবে বিএনপির সামনে সময় আর খুব বেশি নেই বলে দলটির নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি শুভাকাঙ্ক্ষীরাও মনে করছেন।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, ‘বয়সের কারণে এবার আর ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে হবে না। নতুন একজনকে হায়ার করতে হবে এবং এটা তারেক ও খালেদা জিয়াই ঠিক করে দিতে পারেন।’

গত রবিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সংগঠন, জনসমর্থন সবই আছে, কেবল নেতা নেই। নেতা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না।’

‘তাই আমি মনে করি, বিএনপির সিনিয়র একজনকে তারেক সামনে আনুক। আর অন্য কাউকে বিশ্বাস না হলে তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে আনতে হবে। কিন্তু নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে একজনকে লাগবেই। তা না হলে বিএনপিকে আরো কয়েক বছর গোলকধাঁধায় থাকতে হবে।’ বলেন বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ‘যথাযথ কৌশল এবং নেতৃত্বের অভাবেই বিএনপি গোলকধাঁধায় পড়ে আছে। এখান থেকে বের হতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি এবং যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন।’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘একজন যোগ্য নেতার নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনে অংশ না নিতে পারলে বিএনপির পক্ষে ফলাফল ঘরে তোলা কঠিন হবে।’

২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে এক যুগের বেশি সময় লন্ডনে বসবাস করছেন তারেক রহমান। অন্যদিকে দুটি দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী আদেশে কারামুক্ত হলেও সাড়ে তিন বছর ধরে রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। শারীরিকভাবে তিনি অসুস্থও। ফলে তারেকের নেতৃত্বেই এখন বিএনপি চলছে। নানা আলোচনা ও বিতর্ক সত্ত্বেও তারেকের নেতৃত্বেই বিএনপি এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আট হাজার মাইল দূরে থেকে সংগঠন চালাতে পারলেও নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ক্ষমতায় আনা কঠিন বলে বিএনপির পাশাপাশি সুধীসমাজেও আলোচনা উঠেছে। বলা হচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় না আসতে পারলে তারেক দেশে ফিরতে পারবেন না। তাই সব কিছুর আগে বিএনপিকে নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। তা ছাড়া বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশে ‘ক্ষমতার বিকল্প বিভিন্ন কেন্দ্র’ বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তারেকের ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হয় জোট গঠনের মধ্য দিয়ে কাউকে নেতা হিসেবে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে; নয়তো বিএনপির মধ্য থেকেই একজনকে নেতা নির্বাচন করে তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে যেতে হবে। তবে কে নেতা হবেন তাঁর বিষয়ে সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তির পাশাপাশি বিএনপির ভেতরে ও বাইরে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে।

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করছেন, বিএনপিতে কোনো নেতৃত্বের সংকট নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের কারণে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন মনে করেন, বিএনপিতে নেতার সংকট নেই। তবে নির্বাচনের সময় নেতা প্রয়োজন হলে সেটি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানই ঠিক করবেন। এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই স্পিকার বলেন, ‘ফ্রন্ট গঠন করে নেতৃত্বে আনার মতো কোনো নেতা এখন আর দৃশ্যমান নেই। তাই দায়িত্ব কাউকে দিতে হলে সেটা বিএনপির মধ্য থেকেই দিতে হবে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতে, ‘বিএনপি গোলকধাঁধায় কেন আছে এটি তারা নিজেরাও বুঝতে পারছে না। সম্ভবত এই প্রশ্ন নিয়েও তাদের মধ্যে গোলকধাঁধা আছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরে থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়া যায় না—এটা আমি মনে করি না। কিন্তু সেই নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি থাকা উচিত এবং তার আদৃষ্ট পথে আন্দোলন গড়ে তোলার যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা দেশে থাকতে হবে। আমি দুটিরই অভাব দেখি।’

‘নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলের এই নেতা বলেন, ‘নির্বাচনী আন্দোলনকে নিজেদের বিজয়ের লক্ষ্যে গড়ে তোলার যোগ্যতা বিএনপি নেতৃত্বের আছে কি না সেটি ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট থেকে বের হতে যেসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে হবে সেগুলো বিএনপি পারবে—এমন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।’

জানা গেছে, যেসব কর্মসূচির ভিত্তিতে বিএনপি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে চাইছে তার একটি গাইডলাইন তৈরি করেছে দলটির স্থায়ী কমিটি। কিন্তু জোট গঠনের বিষয়ে প্রণিধানযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। কারণ বৃহত্তর জোট গঠনে দেশের প্রগতিশীল বলে পরিচিত উদার ও বামপন্থী দলগুলোর সমর্থন লাগবে। কিন্তু ২০ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে জামায়াত থাকা পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা করে কোনো লাভ হবে না বলে সব কিছু থেমে আছে।

জামায়াতকে জোটে রাখা না রাখার পাশাপাশি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক এখন লন্ডনে বসবাসরত তারেক রহমান। কিন্তু জামায়াত প্রশ্নে নিষ্পত্তির পাশাপাশি করণীয় অন্যান্য বিষয়েও তারেক এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত মতামত দেননি বলে সব ইস্যু ঝুলে আছে।

২০২৩ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় বিএনপির ক্ষমতার বাইরে থাকার ১৭ বছর পূর্ণ হবে। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে সফল হতে না পারা এবং ২০১৮ সালে ‘নেতৃত্বহীন’ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফলাফল ঘরে তুলতে না পারার ঘটনায় দীর্ঘ সময় দলটিকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে।



সাতদিনের সেরা