kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

রাত জাগা ফুটবল উৎসব

ইকরামউজ্জমান   

২৮ জুন, ২০২১ ০৩:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাত জাগা ফুটবল উৎসব

ফুটবলের ভালোবাসার টানে স্বেচ্ছায় আবার রাত জাগা চলছে। এই জেগে থাকার মধ্যে নেই কোনো ক্লান্তি। বরং আছে একাকী বা অনেকে মিলে উত্তেজনায় ভরপুর আনন্দঘন সময়ের সান্নিধ্য লাভ এবং ফুটবলে অভিজ্ঞতা অর্জন। এই খেলার কোনো দেশ বা সীমানা নেই। হাজার হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিত ফুটবল চুম্বকের মতো টানে। উতলা করে তোলে। একেকটা ফুটবল উৎসব আসে, পরিবার ও সমাজের ছকে বাঁধা জীবনপ্রবাহকে কিছুদিনের জন্য হলেও এলোমেলো করে দেয়। ফুটবল দেয় বৈচিত্র্যের স্বাদ। মানুষ সেই স্বাদ গ্রহণ করে দুই হাত বাড়িয়ে। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ডের কী অসাধারণ ক্ষমতা! মানুষের হূিপণ্ড নিয়ে নির্বিচারে খেলে চলেছে। খেলা দেখতে বসে ভুগতে হয় আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে। কখনো হিসাব মেলে, কখনো মেলে না। এর পরও ফুটবল সবার প্রিয় খেলা।

গত ১১ জুন থেকে মাসব্যাপী মহাদেশীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠ উৎসব উয়েফা ইউরো ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২০ শুরু হয়েছে। ছয়টি গ্রুপে ভাগ হয়ে ২৪ ইউরোপিয়ান দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের ফুটবল আনন্দমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১টি দেশের ১১টি স্টেডিয়ামে। এখন চলছে ১৬টি দেশ নিয়ে নক আউট পর্বের খেলা। এখন হারলেই ইউরো মিশন শেষ। নির্দয় সময় এখন ফুটবল চত্বরে। ৬১ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো দেশের স্টেডিয়ামে খেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যত সময় গড়াচ্ছে, ফুটবলে বাড়ছে রোমাঞ্চ। প্রথম রাউন্ডের শেষের দিকের খেলাগুলোর গল্প তো অসাধারণ।

এবারই প্রথম উয়েফা পরিচালিত টুর্নামেন্টে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) আছে। এতে খেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি কমে গেছে। যে ১১টি স্টেডিয়ামে খেলা হয়েছে, এর মধ্যে ১০টি স্টেডিয়ামে কোথাও ২৫, ৩০, ৩৩, ৪৫, ৫০ শতাংশ দর্শক মাঠে এসে খেলা দেখার সুযোগ পেয়েছে। শুধু হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের পুসকাম অ্যারেনায় শতভাগ দর্শককে মাঠে এসে খেলা দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এখন ২৫ শতাংশ দর্শক মাঠে এসে খেলা দেখছে। এই স্টেডিয়ামেই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সম্ভবত আগামী দিনগুলোতে আরো অনেক বেশি দর্শক এই স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে খেলা দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছে।

স্বাগতিক দলের জন্য দর্শকের সমর্থন অনেক বড় অনুপ্রেরণা এবং বাড়তি সুবিধা ফুটবলের বড় আসরে। কিন্তু সুবিধা তো আর সব দলের পাওয়ার সুযোগ নেই। ফুটবল মাঠের খেলা। খেলা শুরু হয়ে গেলে খেলার মধ্যেই তো ডুবে থাকা।

একসময়ের সহজ সরল ফুটবলকে রীতিবদ্ধভাবে কঠিন করে তুলেছেন বিশেষজ্ঞ, কৌশলবিদ ও একদল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মেধাবী মানুষ। তাঁরা মাঠের ফুটবলকে গবেষণাগারে ঢুকিয়ে নিরলসভাবে কাজ করছেন। এতে ফুটবল হয়ে পড়েছে অনেক বেশি জটিল ও শক্ত। এর পেছনে কাজ করছে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া। আবার প্রতিপক্ষের জন্য ফাঁদ তৈরি করে নিজেও সেই ফাঁদে ধরা পড়ছেন হরহামেশাই। ফুটবল যে কত সুন্দর চোখ-ধাঁধানো খেলা এবং সৃষ্টিশীল শিল্প—এর প্রদর্শনী মঞ্চ হলো ইউরো ফুটবলের আসর। সব সময় উদ্ভাবন আর পরিবর্তনের বন্দনা। ইউরোপিয়ান ঘরানার ফুটবল তো দেশে দেশে বাতিঘর হিসেবে চিহ্নিত। দ্রুতগতির শক্ত ফুটবলের আবেদনটাই তো আলাদা। খেলোয়াড়দের দৈহিক গঠন, উচ্চতা, ফিটনেস আর সামর্থ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে কমিটমেন্ট চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব, আন্তর্জাতিক ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ এবং ইউরোর মাঠে নামার আগে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেই সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। মাঠের লড়াইয়ে লক্ষণীয় হয়েছে, একটি দলের সঙ্গে আরেকটি দলের পার্থক্য কম। ফিফা র্যাংকিংয়ের প্রথম ৩০টি দলের মধ্যে অনেক দল আছে ইউরো ফুটবলে। ২০২২-এর নভেম্বরে কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল আসর। সেখানে তো আবার ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রাধান্য ধরে রাখার লড়াই। এর আগে ইউরো ফুটবলে নিজেকে তুলে ধরার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যারা আন্তর্জাতিক ফুটবল অনুসরণ করেন, খোঁজখবর রাখেন তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ইউরো ফুটবল টুর্নামেন্ট। ইউরো ফুটবলের রোমাঞ্চ আর খেলোয়াড়দের পায়ের কাজ অন্য যেকোনো মহাদেশীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে পৃথক। ইউরো ফুটবল তারুণ্যের জীবন উৎসব। জাতিতে জাতিতে ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। প্রাথমিক পর্বে সব কটিতেই তো প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ।

১৯৬০ সালে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে এখন অনেকগুলো স্বাধীন দেশ। ইউরো ফুটবলে বিগত ১৫ আসরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া জিতেছে স্পেন, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, জার্মানি, গ্রিস ও পর্তুগাল। এর মধ্যে এবারের আসরে নেই চেকোস্লোভাকিয়া ও গ্রিস। ইতালির ফুটবল পণ্ডিতরা বলেছেন, এবার নতুন কোনো দেশের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা তাঁরা দেখছেন না। নতুন কোনো দেশ যদি শিরোপা জেতে, সেটি হবে অনেক বড় বিস্ময়। ইউরোর ইতিহাসে জার্মানির অতীত রেকর্ডগুলো সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর এবার ইউরো ঘিরে জার্মানির স্বপ্ন। গ্রুপে রানার্স আপ হয়ে নক আউট রাউন্ডে উঠেছে। খেলতে হবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ইংল্যান্ডের জালে প্রথম রাউন্ডে গোল ঢোকেনি। ফুটবলকে তো চেনা মুশকিল। ইতালি গত বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। ইউরোতে কোমর বেঁধে নেমেছে। নক আউট রাউন্ডে পা রেখেছে। ইংল্যান্ড কখনো ইউরো শিরোপা জেতেনি। গত বিশ্বকাপেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। এবার ইংল্যান্ডে আবার সেই গান গাওয়া শুরু হয়েছে ‘ফুটবল আসছে’। গত বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবার ছন্দে আছে। একটি শক্তিশালী নিটোল দল নিয়ে মাঠে নেমেছে। শেষবার ইউরো শিরোপা জিতেছে ২০০০ সালে। স্পেন ইউরো আলোচনায় অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। স্পেন ১৯৬৪, ২০০৮ ও ২০১২ সালে ইউরো জিতেছে। বর্তমান স্পেন দলের দলগত বোঝাপড়া ভালো। পর্তুগাল ২০১৬ সালে ইউরো জিতেছে। আবার স্বপ্ন দেখছে। সেই সামর্থ্য তাদের আছে। ৩৬ বছর বয়স্ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ফর্মের তুঙ্গে। তিনি এখন পর্যন্ত পাঁচটি ইউরো খেলেছেন। ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনিকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। থার্ড থেকে পর্তুগাল নক আউট রাউন্ডে এসেছে। খেলতে হবে ফিফা র্যাংকিংয়ে এক নম্বর দল বেলজিয়ামের বিপক্ষে। বেলজিয়াম বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি দল। উজ্জ্বল ফুটবল খেলছে প্রথম রাউন্ডে। নক আউট রাউন্ডের খেলার মেজাজ একদম আলাদা। এখন হিসাব অনেক বেশি সহজ, আর কঠিনও।  নেদারল্যান্ডসের ফুটবল ঐতিহ্য কারো অজানা নয়। এর পরও বিশ্বকাপ ফুটবলে তার প্রতিফলন তেমনটি নেই। ১৯৮৮ সালে নেদারল্যান্ডস ইউরো জিতেছে।

পুরো ফুটবলবিশ্ব থমকে গিয়েছিল কিছু সময়ের জন্য। গত ১২ জুন ডেনমার্ক-ফিনল্যান্ড ম্যাচে ডেনমার্কের তারকা ক্রিস্টিয়ান এরিকসন হৃদযন্ত্র অসুস্থ হয়ে মাঠে পড়ে গিয়েছিলেন। খেলা বন্ধ রেখে সবাই তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন। খেলোয়াড় ও চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হয়েছে। খেলোয়াড়ের জন্য ফুটবলবিশ্বের ভালোবাসা সবার মনে দাগ কাটছে।

প্রথম রাউন্ডে খেলা দেখেছি আর ভেবেছি ইউরোপের ফুটবলে অভিজ্ঞতার বড় কদর। বয়স এখন আর বাধা নয়। অভিজ্ঞরা নতুন ও তরুণদের নিয়ে যেভাবে ঝলসে উঠলেন—এটা সব দেশের ফুটবলে অনুকরণীয়। নতুন তারকা হিসেবে পরিচিত হওয়ার কাতারে কয়েকজন আছেন। তবে তাঁদের নিয়ে এখনই বলার সময় হয়নি। সামনে তো কাতার বিশ্বকাপ। সব ফোকাস তো সেখানে। প্রথম রাউন্ডে হাঙ্গেরির জন্য মন খারাপ হয়েছে। দারুণ লড়াই করেও ওরা নক আউটে নেই। বাকি অন্য দলগুলোর এর চেয়ে বেশি কিছু করার তো কথা নয়।

ইউরো ফুটবল উৎসব এগিয়ে চলেছে। সেই উৎসবে শরিক হয়ে সন্ধ্যা থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত সবাই মিলে খেলা দেখা। ফুটবল পারিবারিক বন্ধনের পক্ষে। দল সমর্থন নিয়ে মতপার্থক্য আছে, এটা থাকবে। আসল হলো ফুটবল উপভোগ। আধুনিক প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ। প্রযুক্তির বদৌলতে প্রতিদিন টাটকা খেলা দেখি নিজ ঘরে বসে কোনো দিন ইতালি, রাশিয়া, লন্ডন, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরিসহ অন্যান্য দেশের মাঠ থেকে। ফুটবলের জয় হোক।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সাতদিনের সেরা