kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু আমাদের চিরন্তন আলোকশিখা

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ জুন, ২০২১ ০৪:০২ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু আমাদের চিরন্তন আলোকশিখা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপিত হচ্ছে দেশে-বিদেশে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত এই উৎসব উদযাপিত হওয়ার কথা থাকলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম বর্ধিত করা হয়েছে। কেমন চলছে মুজিব শতবর্ষ উদযাপন কার্যক্রম? এ নিয়ে কালের কণ্ঠ মুখোমুখি হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন আজিজুল পারভেজ

কালের কণ্ঠ : করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে মুজিব শতবর্ষ উদযাপন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মুজিব শতবর্ষ উদযাপনের মূল পরিকল্পনা কী রকম ছিল? তার কত ভাগ করতে পেরেছেন?

ড. কামাল চৌধুরী : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন জাতির জন্য একটি অসাধারণ ও গৌরবের ঘটনা। উদযাপনের জন্য ২০১৯ সালে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। একটি জাতীয় কমিটি, যার সভাপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই কমিটির অধীনে আছে বাস্তবায়ন কমিটি। বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনদের এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবায়ন কমিটির ৯টি উপকমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটিগুলো দিন-রাত কাজ করেছে। সব মিলিয়ে ২৯৮টি প্রগ্রামের পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করি। উৎসবমুখর পরিবেশে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বঙ্গবন্ধুর জন্ম উৎসব উদযাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এটা ছিল আমাদের কেন্দ্রীয় প্রগ্রাম। এর বাইরেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন দেশে-বিদেশে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

মুজিববর্ষের ক্ষণগণনা ১০ জানুয়ারি ২০২০ থেকে শুরু হলে সারা দেশে ব্যাপক সাড়া পড়ে। একটা উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। আমাদের প্রস্তুতি চূড়ান্ত—লোগো, থিম সং প্রস্তুত। এক লাখেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান হবে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে। কিন্তু মার্চে যখন আমাদের মূল অনুষ্ঠানটা শুরু হওয়ার কথা তখন বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। তখন প্রধানমন্ত্রী ডাকলেন গণভবনে। সেখানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বললেন, মহামারি পরিস্থিতিতে জনসমাগম করে অনুষ্ঠান করা কোনো অবস্থায়ই ঠিক হবে না। বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। তাঁর জন্মবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়, এমন কিছু করা যাবে না। তাঁরা অনলাইনে ও রেকর্ড করে অনুষ্ঠান গণমাধ্যমে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেন। সেদিন প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষে সব গৃহহীনকে গৃহ প্রদানের ঘোষণাটি দেন।

ফলে জনসমাগম করে অনুষ্ঠানের চিন্তা বাদ দিতে হয়। আমরা যেভাবে একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলাম, করোনার কারণে সেভাবে আর অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি। সে কারণে একটা অতৃপ্তি তো রয়েই গেছে। এর পরও আমরা চেষ্টা করেছি রেকর্ড করা অনুষ্ঠান সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দিবস যেমন ৭ই মার্চ, ৭ই জুন, ১৫ই আগস্ট, ২৫ই সেপ্টেম্বর বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছি, পোস্টার প্রকাশ করেছি। সারা দেশে ১০০ দিনব্যাপী দেশের সর্ববৃহৎ অনলাইনভিত্তিক ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কুইজ’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এটাকে কেন্দ্র করে সারা বাংলাদেশে একটা ব্যাপক সাড়া পড়ে ছিল। ১০ হাজার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে চূড়ান্ত পর্বের পুরস্কার দেওয়া হবে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে গত বছর মুজিববর্ষজুড়ে প্রতিদিন প্রচারিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসংবলিত ‘বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন’ অনুষ্ঠান। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা নিয়ে জুম মাধ্যমে আরো অনেক আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। ইউনেসকোসহ বিদেশেও বিভিন্ন আয়োজন হয়েছে। ইউনেসকো স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

মুজিববর্ষ ঘোষিত হয়েছিল ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত। অর্থাৎ মুজিববর্ষের অনুষ্ঠান শেষ হবে আর শুরু হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব। কিন্তু আমরা যেহেতু করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক কাজই করতে পারিনি, সে কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষের সময়কাল ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। এখন আমরা অসমাপ্ত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি।

কালের কণ্ঠ : এ বছর একই সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবও উদযাপিত হচ্ছে। এই দুই উদযাপনের সমন্বয়টা কিভাবে হচ্ছে? মুজিব শতবর্ষের অংশ হিসেবে আর কী কী আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে? কখন, কিভাবে হবে?

ড. কামাল চৌধুরী : মুজিববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে ১০ দিনের একটি বড় অনুষ্ঠান ‘মুজিব চিরন্তন’ আমরা করেছি সীমিত জনসমাগম নিয়ে। সেটি ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৬ মার্চ লোগো উন্মোচনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের জন্য সরকার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির মাধ্যমেই সুবর্ণ জয়ন্তীর কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা মুজিব শতবর্ষ বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।

অনেকগুলো প্রকাশনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলাম। সেগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় কমিটি থেকে দুটি স্মারকগ্রন্থ হচ্ছে বাংলা ও ইংরেজিতে। সম্পাদনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই দুটি শিগগিরই বের হয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমরা আরো করছি কবিতা সংকলন, গল্প সংকলন, প্রবন্ধ সংকলন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিবসকেন্দ্রিক সংকলন আমরা করছি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে ‘কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর’ স্মারক প্রকাশনা হয়েছে। ‘মুজিব চিরন্তন’ নিয়ে প্রকাশনা হয়েছে এবার। আর্কাইভে এগুলো সংরক্ষণ করা যাবে।

১৬ ডিসেম্বরের আগে আরো অনেক অনুষ্ঠান হবে। সেগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যথাসময়ে আপনাদের জানাব। এর মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক উৎসব করার পরিকল্পনা আছে।

কালের কণ্ঠ : কভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যে ১৭-২৬ মার্চ ২০২১, দশ দিনের ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক যে অনুষ্ঠানমালা হলো তা নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী? পরিকল্পনা অনুসারে কতটা করতে পেরেছেন?

ড. কামাল চৌধুরী : জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সীমিত জনসমাগমে ১০ দিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ অনুষ্ঠান হয়েছে। তাতে প্রতিদিন আড়াই ঘণ্টা করে অনুষ্ঠান হয়েছে। ১০ দিনে ১৩ ঘণ্টা ২৬ মিনিট আলোচনা হয়েছে, ১৬ ঘণ্টার ওপরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। সবাই নিশ্চয়ই একমত হবেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় অনুষ্ঠান আর হয়নি। এ অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে প্রথমে সীমিত আকারেই অনুষ্ঠানের ভাবনা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানটা এক পর্যায়ে এত বিস্তৃত হয়ে গেল, সারা পৃথিবী থেকে আমরা সাড়া পেলাম। একসময় জাতীয় প্যারেড স্কয়ার মনে হলো দক্ষিণ এশিয়ার মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মালদ্বীপ ও নেপালের রাষ্ট্রপ্রধান, ভারত, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী সশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন। এটা বড় ঘটনা। প্রসঙ্গক্রমে বলি, আমাদের আয়োজনে যুক্ত হতে বলা যায় ঝুঁকিই নিয়েছেন অনেকে। ভুটানের নিয়ম অনুসারে কেউ দেশের বাইরে থেকে ফিরলে ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। এটা মেনে নিয়েই ভুটানের সরকারপ্রধান এসেছেন।

সীমিত আকারের সেই অনুষ্ঠানে আমরা প্রতিদিন ৫০০ মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভাগ করে নিয়ে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি; যদিও সবাইকে করোনা টেস্ট করেই যেতে হয়েছে। করোনা টেস্ট করার জন্য আমাদের দপ্তরে একটি বুথই স্থাপন করা হয়েছিল।

এই অনুষ্ঠান আয়োজনে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই করোনা পরিস্থিতিতেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে দেখেছেন। তা না হলে এ আয়োজন সম্পন্ন করা যেত না। তাঁদের প্রতি আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

অনুষ্ঠানে প্রতিদিন একটি করে থিম ছিল, থিমভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম এবং বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে।

সব ধরনের বিশিষ্ট শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংগীতের সব শাখাকে যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত তাদের অনুষ্ঠানও আমাদের উপহার দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসেছিলেন আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২৬ মার্চে। সেদিন ভারতের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গীকৃত ‘রাগ মৈত্রী’ পরিবেশিত হয়। চীনের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য উপহার দেওয়া হয়েছে।

ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বাণী পাঠিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবেরসহ ১৯৪টি মেসেজ আমরা পেয়েছিলাম। সব কটি অনুষ্ঠানে প্রচার করা যায়নি।

‘মুজিব চিরন্তন’ একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল। এটি সরাসরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে। ভারতে হয়েছে; ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপালে হয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যন্ত মানুষ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে।

এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ১০টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। এটিও একটি সম্পদ হয়েছে। এগুলো যাতে সবাই দেখতে পারে সে জন্য সিডি আকারে প্রকাশ করা হবে। ইউটিউবে আপলোড করা হবে। টেলিভিশনেও প্রচারিত হবে।

কালের কণ্ঠ : ১৭-২৬ মার্চ ২০২১, দশ দিনের যে অনুষ্ঠান হলো সেটাকে বলা হয়েছে মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান। কিন্তু তাতে মূলত বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠান হয়েছে।

ড. কামাল চৌধুরী : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতি যে শ্রদ্ধাটা জ্ঞাপন করছে, আসলে এই শ্রদ্ধা তো শুধু জন্মশতবার্ষিকীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য একটি রাষ্ট্র রেখে গেছেন। তাঁর আত্মত্যাগের যে মহিমা রেখে গেছেন, সেটাকে তো আমরা শুধু এক বছরে, দুই বছরে, শুধু অনুষ্ঠান করে, তাঁর ঋণ স্বীকার করতে পারব না। আমরা থিমেটিক জার্নি অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু জীবন ও কর্ম নিয়ে চিরন্তন একটি যাত্রা শুরু করার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এটাকে আমরা ‘মুজিব চিরন্তন’ নামে সাজিয়েছি। প্রতিদিন আলাদা থিম ছিল। সেই থিমের ওপর প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান, অর্জনকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশের বিশিষ্টজনরা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা যে বার্তা দিয়েছেন সেখানেও তাঁরা বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা, বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলেছেন।

বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি চিরন্তন আলোকশিখা। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আমাদের যে যাত্রা তা কখনো শেষ হবে না। সে জন্য অনুষ্ঠানটার আনুষ্ঠানিক কোনো সমাপ্তি আমরা করিনি। ১৭ মার্চ থেকে যে অনুষ্ঠান হয়েছে তা বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। ২৬ মার্চ এসে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। চলবে আগামী বছরের ২৬ মার্চ পর্যন্ত। আর মুজিব শতবর্ষের আনুষ্ঠানিক আয়োজন শেষ হবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর।

কালের কণ্ঠ : মুজিব শতবর্ষের উদযাপনের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে তেমন সম্পৃক্ত করা হয়নি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলকেও সেভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি বলে কেউ কেউ অভিযোগ করছেন। কী বলবেন?

ড. কামাল চৌধুরী : দেখুন, করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের আমন্ত্রণ সীমিত রাখতে হয়েছে।

এক লাখের বেশি লোককে দাওয়াত দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আমাদের ছিল। কিন্তু এটা করতে গেলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চিন্তা করলাম, কিভাবে জনসমাগম না করেও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়। সে জন্য আমরা প্রতিদিনের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করেছি। প্রতিদিন বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে অনুষ্ঠানসূচি প্রকাশ করেছি আমরা। সে অনুসারে তৃণমূল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ, এমনকি বিদেশ থেকেও অনুষ্ঠান উপভোগের সুযোগ পেয়েছে। যাকেই জিজ্ঞেস করেছি, সে-ই বলেছে অনুষ্ঠান দেখেছি। এভাবেই আমরা সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়নি কথাটি ঠিক নয়।

আমাদের কমিটিতে আসলে সবার সম্পৃক্ততা আছে। আমরা যে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, তার মধ্যে আওয়ামী লীগসহ সব দলের নেতারা ছিলেন। ১৪ দলের নেতারাও তো আয়োজনের সঙ্গেই ছিলেন। বিএনপি, গণফোরামসহ অন্যান্য দলের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এখন যদি কেউ বলে সবাইকে সম্পৃক্ত করিনি, তা কিন্তু যথার্থ নয়। কেউ কেউ এসেছেন, কেউ কেউ আসেননি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে সবাই এলে তাঁদের জন্যও সম্মানের হতো, আমাদেরও ভালো লাগত।

কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র এবং ওয়েব সিরিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর কী অবস্থা? মুজিব বায়োপিকের সর্বশেষ অবস্থা জানানো কি সম্ভব?

ড. কামাল চৌধুরী : শ্যাম বেনেগালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর একটি বায়োপিক তৈরি হচ্ছে। সেটা অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্র উপকমিটির মাধ্যমে বেশ কিছু শর্টফিল্ম, প্রামাণ্যচিত্র, ওয়েব সিরিজ তৈরির জন্য প্রস্তাবনা আহ্বান করেছিলাম। তার ভিত্তিতে তিনটি প্রামাণ্যচিত্র ও তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এই কাজগুলো কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। এখন অবশ্য কাজ হচ্ছে। এ বছরই এগুলো হয়ে যাবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘের ভাষণ, বঙ্গমাতা, শেখ কামালসহ বঙ্গবন্ধুর সন্তানদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া দিবসকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও প্রামাণ্যচিত্র হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : মুজিব শতবর্ষ উদযাপন নিয়ে কোথাও কোথাও বাড়াবাড়ি হচ্ছে। প্রকাশনার নামে মানহীন বই প্রকাশ করা হচ্ছে। সেগুলো আবার ‘মুজিব কর্নার’-এর জন্য মনোনীত করা হচ্ছে। শিশুদের উপযোগী নয় এমন বইও শিশুদের জন্য পাঠানো হচ্ছে।

ড. কামাল চৌধুরী : মুজিববর্ষের আয়োজন নিয়ে কেউ যাতে বাড়াবাড়ি কিছু করতে না পারে এ ব্যাপারে আমরা সচেতন ছিলাম। এ উপলক্ষে কেউ নিজের ছবি দিয়ে কোনো পোস্টার যাতে না করে সে জন্য আমরা সবাইকে চিঠি দিয়ে অবহিত করেছি। বাড়াবাড়ির সে রকম কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তবে প্রকাশনার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অনেক প্রকাশনা হয়েছে ও হচ্ছে, বেশির ভাগই যথাযথভাবে সম্পাদিত নয়। অনেক প্রকাশনায় তথ্যগত ভুলও আমাদের চোখে পড়েছে। আমরা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলেছি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে বই বের হবে সেগুলোর তথ্য যেন যাচাই করে দেওয়া হয়, সম্পাদনা করে যেন ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে বই বেরিয়েছে তার তথ্য জানানোর জন্যও আমরা বাংলা একাডেমিসহ প্রকাশক সমিতিকে চিঠি দিয়েছিলাম। আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে বইয়ের মানের ব্যাপারে কাজ করার অনেক সুযোগ ও প্রয়োজন রয়েছে।

কালের কণ্ঠ : ১৯৭৫ সালের পর বঙ্গবন্ধুর নাম অনেকটা নিষিদ্ধ ছিল। এ দেশের একটা প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে দেওয়া হয়নি, কিংবা বিকৃত ও বিভ্রান্ত ইতিহাস জানানো হয়েছে। মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন বঙ্গবন্ধুকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে কতটা ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন?

ড. কামাল চৌধুরী : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাংলাদেশ একটা প্রতিকূল সময় অতিক্রম করেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করে জাতির হৃদয় থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে বিকৃত ইতিহাস শেখানো হয়েছে। একটা প্রজন্ম একটা বিস্মৃতি ও বিভ্রমের মধ্যে ছিল। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরেছে দেশ।

এখনকার তরুণরা জানে বঙ্গবন্ধু কিভাবে একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তাদের আরো জানা দরকার। তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই আত্মত্যাগের প্রেরণা নিতে পারে। জাতি গঠনের প্রেরণা নিতে পারে। তরুণ প্রজন্ম যদি ইতিহাসটা না জানে, বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধকে না জানে তাহলে তো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে না। মুজিববর্ষের আয়োজনকে আমরা এভাবে চিন্তা করেছি, এটা শুধুই উদযাপন না, এটা শুধুই উৎসব নয়; এটার যে তাৎপর্য সেটা একটা সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম ও আত্মত্যাগের মহিমাকে আমরা তরুণ প্রজন্মের সামনে ছড়িয়ে দেওয়া চেষ্টা করেছি। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে শুধুই বিনোদন নয়, বঙ্গবন্ধুর দর্শন; বাঙালির আবহমানকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্নটা অসম্পূর্ণই থেকে গেছে। তবে আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। এখন আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আরেকটি স্বপ্ন যাত্রা শুরু করেছি। সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ যে বিশ্বের উন্নয়নে রোল মডেল হয়েছে, সে কথা তো বিশ্বনেতারা মুজিববর্ষের ভিডিও বার্তায়ই উল্লেখ করেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কিংবা জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছ থেকে তো এসব কথা কেউ শিখিয়ে আনতে পারবে না। বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা জাতিসংঘের মহাসচিব প্রত্যেকে যেভাবে প্রশংসা করেছেন, এটা আমাদের একটা অর্জন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গঠনের অসমাপ্ত যাত্রাটাকে এগিয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে তরুণদের আরো সম্পৃক্ত করতে হবে। সম্পৃক্ত করতে হবে জ্ঞান দিয়ে, প্রজ্ঞা দিয়ে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে তাদের। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সে চেষ্টা আমরা করেছি। মুজিববর্ষ উদযাপনে দেশ-বিদেশ থেকে সবাই যেভাবে সাড়া দিয়েছে, অংশগ্রহণ করেছে, তাতে মনে হয়েছে, আমাদের অনুষ্ঠান অত্যন্ত সফল হয়েছে। আমরা বলতে পারি ব্যক্তি, বিশালতা ও তাৎপর্যের নিরিখে মুজিববর্ষের আয়োজন ঐতিহাসিক ও সুদূরপ্রসারী হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

ড. কামাল চৌধুরী : ধন্যবাদ আপনাকেও।



সাতদিনের সেরা