kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

কাজে লাগবে না তবু ৮০ কোটির যন্ত্র কেনা হচ্ছে ১৪৫ কোটিতে

তৌফিক মারুফ    

২৫ জুন, ২০২১ ০২:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাজে লাগবে না তবু ৮০ কোটির যন্ত্র কেনা হচ্ছে ১৪৫ কোটিতে

দেশে এখন দুটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র আছে, যেগুলোর এফডিজি উৎপাদনের যে সক্ষমতা তার ৯৮ শতাংশই অব্যবহৃত থাকে। তার পরও আরো তিনটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। ফ্লুরোডি-অক্সিগ্লুকোজ (এফডিজি) যে পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়, সেই পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি (পিইটি) (কম্পিউটেড টমোগ্রাফি) সিটি স্ক্যান যন্ত্র আছে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র আটটি। ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ পরীক্ষার জন্য অতি দরকারি এই যন্ত্র দেশের একমাত্র সরকারি ক্যান্সার বিশেষায়িত হাসপাতাল জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালও পায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই পদ্ধতিতে রোগ পরীক্ষার জন্য রোগীর শরীরে এফডিজি নামের তরল তেজস্ক্রিয় পদার্থ (ট্রেসার) ইনজেকশনের মাধ্যমে পুশ করা হয়। প্রতিটি রোগীর জন্য এই ট্রেসার প্রয়োজন হয় আট মিলি কিউরি পরিমাণ। একটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র প্রতি শিফটে আট হাজার মিলি কিউরি এফডিজি উৎপাদনে সক্ষম। আর প্রতিটি যন্ত্র দিনে দুই ঘণ্টা হিসাবে দুই শিফটে চার ঘণ্টায় মোট ১৬ হাজার মাইক্রোকিউরি এফডিজি উৎপাদনে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে দেশের দুটি যন্ত্র দিয়ে দিনে ৩২ হাজার মাইক্রোকিউরি এফডিজি পদার্থ উৎপাদন করা যায়, যা দিয়ে দিনে চার হাজার রোগীর পিইটি-সিটি স্ক্যান করা সম্ভব। কিন্তু দেশে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন পিইটি-সিটি স্ক্যান হয় আটটি যন্ত্রের প্রতিটিতে গড়ে আটজন করে মোট ৬৪ জনের। ফলে ৯৮.৪ শতাংশ রোগীর এফডিজি তৈরির সক্ষমতা কাজে আসছে না।

সাইক্লোট্রন যন্ত্র আছে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্যরা এফডিজি নিয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদ্যমান উৎপাদনক্ষমতাই যেখানে সবটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না সেখানে এখন আরো তিনটি এফডিজি তৈরির সাইক্লোট্রন যন্ত্র কেনার তৎপরতা শুরু হয়েছে। এস্টাবলিশমেন্ট অব সাইক্লোট্রন অ্যান্ড পিইটি-সিটি প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্স (ইনমাস) এবং ঢাকার সাভারে সাইক্লোট্রন ফ্যাসিলিটিজ অব নিউক্লিয়ার মেডিক্যাল ফিজিকসের (আইএনএমপি) জন্য এই যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে।

এই তিনটি স্থানের মধ্যে ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে একটিও পিইটি-সিটি স্ক্যান মেশিন নেই।  

ওই সূত্রগুলো জানায়, একটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র দিয়ে ১৫০ থেকে ২০০টি পিইটি-সিটি স্ক্যান মেশিনের এফডিজি তৈরি করা যায়, সেখানে চট্টগ্রাম বা ময়মনসিংহে একটি বা দুটি পিইটি-সিটি স্ক্যান যন্ত্রের জন্য একটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

এ বিষয়ে দেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রীতিমতো বিস্মিত। তাঁদের কারো কারো মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে দেশের সব জেলায় ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক অন্যান্য রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতির সংস্থান করা। কিন্তু এটা না করে অপ্রয়োজনীয় তিনটি যন্ত্র কেনার পেছনে সরকারি টাকা নয়ছয় করার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি ভালো জানেন এই প্রকল্পের পরিচালক বা অন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে আমি যতটা বুঝি সে অনুসারে বলতে পারি, ঢাকায় উৎপাদিত এফডিজি উদ্বৃত্ত থাকলেও মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তা চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ বা সাভারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই এফডিজি উৎপাদনের পর দুই ঘণ্টার বেশি লাইফটাইম থাকে না। এ জন্য আমরা ভাবছি, দেশের যেখানেই পিইটি-সিটি স্ক্যান যন্ত্র বসানো হবে সেখানে সাইক্লোট্রন যন্ত্রও বসানো হলে রোগীর সেবা ভালো হবে।’

যদিও সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, এফডিজি উৎপাদনের পর যত বেশি সময় অব্যবহৃত থাকবে ততই তার কার্যকারিতা কমতে থাকবে। সে ক্ষেত্রে ডোজও বাড়াতে হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত মে মাসে আহ্বান করা দরপত্রের আওতায় সাইক্লোট্রন যন্ত্র কেনা সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী তিনটি যন্ত্রের দাম ধরা হয়েছে মোট ১৪৫ কোটি টাকা। অথচ তিনটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র এবং আনুষঙ্গিক সব যন্ত্রপাতির বাজারদর কোনো অবস্থায়ই ৮০ কোটি টাকার বেশি নয়।

অথচ এই তিনটি সাইক্লোট্রন যন্ত্র কেনার কার্যাদেশ তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালের ১০-২০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প পরিচালক ড. এম মনজুর আহসান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধিশাখা ১৪ ও ২১-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব (তত্কালীন সিনিয়র সহকারী প্রধান) জাহিদুল ইসলাম তুরস্ক ভ্রমণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ করেন। আর এই কেনাকাটার পেছনে একজন জ্যেষ্ঠ সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাও জড়িত বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক এই দরপত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তুরস্কের ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কেউ সহজে অংশ নিতে না পারে। পাশাপাশি দরপত্রে অনেক শর্ত রয়েছে, যেগুলোতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. এম মনজুর আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোগীর চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে রোগীর সিরিয়াল লম্বা হয়ে যায়। তাই আমরা এই যন্ত্র বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া দামের অভিযোগও ঠিক নয়। তিনটি যন্ত্রের দাম সব মিলিয়ে মাত্র এক কোটি টাকার মতো। এ ক্ষেত্রে আমরা যন্ত্রগুলোর ওয়ারেন্টি টাইম বাড়িয়ে দিতে বলেছি বলে দাম হয়তো কিছুটা বেশি পড়েছে।’

আরো সাইক্লোট্রন যন্ত্র কেনার তৎপরতা থাকলেও সে তুলনায় পর্যাপ্ত পিইটি-সিটি স্ক্যান মেশিন নেই। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এই পরীক্ষার যন্ত্রের স্বল্পতার জন্য ভুগতে হয় রোগীদের।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী মোশতাক আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার এখানে পিইটি-সিটি স্ক্যান যন্ত্রই নেই। আগে একবার এই যন্ত্র কেনার উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও এখনো কেন পাচ্ছি না, তা জানি না।’



সাতদিনের সেরা