kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ ঠিক রেখে ইতিহাস ধারণের পরামর্শ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ জুন, ২০২১ ২১:১২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ ঠিক রেখে ইতিহাস ধারণের পরামর্শ

স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে নষ্ট না করে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে প্রস্ফুটিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্যানের সবুজায়নকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং ইতিহাসকে পাশে ঠেলে রাখারও অভিযোগ করেছেন অনেকেই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এই পরামর্শ দেওয়া হয়। জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘আর ১০/১২ টির বেশি গাছ কাটা হবে না। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তাদের পরামর্শে নতুন করে বৃক্ষরোপন করা হবে। এই কাজের মধ্য দিয়ে একটি অভিজ্ঞতা হলো, ভবিষ্যতে যে কোনো কাজে বিশেষজ্ঞদের আগে থেকেই যুক্ত করা হবে।’

আজ বৃহস্পতিবার পূর্ত ভবনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উদ্ভিদবিদ, পরিবেশবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সৌহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কেটে রেস্তোরা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হলো।

সভার সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া। সভার শুরুতে স্থপতি আসিফুর রহমান ভূইয়া ত্রিমাত্রিক নকশা উপস্থাপন করেন।

একাত্তর টেলিভিশের প্রধান নির্বাহী ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবু বলেন, এটি এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, অথচ নকশার এরিয়া ভিউ কিংবা টপ ভিউতে কোনো দর্শন ফুটে উঠে না। তিনি খাবার দোকান, টয়লেট মাটির নিচে করার পরামর্শ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আজমল হোসেন ভূইয়া বলেন, বিশ্বের যে কোনো দেশে স্থাপনা করার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয় না, যা দুঃখজনক। শহরে যেখানে মানুষের অনুপাতে গাছ পালা কম, সেখানে এই উদ্যান ফুসফুস হিসেবে কাজ করছে। জিয়াউর রহমান ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য পার্ক করেছিলেন। কিন্তু এখনকার নকশা দেখে মনে হলো এটাকে বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। পরিবেশকে রক্ষা করেই জাতির বীরত্বের ইতিহাসকে তুলে ধরতে হবে।

অধ্যাপক জসিমউদ্দিন বলেন, ঢাকা শহরে সবুজায়ন ২৫ শতাংশের স্থলে মাত্র ৭ শতাংশ রয়েছে। ফলে এখানে সবুজ প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। কম স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব দেশি গাছ বেশি করে লাগাতে হবে।

অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান বলেন, রেসকোর্স ময়দান মানেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। এতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে গুরুত্ব দিয়েই নকশা করা উচিত। তিনিও আরো সবুজ রেখে খাবার দোকান, টয়লেট মাটির নিচে করার পক্ষে মত দেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমুজাদ্দাদী আলফাসানী বলেন, গাছের জন্য লাইটিংও দূষণের একটি কারণ হয়ে থাকে। সেখানে যেহেতু বিভিন্ন ধরনের গাছপালা আছে, তাই এতে লাইটিং কেমন হবে, সেই বিষয়টিও নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছপালা আরও বাড়াতে হবে এবং বিদেশি প্রজাতির গাছ না লাগিয়ে বিলুপ্তপ্রায় দেশি প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে।

একুশে টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, প্রকল্প নিয়ে প্রকৃত কোনো তথ্য না থাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। পরিষ্কার করুন কতগুলো গাছ কাটা হবে। পরিবেশ-জীবন-ইতিহাসকে সমন্বয় করে দ্রুত প্রকল্পটি সম্পন্ন করুন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, রেসকোর্স ময়দানের ইতিহাস মানে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ। কিন্তু এই গুলো যেন আড়ালেই চলে যাচ্ছে। স্থাপনাগুলো ভূ-গর্ভে করার তাগিদ দেন তিনি।

অধ্যাপক আবদুল কাদের বলেন, এই প্রজেক্ট এরিয়া ভিউ-এর থিম এবং থিম কালার নির্ধারণ করা জরুরী। বিমান থেকেও যেন বঙ্গবন্ধুর তর্জনী দেখা যায়।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামান খন্দকার বলেন, এত বেশি ওয়াকওয়ে রাখা হয়েছে, তার বদলে বেশি করে গাছ রাখা উচিত। তিনি কালি মন্দিরের জন্য আলাদা সীমানা প্রাচীর নির্মাণের তাগিদ দেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ সামীম আখতার জানান, প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। অধিকাংশ কাজ শেষ পর্যায়ে। এই অবস্থায় নকশায় পরিবর্তন আনা সম্ভবপর নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী এ প্রকল্পের বিষয়ে কনসার্ন। সকলের মতামত নিয়ে এটি সম্পন্ন করা হবে।

অমর একুশে বই মেলা ভবিষ্যতে এখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র করার চেষ্টা করা হবে বলে জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়েল মন্ত্রী ও সচিব।

সমাপনী বক্তব্যে মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬০ থেকে ৭০টি গাছ কাটতে হয়েছে, আর সর্বোচ্চ ১০/১২টি গাছ কাটতে হতে পারে। বাণিজ্যিক অর্থে সেখানে কোনো রেস্তোরা হচ্ছে না। ৭টি ফুড কিয়স্ক হচ্ছে, যেখানে খাবার বাইরে থেকে কিনে এনে বিক্রি করা হবে। এখানে প্রতিদিন পাঁচ হাজার দর্শনার্থী যাতে আসেন তার জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও নিয়ে আসা হবে। এখানে যারা আসবে তারা যেন ৬/৭ ঘণ্টা থাকার পর কিনে কিছু খেতে পারে, তার ব্যবস্থা থাকবে। এই উদ্যান পরিচালনার জন্য আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে বলেও তিনি জানান।

এ ছাড়াও প্রকল্পের পিডি হাবিবুর রহমান, গৌরব একাত্তরের সাধারণ সম্পাদক এফ এম শাহীন, বন কর্মকর্তা ড. জাহিদুর রহমান মিয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।



সাতদিনের সেরা