kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

ড. মো. সহিদুজ্জামান   

২৪ জুন, ২০২১ ০৪:৪৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

মহামারি করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের পর থেকে সব কিছুই যেন থমকে গেছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মুখোমুখি হয়েছে নতুন এক বাস্তবতায়। তবে করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিক্ষার্থীরা।

করোনার কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ হলেও শিক্ষার্থীরা যাতে বাড়িতে বসে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে সে লক্ষ্যে সরকার সংসদ বাংলাদেশ টিভিতে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। তা ছাড়া শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। তবে উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা হাতে রয়েছে এমন সচ্ছল পরিবারের শিশুরাই অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার বৈষম্য বাড়বে। সারা দেশে তো নেটওয়ার্ক অতটা সবল না? আর অন্তত একটা স্মার্টফোন তো সবার হাতে নেই? অনেক গরিব ছাত্র আছে, তাদের হাতে এটা নেই? কিন্তু এই মুহূর্তে তো আমাদের সামনে বিকল্প কিছু নেই।

দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে। অনেক ছেলে-মেয়ে হয়তো স্কুলে না এসে অন্য কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে? এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে। এই ঝরে পড়া রোধ করতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক দিকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এই করোনায়। শহরে ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দি কোমলমতি শিশুরা স্কুলের আনুষ্ঠানিক পাঠগ্রহণ ও বন্ধু-সহপাঠীদের সংস্পর্শ থেকেও বঞ্চিত। অভিভাবকরা জানাচ্ছেন, রাত জেগে গেমস খেলা, অনলাইন ক্লাসে অনাগ্রহ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ঘুম কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় ভুগছে তারা।

সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনার একদম বাইরে রয়েছে। এ গবেষণায় এমন প্রেক্ষাপটে মা-বাবাদের চিন্তা-ভাবনার চারটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। এগুলো হলো—শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ তুলনামূলক বেড়ে যাওয়া, স্কুল খোলার সময় নিয়ে চিন্তা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানজনিত উদ্বেগ। গবেষণায় যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তা শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত।

উচ্চশিক্ষা স্তরেও করোনার থাবায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা। সেশনজট জেঁকে বসেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, আছে চাকরির চিন্তা। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাল্যবিয়ের হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনায় গরিব মানুষের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ফেরানো অনেকটাই অসম্ভব হবে। বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণির মেয়েদের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের ঘটনা ঘটে গেছে। করোনার প্রথম দফায় এ বছরের মার্চে যখন শহর থেকে মানুষ গ্রামে ফিরেছে, তখনই শহরগামী তরুণরা বিয়ে করেছে। বেশির ভাগই অল্প বয়সী নবম-দশম শ্রেণির মেয়ে।

করোনার কারণে শিশুশ্রমও বাড়তে পারে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও হতাশ হয়ে পড়েছে। ছেলেরা অনেকেই দিনমজুরসহ বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েছে।

স্কুল বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবেও সংকটে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষণপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের আসক্তি দেখা দিয়েছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হেনেছে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে একদিকে যেমন তাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এসেছে, অন্যদিকে বেড়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা।

এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সঠিক সমন্বয় ও কর্মপরিকল্পনাই পারে শিক্ষা খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা উচিত কি না? এ বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজন বিভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। বেশি সোচ্চার আমাদের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলছে, দেশের সব কিছুই যেখানে স্বাভাবিকভাবে চলছে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা চাই।

সাধারণ শিক্ষকরা অনেকেই খোলার বিষয়ে মত দিলেও রাজনৈতিক শিক্ষকরা তাকিয়ে থাকেন সরকারের দিকে। শিক্ষার্থী ও নিজের সন্তানদের কথা মাথায় এনে অভিভাবক হিসেবে এই বাস্তবতায় কতটুকুই বা করার আছে এমন আক্ষেপ করছেন অনেক শিক্ষক। একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আবার শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনার বিষয়। এ ক্ষেত্রে যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা সম্ভব হয়, তাহলে তা করা উচিত।

শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারও সাবধানতার সঙ্গে পা ফেলছে বলে মনে হচ্ছে। করোনার ভারতীয় ভেরিয়েন্ট এবং সীমান্ত এলাকাগুলোয় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার হয়তো নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। তবে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি মাথায় রেখে সম্প্রতি টিকাদানে শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় খোলা নিয়ে নানামুখী সংবাদ প্রতিনিয়ত ভেসে বেড়ায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত এখনো দিতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা শিগগিরই দূর হওয়ার নয়। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। করোনা মহামারির কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিক ও পরিবেশগত প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে।

স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে একটি এলাকার সব স্কুল একসঙ্গে না খুলে কিছুদিন কয়েকটি স্কুল আবার পরের কিছুদিন অন্য স্কুল খোলা রেখে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যায় কি না এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত। দরকার হলে এক স্কুলে সব ব্যাচ একসঙ্গে না এনে সময় ভাগ করে আলাদা ব্যাচের ক্লাস পরীক্ষা নেওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বাস করে, তাই করোনাঝুঁকি এখানে বেশি। তাই সব ব্যাচ একসঙ্গে না এনে যেসব ব্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ক্লাস রয়েছে তাদের এনে কার্যক্রম চালানো যেতে পারে, যাতে তাঁরা দীর্ঘ সেশনজটে না পড়েন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের গুরুত্ব সবার আগে। করোনায় শিল্প, অর্থনীতিসহ অন্যান্য খাতের ক্ষতি চোখে দেখা যায়; কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান হতে থাকে ধীরে ধীরে, যা জাতির জন্য উদ্বেগজনক।

লেখক :  অধ্যাপক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা