kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

‘ইলিপে উপকার হইল বাহে’

কুড়িগ্রাম লালমনিরহাটে দুস্থ মানুষের মুখে হাসি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ জুন, ২০২১ ০৩:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘ইলিপে উপকার হইল বাহে’

শুভসংঘের খাদ্য সহায়তা হাতে কুড়িগ্রামের উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের নয়াদাড়া গ্রামের দুস্থরা।

‘ম্যালা দিন পর বিনা পয়সায় সহায়তা পেলাম। সেই ঢাকা থেকে আমগর মতো অসহায় মানুষের জন্য সাহায্য নিয়া আইছেন তোমরা। আল্লাহ যেন বসুন্ধরার মালিকরে বাঁচে রাখুক যুগ যুগ।’ কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন কদবানু বেওয়া (৭০)।

নদীভাঙনে নিঃস্ব রাহেলা বেগমের দু-চোখও ভেজা। বললেন, ‘এবা কইরা বাড়ি থিকা ডাইকা আইনা কেউ আমগর সাহায্য দেয়নি। তোমরাই প্রথম আমগর মতো অবাগাদের সাহস দিলা।’

‘হামরা গরিব মানুষ, এতগুলা জিনিস একবারে কিনবের পাবার নই। অল্প অল্প করি আন্দি খাইম। আল্লাহ বসুন্ধরার মালিকের ভালো করবে। মুই মন থাকি দোয়া করং, আল্লাহ তাক সুখত আকুক।’ থেমে থেমে এভাবেই বলছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের নয়াদাড়া গ্রামের আহিমে (৭৮)।

একই উপজেলার কামারটারি গ্রামের ঝুলো বেওয়া বললেন, ‘মোর ঘরবাড়ি, স্বামী-সন্তান কিচ্চু নাই। এক বেলা প্যাট ভরে খাবারও পাং না। তোমরা যে ইলিপকুনা দিলেন, ইয়াতে মোর খুব উপকার হইল বাহে।’

কদবানু, রাহেলা, আহিমে, ঝুলো বেওয়াদের মতো অনেকের ঘরেই গতকাল বুধবার যেন লেগেছিল ঈদ। করোনার এই নিদানকালে ত্রাণ হাতে পেয়ে তাঁদের চোখে বইছিল আনন্দের অশ্রুধারা। কালের কণ্ঠ শুভসংঘের আয়োজনে ত্রাণ সহায়তা কর্মসূচির প্রথম দিনে গতকাল কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন উপজেলার দুস্থ ও অসহায় মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় খাদ্যসামগ্রী। এর মধ্যে ছিল ১০ কেজি চাল, দুই কেজি আটা, দুই কেজি ডাল ও এক লিটার সয়াবিন তেল।

গতকাল সকালে রাজারহাট উপজেলার তিস্তাপারের বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে বিতরণ করা হয় ত্রাণ। সেখানে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচির সূচনা করেন কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মো. জাফর আলী। উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রামের পৌর মেয়র কাজিউল ইসলাম, বিদ্যানন্দ ইউপি চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম, শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান প্রমুখ। এ সময় কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলী বলেন, ‘করোনার এই দুঃসময় মানুষ যেখানে কর্মহীন, সেখানে বসুন্ধরা গ্রুপের এই মানবিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’

এর আগে সকালে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সাঈদ হাসান লোবান, ইউপি চেয়ারম্যান উমর ফারুখ, জেলা শুভসংঘের উপদেষ্টা ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু, জেলা শুভসংঘের সভাপতি খন্দকার খায়রুল আনম, সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ মিলন, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ শুভসংঘের  সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ প্রমুখ।

পরে ব্রহ্মপুত্রপারের হাতিয়া ইউনিয়নে ৩০০ নদীভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন, শুভসংঘ উলিপুরের সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ।

শেষবেলায় চিলমারীর বালাবাড়ি হাই স্কুল মাঠে ব্রহ্মপুত্রপারের ৩০০ পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয় খাদ্যসামগ্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত আলী বীরবিক্রম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান, চিলমারী শুভসংঘের সভাপতি এমজি ছরওয়ার, সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন প্রমুখ।

রাজীবপুর উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে ৩০০ দুস্থ পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নবীরুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম, রাজীবপুর থানার ওসি নবীউল হাসান, সদর ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল আলম, শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা স্বপ্ন প্রমুখ।

‘কয়েকটা দিন ভালো থাকব’ : বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন আব্দুল খালেক। একা একা হাঁটাচলা করতে পারেন না। থাকেন সাপটানা সরাকারি আবাসনের ঘরে। অন্যের দয়ায় পাওয়া হুইলচেয়ারে বসিয়ে স্ত্রী আমেনা তাঁকে গতকাল সকালে নিয়ে এসেছিলেন লালমনিরহাট পৌর শহরের বাবুপাড়া ঈদগাহ মাঠে। হাতে করে নিয়ে এসেছেন টোকেন, যা এর আগের দিন রাতেই তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। তাঁর মতো আরো ৩৫০ জন অসহায়, দরিদ্র কিংবা কর্মহীন মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে জড়ো হয়েছিলেন সেখানে, যাঁদের প্রত্যেকেই পেয়েছেন চাল, ডাল, আটা ও তেল। পৌর এলাকার বাসিন্দা ওই সব মানুষের পাশাপাশি সদর উপজেলার ধরলা নদী তীরবর্তী কুলাঘাট ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বিভিন্ন গ্রামের আরো ২৫০ জনের হাতেও ভিন্ন একটি স্থানে তুলে দেওয়া হয় খাদ্য সহায়তা। এ ছাড়া পত্রিকা বিক্রেতারাও পেয়েছেন একটি করে খাবারের প্যাকেট।

বৃদ্ধ আব্দুল খালেক খাদ্যসামগ্রী পেয়ে বলেন, ‘এখন খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। ছেলে কোনোরকমে সংসার চালায়। আপনাদের দেওয়া খাবারে কয়েকটা দিন ভালো থাকব। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবে।’

কালের কণ্ঠ শুভসংঘ লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। গতকাল সকালে পৌর এলাকার বাবুপাড়া ঈদগাহ ময়দান ও দুপুরে সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়ের পশ্চিম বড়ুয়া রোটারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম দফায় ৬০০ মানুষের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

বাবুপাড়া ঈদগাহ ময়দানে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান, পৌর মেয়র রেজাউল করিম স্বপন, সদর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর প্রমুখ।

এদিকে গতকাল দুপুরে লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের ধরলা নদীর তীরের পশ্চিম বডুয়া রোটারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের লালমনিরহাট শাখার উপদেষ্টা কবি ও সমাজকর্মী ফেরদৌসী বেগম বিউটি, আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদি হাসান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রুনা লায়লা প্রমুখ।

হকাররাও পেলেন খাদ্য সহায়তা : লালমনিরহাটের ২৩ জন পত্রিকা বিক্রেতার হাতেও খাদ্যসামগ্রী তুলে দিয়েছে শুভসংঘ। শহরের রামকৃষ্ণ রোডের অনানুষ্ঠানিক এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের পত্রিকা এজেন্ট সাজিদ আলম ও আব্দুল হাকিম।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]



সাতদিনের সেরা